স্বর্ণ একটু অপ্রতিভ হইয়া পড়িল। পরে বলিল, “ওলো! তিনি যে মুসলমান, আর আমি যে হিন্দু।”
মালতীঃ হ’লই বা হিন্দু আর মুসলমান। আজকাল ত হিন্দু-মুসলমানে খুবই বিয়ে হচ্ছে।
স্বর্ণঃ কোথায় খুব হচ্ছে?
মালতীঃ কেন? এই ত ভুলুয়ার ফজল গাজীকে রামচন্দ্রপুরের লক্ষ্মীকান্ত মজুমদার কন্যা দিয়েছে। বাখরগঞ্জের হাশমতুল্লা চৌধুরীর সঙ্গে বাঁশজোড়ের চক্রবর্তীদের মেয়ে শরৎকুমারীর বিয়ে ত গত পৌষেই হয়েছে। বামন ঠাকুরেরা এখন ত খুবই পাতি দিচ্ছেন। তাঁরা ত বলেছেন, “মুসলমান দেবতার জাতি, তাদের ঘরে মেয়ে দিলে অগৌরব বা অধর্ম নাই।” গত বৎসর সরাইলের জমিদার মথুরাকান্ত মুস্তফী ও আলমপুরের চৌধুরী শাহ্বাজ খানের মধ্যে কেন্দ্রপাড়া গ্রাম নিয়ে যে তুমুল বিবাদ-বিসম্বাদ হয়, সে বিবাদ মুথরাকান্ত মুস্তফীর কন্যা সরোজবাসিনীর সঙ্গে চৌধুরী সাহেবের পুত্র আবদুল মালেকের বিবাহ দিয়েই ত মিটিয়ে ফেলা হ’ল। বাবা সে বিয়ের নিমন্ত্রণে গিয়েছিলেন। তাঁর মুখেই শুনেছি।
স্বর্ণঃ ওরূপ দুই চারটি ঘটনায় কি আসে যায়?
মালতীঃ কেন? দুই চা’রটা কোথায়? বাদশা নবাব ও উজিরদিগকে বড় বড় হিন্দু রাজরাজড়া কন্যা দিচ্ছেন।
স্বর্ণঃ আরে ওসব রাজ-রাজড়ার ও তাঁদের কন্যাদের কথা ছেড়ে দে। তাঁদের সবই শোভা পায়।
মালথীঃ (হাততালি) বাঃ বাঃ! বাঃ! আমিও ত সেই জন্যই ঈসা খাঁকে বরণ করতে বলছি। তুমি যে রাজা কেদার রায়ের কন্যা। তোমারও ত বেশ শোভা পাবে!
স্বর্ণ বড়ই অপ্রস্তুত ও অপ্রতিভ হইল। সে মনে মনে ভাবিল, আজ এরূপ হচ্ছে কেন? মালতী যে বড়ই জব্দ করতে আরম্ভ করল।
স্বর্ণকে অপ্রতিভ দেখিয়া মালতী বলিল, “তবে এইবার ঈসা খাঁকে মালা দেবে? কেমন?”
স্বর্ণঃ তোর বুঝি মুসলমান বিয়ে করতে বড়ই সাধ?
মালতীঃ আমার সাধ হলেই বা কি? আমি ত রাজকন্যা নই। এ সাধারণ হিন্দু জমিদারের কন্যাকে কোন মুসলমান গ্রহণ করবে?
