খতিব মিঞা উত্তরের জন্যে অপেক্ষমান উকিল কফিলউদ্দিনের দিকে তাকায়, লোকটি বিশ্বাসযোগ্য কিনা তাই যেন জানবার চেষ্টা করে। তবে মানুষের স্বভাবচরিত্র বা অন্তরের কথা বোঝা তার পক্ষে সহজ নয়। বহুদিন হল তারই অজান্তে দুনিয়াটি কখন সঙ্কীর্ণ হয়ে কর্মজীবন ব্যক্তিগত জীবনের ক্ষুদ্র গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে এবং মানুষ এখন একটি রূপেই দেখা দেয় তার চোখে-যাত্রীর, এবং দুদণ্ডের জন্য দেখা সে-যাত্রীও ভালো-মন্দ আশা-নিরাশা সুখ-দুঃখ মিশ্রিত রক্তমাংসের মানুষে পরিণত হবার সুযোগ পায় না : যাত্রীরা ছায়া, উড়ন্ত পাখির ছায়া, যে-ছায়া দিনে দুবার দেখা দেয় তার কর্মজীবনের প্রাঙ্গণে; কে কী-রকমের লোক তা বোঝার ক্ষমতা সে সত্যিই হারিয়েছে। তবে সব ছায়া এক নয়, ছায়ার মধ্যেও প্রভেদ রয়েছে, সে-ছায়া শ্রেণীবিভক্ত-যে-কথা বুঝবার জন্য তাকে কারো চেহারা পোশাক-পরিচ্ছদ আচরণ-ব্যবহার লক্ষ করে দেখতে হয় না। হয়তো পায়ের শব্দে বা গলার আওয়াজেই সে বুঝে নেয় কোন যাত্রী উচ্চ শ্ৰেণীর, মধ্যম-শ্রেণীর বা নিম্ন-শ্ৰেণীর। এবং বিভিন্ন শ্রেণীর প্রতি আপনা থেকেই তার আচরণ ভিন্নরূপ ধারণ করে। অতএব সে যখন উকিল কফিলউদ্দিনের দিকে তাকায় তখন সে তার সম্ভ্রান্ত চেহারা বা তার কপালে বিরক্তির রেখা ঠিক দেখতে পায় না, একথাই তার স্মরণ হয় যে সে উচ্চ-শ্রেণীতে ভ্রমণ করে, তার দাবিদাওয়া বেশি, তাকে হেলা করাও নয়। নিচে যে-নোটিশ টাঙ্গানো হয়েছে সে-নোটিশের শব্দগুলির পুনরাবৃত্তি করেই কি এ-যাত্রীকে সন্তুষ্ট করা যাবে?
খতিব মিঞা দ্রুতভাবে কিন্তু গোপনে একটি বড় ধরনের নিঃশ্বাস নেয়, তার নাসারন্ধ্র কেঁপে ওঠে। দ্রুতভাবে একবার ভাবে, এ-বিষয়ে সন্দেহ নেই যে ঝড়-তুফান বা কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনার জন্যে স্টিমার আসছে না, তা নয়। সে-সব কারণে ক্বচিৎ কখনো স্টিমার আসতে দেরি করে বৈকি। বছর তিনেক আগে কুমুরডাঙ্গা থেকে দশ। ক্রোশ দূরে উজানের স্টিমারে একবার আগুন ধরেছিল। আগুন ঠিক নয়, তার একটি সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছিল মাত্র যা দমন করতে বেগ পেতে হয় নি। তবে মাঝ-দরিয়ায় দোজখি অগ্নিকাণ্ডে নির্মমভাবে প্রাণ যাবে এই ভয়ে দু-একজন যাত্রী তারস্বরে খোদার নাম নিয়ে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়লে তাদের আবার আশ্বাস দিয়ে তুলে নিতে কিছু সময় লাগে, তারপর একটি ভাসন্ত নারকেলকে মনুষ্যমস্তক বলে ভুল করে কেউ বেহুদা হুজুগ তুললে কল্পনার মানুষটির সন্ধানে আরেক দফা বিলম্ব হয়। তবে আজকার ঘটনা তেমন কিছু নয়, ঝড়-তুফান বা আকস্মিক কোনো দুর্ঘটনার জন্যে যে স্টিমার আসবে না, তা নয়। তাছাড়া আসল