শুধু সে-দিনের কথা নয়, আগের অনেক কথা নিয়ে তাদের কাহিনী ধীরে-ধীরে বিকশিত হতে-থাকা পুষ্পের মতো পুষ্পিত হয়, কন্টক নিয়ে, সৌরভ নিয়ে। কেবল সে-কন্টক মুহাম্মদ মুস্তফাকে বিদ্ধ করে না, ব্যথা দেয় না, সে-সৌরভও তাকে মোহিত করে না : কাহিনীটি রূপকথার মতো শোনালেও রূপকথা নয়। কত কথা। মুহাম্মদ মুস্তফা বাড়ি আসছে খবর পেলে খোদেজা অধীর হয়ে দিন গুণত, অকারণে থেকে থেকে তার দৃষ্টি ছুটে যেত উঠানের প্রান্তে বেড়ার ফাঁকের দিকে। একবার আসবে বলেও না এলে তার চিন্তার অন্ত থাকে নি, বিনিদ্র চোখে কতবার-না বিছানা ছেড়ে মধ্যরাতে উঠানে গিয়ে স্তব্ধভাবে দাঁড়িয়ে থেকেছে। মুহাম্মদ মুস্তফা শহরে ফিরে গেলে ক-দিন সে বিরহবেদনায় ম্রিয়মাণ হয়ে থাকত, রাতে গোপন ক্ষতে বার-বার ভিজে উঠত তার বালিশ। একবার তার অসুখের খবর এলে মেয়েটি আশঙ্কা-দুশ্চিন্তায় এমন দিশেহারা হয়ে পড়ে যে আরোগ্য-সংবাদ না আসা পর্যন্ত মুখে দানা তোলে নি।
এ-সব যে সত্য নয়, সে-বিষয়ে মুহাম্মদ মুস্তফার কোনো সন্দেহ থাকে না। তার প্রতি খোদেজার হৃদয়ে যদি তেমন স্নেহমমতার শতাংশও থেকে থাকত তবে সে কি জানতে পেত না? মেয়েমানুষ মনের কথা লুকাতে পারে সত্য, তবে এমন গভীর স্নেহমমতা যা প্রত্যাখাত হলে মানুষ আত্মহত্যার মতো ভীষণ কাণ্ড করে বসে, তা সম্পূর্ণভাবে লুকানো সম্ভব নয়। সে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবেই খোদেজার আচরণ ভাবভঙ্গি স্মরণ করে দেখে কিন্তু বাড়ির মেয়েমানুষদের কাহিনীর সমর্থনে কিছুই খুঁজে পায় না। প্রতিবার দেশের বাড়িতে ফিরে এলে সকলের মতো খোদেজাও তার সেবাযত্ন করত, সে-ব্যাপারে তার হিস্যা কম ছিল না বেশিও ছিল না। কোনো-কোনো বিষয়ে সে যদি একাই খাতির-যত্নের অধিকার রাখত তার কারণ এই যে, বয়সের জন্যে কারো হাতে কোনো কাজ শোভা পায় কারো হাতে পায় না। সেজন্যেই হাত-মুখ ধোয়ার সময়ে উঠানে বদনা ধরত বা খাওয়ার সময়ে কোনোদিন হাতপাখা নিয়ে হাওয়া করত। তবে সে যখন বদনা থেকে পানি ঢালত বা হাতপাখা নিয়ে হাওয়া করত তখন কখনো এক মুহূর্তের জন্যেও মুহাম্মদ মুস্তফার এ-কথা মনে হয় নি যে সে বেশ একটু আদর করেই পানিটা ঢালছে বা বিশেষ মমতার সঙ্গে হাতপাখাটা নাড়ছে। কোথায় ছিল তার সেই গভীর স্নেহমমতা ভালোবাসার প্রমাণ?