স্বর্ণঃ তুই যদি বলিস্ না হয় আমি তার উপায় দেখি।
মালতীঃ আগে ভাই তুমি নিজের যোগার দেখ। কথার বলে, ‘মামা! আগে দেখ নিজের ধামা।-‘
স্বর্ণ মালতীর কথায় তাহার গালে এক মৃদু ঠোক্না দিতে অগ্রসর হইলে, মালতী নিজের গলা হইতে ফুলমালা লইয়া স্বর্ণের গলায় পরাইয়া দিল এবং চকিতে তাহার গণ্ড চুম্বন করিয়া বাড়ীর দিকে ছুটিল। স্বর্ণও তাহাকে ধরিবার জন্য বাতাসে আঁচল উড়াইয়া পুকুরের বাগান আলো করিয়া দ্রুত ছুটিল।
০৪.রায়-নন্দিনী – চতুর্থ পরিচ্ছেদঃ পত্র
জ্যৈষ্ঠ মাস গত প্রায়। আষাঢ়ের ১৭ই তারিখে মোহররম উৎসব। সেই মোহররম উৎসবের পরেই স্বর্ণময়ীকে পিত্রালয়ে ফিরিতে হইবে। স্বর্ণময়ী শিবনাথের মুখে আরও সংবাদ পাইল যে, আগামী অগ্রহায়ন মাসেই ইদিলপুরের শ্রীনাথ চৌধুরীর সঙ্গে তাহার বিবাহের সম্বন্ধও পাকাপাকি হইয়াছে। রাজা এখন হইতেই বিবাহের আয়োজনে লিপ্ত। বিশেষ সমারোহ হইবে। শিবু অত্যন্ত আনন্দের সহিত স্মিতমুখে র্স্বণকে এই সংবাদ প্রদান করিলেও, বিবাহের কথায় স্বর্ণের বুক যেন ধড়স ধড়স করিতে লাগিল। তাহার বক্ষের স্পন্দন এত সজোরে চলিতে লাগিল যে, স্বর্ণের সন্দেহ হইল পাছে বা অন্যে শ্রবণ করে। স্বর্ণের মুখমণ্ডল ম্লান হইয়া গেল। শিবনাথ ভাবিল, পাত্র কিরূপ তাই ভাবিয়া তাই ভাবিয়া স্বর্ণময়ী চিন্তিত হইয়াছে। সুতারাং সে একটু কাশিয়া লইয়া গলাটা পরিস্কার হাসিতে হাসিতে বলিল, “দিদি! আর ভাবতে হবে না, সে পাত্র আমি নিজে দেখেছি। মহারাজও দেখেছেন। তাদের ঘর বেশ বুনিয়াদি। পাত্র দেখতে শুনতে সাক্ষাৎ কার্তিক ঠাকুর। বয়সও অল্প। তোমার সঙ্গে বেশ মানাবে। সেরূপ সুশ্রী সুন্দর পাত্র আমাদের এ অঞ্চলে আর নাই। তুমি একবার তাকে দেখলে ভুলে যাবে।” শিবনাথ আনন্দের সহিত তাহাকে সন্তুষ্ট ও খুশী করিবার জন্য এসব কথা বলিলেও স্বর্গের কর্ণে তাহা বিষের মত বোধ হইতে লাগিল। স্বর্ণ চুল বাঁধিবার ছল করিয়া সেখান হইতে উঠিয়া গেল। ঘরে যাইয়া একেবারে বিছানায় শুইয়া পড়িল। বালিশে সে অনেকক্ষণ মুখ লুকাইয়া কাঁদিল। তারপর মুখ ধুইয়া মন স্থির করিয়া অনেকক্ষণ পর্যন্ত চিন্তা করিল। সে বেশ চিন্তা করিয়া দেখিল, ঈসা খাঁ ব্যতীত তাহার জীবনের কোনও অস্তিত্ব নাই। সে দেখিল ঈসা খাঁকে তাহার হৃদয় এরূপভাবে ধরিয়া বসিয়াছে যে, সমস্ত দেবতা এমনকি ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর পর্যন্ত এক মুহূর্তের জন্যও তাহার হৃদয়ের সিংহাসন হইতে ঈসা খাঁকে বিচ্যুত করিতে সমর্থ নহে। যুবতী অনেক ভাবিয়া শেষে ঈসা খাঁকে পত্রযোগে আত্মসমর্পণের কথা জানাইবার জন্যই মন স্থির করিল। ভাবী বিপদের গুরুত্ব স্মরণে এবং হৃদয়ের দুর্বিষহ যন্ত্রণায় লজ্জা দূরীভূত হইল। যুবতী পত্র লিখিয়া তাহা শিবনাথের দ্বারা খিজিরপুরে পাঠাইবার সংকল্প করিল। বলা বাহুল্য, পত্র পারস্য ভাষায় রচিত হইল। আমরা সেই অমৃত-নিস্যন্দিনী পারস্য ভাষায় রচিত পত্রের বঙ্গানুবাদ দিতেছিঃ
পত্র
হে মহানুভব! প্রাণ-রাজ্যের একমাত্র অধীশ্বর! তোমাকে কি বলিয়া সম্বোধন করিব, তাহা ভাষায় খুঁজিয়া পাইতেছি না। মানুষ মুখের ভাষা আবিক্সার করিয়াছে কিন্তু প্রাণের ভাষা অদ্যাপি অনাবিস্কৃত রহিয়াছে। প্রাণের একটি আবেগ প্রকাশ করিতে পৃথিবীর সমস্ত ভাষা যখন এক নিঃশ্বাসে ফুরাইয়া যায় তখন হে আমার প্রাণের আকাঙ্খিত প্রিয় দেবতা! এ হৃদয়ের অনন্ত ভাবোচ্ছ্বাস, অনন্ত দুঃখ-ব্যথা আমি কিরূপে প্রকাশ করিব। তবে আশা আছে, মহৎ ব্যক্তি তর্জনী প্রদর্শনেই চন্দ্র এবং গোলাপের একটি পাপড়িতেই প্রেমিক-হৃদয় দর্শন করেন।