কথা কি সে জানে না? গত এক মাসের মধ্যে কতবার সাদা-সবুজ রঙের লঞ্চটিকে সদরের দিক থেকে এসে বাঁক পেরিয়ে ঘাটের সামনে দিয়ে উজানের পথে যেতে দেখেছে, তার আওয়াজও শুনেছে; কর্কশ অমসৃণ আওয়াজ যেন, ইচ্ছা থাকলেও চলার ক্ষমতা নেই, আনুগত্যের অভাব না থাকলেও যৌবনের তেজশক্তি নেই নূতন করে রঙ-দেয়া সেই অতি পুরানো লঞ্চের। গতকাল লঞ্চটি আবার দেখা দিয়েছিল। সেটি যখন ফিরে যায় তখন সন্ধ্যা উত্তীর্ণ। কেন লঞ্চটি একমাস ধরে এ পথে আসা-যাওয়া করেছে তা অনুমান করা কঠিন নয়। তাছাড়া সেদিন দুপুরে সদরগামী স্টিমার এলে সারেঙ্গের মুখে শুনেছিল যে, কুমুরডাঙ্গা থেকে কিছু আগে উজানের পথে নদীর ধারা যেখানে বরাবর বেশ সঙ্কীর্ণ এবং যেখানে শীতের দিনে স্টিমারকে বড় হুশিয়ার হয়ে চলতে হয়, সেখানে সেই সঙ্কীর্ণ স্থানটিও নাকি মস্ত চড়ায় প্রায় ঢাকা পড়ে গিয়েছে, যেটুকু এখনো স্টিমার গমনোপযোগী আছে সে-টুকুও শীঘ্র ঢেকে যাবে। সারেঙ্গ বলেছিল, ধাঁ-ধাঁ করে চড়াটা জাগছে। এ-সব কথা কি কুমুরডাঙ্গার অধিবাসীদের কানে পৌঁছায় নি? নদীটি তাদেরই নদী।
স্টিমার আসবে না, নদীতে চড়া পড়েছে। খতিব মিঞা অবশেষে বলে। একটু থেমে, কোম্পানি যে সত্যিই নির্দোষ সে-বিষয়ে সর্ব সন্দেহ দূর করবার জন্যে আবার বলে, নদীর বুক জুড়ে মস্ত চড়া পড়েছে, নদীর শ্বাসরোধ হবার আর দেরি নেই।
একটি কথা লক্ষ্য করে বিস্মিত হই : তবারক ভুইঞা মুহাম্মদ মুস্তফার নাম উল্লেখ করে নি। অথচ সেদিন সে-ও ঘাটে উপস্থিত হয়েছিল স্টিমার ধরবার জন্যে, ধরতে পারে নি। যদিও সে-সময়ে তবারক ভুইঞা শ্যাওলা-আবৃত বদ্ধ ডোবার মতো পুকুরে খোদেজার মৃত্যুর কথা জানত না, তবু সে যে স্টিমারঘাটে মুহাম্মদ মুস্তফার আগমন, তারপর বিফল মনোরথ হয়ে ঘাট থেকে বাড়ি প্রত্যাবর্তন-এ-সব যে লক্ষ্য করে নি তা সম্ভব নয়। মুহাম্মদ মুস্তফা বেশ সময় হাতে নিয়ে ঘাটে উপস্থিত হয়েছিল; অন্ততপক্ষে তখনো উকিল কফিলউদ্দিন সেখানে দেখা দেয় নি। নিচে স্টিমার না আসার খবর পেয়ে ওপরেও এসেছিল, পাশে ছিল স্টেশনমাস্টার খতিব মিঞা। চড়ার কথা এবং স্টিমার -আসার কথা সে নির্বিবাদেই মেনে নিয়েছিল। সে স্বল্পভাষী মানুষ, বস্তুত বিশেষ প্রয়োজন না হলে কথা বলতে কদাচিৎ শোনা যায় তাকে। হয়তো নদীর দিকে চেয়ে চুপচাপ বসেছিল, তার নীরবতা লক্ষ্য করে খতিব মিঞাও হয়তো নীরব হয়ে পড়েছিল, এবং এমত অবস্থায় এক সময়ে কখন একটু তন্দ্রার ভাব এসে গিয়েছিল তার চোখে। তার তন্দ্রা ভাঙে তখন যখন সে উকিল সাহেবের কণ্ঠস্বর শুনতে পায়। তারপর, মুহাম্মদ মুস্তফা যখন প্রস্থান করে, সে-সময়েও তবারক ভুইঞা তাকে কৌতূহল ভরে চেয়ে-চেয়ে দেখে থাকবে : লম্বা কিন্তু শীর্ণ-পাতলা লোক, মাথাটি শরীরের তুলনায় একটু বড় যা