দ্বিতীয় দিন সন্ধ্যার পর সহসা মুহাম্মদ মুস্তফার মনে ঈষৎ ক্রোধভাবের সঞ্চার হয়। আপন মনে সে বলে, রূপকথার জন্যে সদা ক্ষুধিত মানুষেরা হঠাৎ একটি রূপকথা সৃষ্টি করে ফেলে তার নেশায় এমন নেশাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে যে সত্যাসত্য ন্যায়-অন্যায় বিচারজ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে, এক-কথা বুঝতে পারছে না যে তারা তাকেই খোদেজার মৃত্যুর জন্যে দায়ী করছে। ক্রোধউষ্ণ মনে এ-সবের মধ্যে সে গুঢ় অভিসন্ধিও খুঁজে পায়। একবার মনে হয়, সে যে তাদের পশ্চাতে ফেলে দূরে কোথাও চলে যাচ্ছে এ কথা তার মঙ্গল কামনা করলেও তারা গ্রহণ করতে পারছে না বলে একটি বিকৃত উপায়ে তার কাছে তাদের প্রতিবাদ জানাচ্ছে, এবং এত শ্রম-সাধনার সাহায্যে যে জীবনের দেহলিতে সে এসে পৌঁছেছে সে-দেহলি যদি তার ফলে ছায়াচ্ছন্ন হয় তাতেও তাদের আপত্তি নেই। আরেকবার মনে হয়, সে যে পিতৃদত্ত প্রতিশ্রুতিটি রক্ষা করে নি সে-কথা জোর গলায় বলবার সাহস না পেলেও সে-জন্যেই তারা তাকে শাস্তি দিতে উদ্যত। অন্য ধরনের কথাও মনে জাগে। তার মনে হয়, এই কাহিনীতে তার অংশ নিতান্ত নগণ্য, সে একটি উছিলামাত্র। মৃত মেয়েটিই কাহিনীটির উদ্দেশ্য, সেই তাদের লক্ষ্যস্থল, এবং একটি ঘোরালো উপায়ে মৃত মেয়েটিকে জীবিত করার চেষ্টা করছে তারা, মৃত্যুর পর একটি অতিশয় স্নেহশীল দরদী আত্মা সৃষ্টি করার প্রয়াস পাচ্ছে। স্নেহান্ধ লোকেরা কেবল এ-কথা বুঝতে পারছে না যে মেয়েটিকে সৃষ্টি করতে গিয়ে তাকেই ধ্বংস করছে।
তবে এ-সব মনে-মনেই সে বলে, মুখে কিছু বলা হয়ে ওঠে না। বাড়ির লোকেদের সরল, বিমর্ষ, কাল্পনিক কাহিনীতে আত্মমগ্ন মুখের দিকে তাকিয়ে অবশেষে এ-কথাও বুঝতে পারে যে, মেয়েটি তার জন্যে আত্মহত্যা করেছে বিশ্বাস করলেও তার বিরুদ্ধে তাদের কোনো অভিযোগ নেই, কোনো ক্রোধও নেই, যেন দোষ তার নয় অন্য কারো, আসল অপরাধী দৃশ্যগত জীবন-মঞ্চের অন্তরালেই কোথাও লুকিয়ে। হয়তো এ-জন্যে সে শেষ পর্যন্ত ক্ষীণতম প্রতিবাদও জানাতে সক্ষম হয় না। তার ক্রোধ পড়ে, সে শান্তও বোধ করে।
তৃতীয় দিন ছাতা মাথায় জুতা বগলে বৃষ্টির মধ্যে দিয়ে সে যখন চাঁদবরণঘাট অভিমুখে রওনা হয় তখন সহসা স্থির করে, খোদেজার মৃত্যুর জন্যে বিয়েটা কিছুদিন স্থগিত রাখা শোভনীয় হবে। এ-টুকু না করে যেন পারা যায় না।
তবারক ভুইঞা বলে চলে :
সেদিন উকিল কফিলউদ্দিন সহসা জিজ্ঞাসা করেছিল, কোথায় চড়া পড়েছে, কেই বা বলেছে চড়া পড়েছে? তবে প্রশ্নটি উচ্চকণ্ঠে জিজ্ঞাসা করে বৈঠকখানায় উপস্থিত লোকেদের মনে বিষম একটা কৌতূহলের সৃষ্টি করলেও সে-প্রশ্নের অর্থ কী তা তখন বলে নিঃ সে-প্রশ্নের যে-উত্তরটি দেখতে পায় তা হয়তো সে-সময়ে তার নিজের বিশ্বাস হয় নি। তবে কথাটি যতই ভেবে দেখে ততই তার কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়। সত্যি, চড়া যদি পড়ে থাকে, কোথায় সে চড়া? এ-পর্যন্ত কুমুরডাঙ্গার অধিবাসীরা স্বচক্ষে কোনো চড়া দেখে নি। চড়ার কথা বলেছে তারা যারা স্টিমার চালায়, যারা সে স্টিমারের আসা-যাওয়া হঠাৎ বিনা খবরে বন্ধ করে দিয়েছে। পরদিন সে গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে থাকে, কপালে সুগভীর রেখা, মুখে একাগ্র ভাব, যেন সমস্ত চিন্তাধারা নিয়োজিত করে কী একটা দুরূহ সমস্যার সমাধান কার্যে রত। তবে সন্ধ্যার দিকে তার মুখ পরিষ্কার হয়ে ওঠে।