দেহের শীর্ণতার জন্যে অযথাৰ্তভাবে বড় মনে হয়, নীরস মুখ, চোখে কেমন সতর্কতা, চলার ভঙ্গিতে একটু অনিশ্চিত ভাব যেন কোথায় যাচ্ছে তা ঠিক জানে না, বাঁ-হাতটা ঈষৎ ঘোরানো (সে যখন চেয়ারে-চৌকিতে বসে তখন সে-হাতেই ভর দিয়ে দেহটা একটু হেলিয়ে বসে যেন অদৃশ্য কোনো দেয়ালে ঠেস দিয়ে রয়েছে), অন্তরে-অন্তরে লাজুক প্রকৃতির মানুষ যে-লাজুকতা তার জীবনে আকস্মিক পরিবর্তনের ফলে সাময়িকভাবে কিছু বৃদ্ধি পেয়েছিল এই কারণে যে তখনো সে তার নূতন এবং পুরাতন অবস্থার মধ্যে সামঞ্জস্য স্থাপন করতে সক্ষম হয় নি; দুটির মধ্যে বিরোধিতা ছিল না, কেবল দুটি তখনো পৃথক সত্তাই ছিল। আরেক কারণেও ঘাটে তার আগমন এবং ঘাট হতে প্রস্থান তবারক ভুইঞা লক্ষ্য করে থাকবে। সাধারণ কোনো উপলক্ষে মুহাম্মদ মুস্তফা স্টিমার ধরতে আসে নি; যে-শুভকাজটি খোদেজার আকস্মিক মৃত্যুর জন্যে স্থগিত রাখতে বাধ্য হয়েছিল সে-শুভকাজটি সম্পন্ন করবার উদ্দেশ্যেই স্টিমার ধরতে এসেছিল। সব বৃত্তান্ত না জানলেও সে-কথা তবারক ভুইঞা জানত। মুহাম্মদ মুস্তফার বন্ধু তসলিম লিখেছিল, আশারাফ হোসেন চৌধুরী সাহেব হজ করে নানা দেশে পীর-দরবেশের দরগাহ-মাজারে জেয়ারত করে দেশে ফিরেছেন, আর দেরি করা ঠিক হবে না। এমনিতে দেরি হয়ে গিয়েছে, খোদেজার মৃত্যুর জন্যে তখন বিয়েটা শোভনীয় হত না বলে পাকা দিনটা ভাঙতে হল, তারপর তোমার ভাবী শ্বশুরকেও হজে রওনা হতে হল। এবার তিনি ফিরেছেন, আর বিলম্ব নয়। তিনি একটু অধীর হয়েই পড়েছেন শুভকাজটি সম্পন্ন করবার জন্যে। বলছেন, আর বেশিদিন বাঁচবেন না। হজ-ওমরাহ দরগাহ-মাজার করার পর এমন ভাবটি অস্বাভাবিক নয়, মনে-প্রাণে শুদ্ধ পবিত্র বোধ করলে মানুষ মৃত্যু কামনা করে থাকে, কারণ এ-সময়ে বেহেস্ত সম্বন্ধে মানুষ যতটা নিশ্চিত বোধ করে অন্য কোনো সময় ততটা করে না। তবে মনের ইচ্ছা যাই হোক না কেন, তিনি বিদেশ থেকে বেশ উত্তম স্বাস্থ্য নিয়েই ফিরেছেন; বিদেশে সস্তায় ভালো ফলমূল পাওয়া যায়। লোকেরা এমনও বলে যে, কবরখানার দিকে নয়, শীঘ্র তিনি মন্ত্রীসভার দিকেই যাবেন। সেটা সম্ভব। অবসর গ্রহণ করলেও তার প্রভাব-প্রতিপত্তি যথেষ্ট, নানা উঁচু দরবারে তার অবারিত দ্বার, যাতায়াতও কম নয়। আর তোমার ভাবী স্ত্রীর কথা কী আবার বলতে হবে? এমন মেয়ে সত্যি দুটি হয় না-শিক্ষায় বল, দেখতে শুনতে বল, লেহাজ-নম্রতায় বল। আর যাতে দেরি না হয়, তোমাকে জিজ্ঞাসা করে আমি তাই নিজেই একটি দিন ঠিক করেছি, দিনটি তোমার ভাবী-শ্বশুরেরও পছন্দ। তারযোগে সম্মতি জানাও। মুহাম্মদ মুস্তফা অকারণে একদিন সময় নিয়ে তারযোগে তার সম্মতি জানিয়েছিল, তারপর নির্দিষ্ট দিনটি কাছে এলে ক-দিনের ছুটি নিয়ে ঢাকায় যাবার জন্যে স্টিমারঘাটে উপস্থিত হয়েছিল।
