শেখুল ইসলামঃ খোদার মর্জী বুঝা যাবে না কেন? খোদাতা’লা ত তাঁর মর্জী সুস্পষ্ট করেই তাঁর কালামে বুঝিয়ে দিয়েছেন। চরিত্রহীন জাতির অধঃপতন অনিবার্য। ইহা ত খোদার মর্জী। খোদা ত স্পষ্টই বলেছেন যে, ‘যতদিন পর্যন্ত কোনও জাতি চরিত্রকে বিকৃত না করে, ততদিন তাদের সৌভাগ্য নষ্ট হয় না।’ এরূপ স্পষ্ট ঘোষণার পরেও যদি আমরা চরিত্র রক্ষা করতে না পারি, তা’ হরে তার জন্য কে দায়ী হবে?
“চরিত্রবান হবার জন্যই ধর্মের আবশ্যক। কিন্তু আমরা তা’ ভুলে গিয়েছি। সত্যবাদিতা, জিতেন্দ্রিয়তা, স্বার্থত্যাগ, ঐক্য, সখ্য, সহানুভূতি ও পরস্পরের প্রতি প্রেম, যে জাতির ভূষণ এবং নিত্যধর্ম ছিল; আজ তাদের ভিতরে কেবল অনৈক্য, হিংসা, ইন্দ্রিয়পরায়ণতা এবং স্বার্থপরতাই একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছে। কি ভয়ানক অধঃপতন! বাইরের অধঃপতন আপনারা যা’ দেখছেন, ভিতরের অধঃপতন অর্থাৎ মনের অধঃপতন তার অনেক বেশী হচ্ছে-সর্বাগ্রে হয়েছে।
“মনের অধঃপতনের সঙ্গে সঙ্গে চরিত্রের অধঃপতন, আর চরিত্রের অধঃপতনের সঙ্গে সঙ্গে বাইরের অধঃপতন হয়। মনের ভিতরের যেমন ভাবের, যেমন কল্পনার প্রদীপ জ্বলে, বাইরে তারই আলো পড়ে। চরিত্রের কেন্দ্র হচ্ছে মন, অথবা মনের বহির্বিকাশ হচ্ছে চরিত্র্। আমরা সেই চরিত্রের বিকাশ হারিয়েছী। খোদার ইচ্ছা এবং আদেশের বিরুদ্ধে চলেছি। সুতরাং আমাদের অধঃপতন এবং দুর্গতি অনিবার্য। আমরা ধর্মকে রক্ষা করি নাইঃ সুতরাং ধর্মও আমাদিগকে রক্ষা করবে না।
মালেকঃ কেন, আমরা ধর্ম রক্ষা না করলে ধর্ম কি আমাদিগকে রক্ষা করতে পারে না?
শেখঃ কখনই নয়। নদীতে নৌকা বাইবার সময় যেমন মানুষই নৌকাকে বহন করায় মানুষ নিজেও তৎসহ বাহিত হয়; ধর্মও ঠিক তাই। ধর্মকে রক্ষা করলে আমরাও রক্ষা পাই। নৌকা ডুবিয়ে দিলে আরোহী এবং মাঝী-মাল্লা যেমন ডুবে মরে, ধর্ম ডুবালে আমরাও তেমনি ডুবে মরি।
মালেকঃ কিন্তু ধর্মকে ত আমরা খুবই মানি। কোরআন ও হাদিসকে ত পূর্বের ন্যায়ই সম্মান করি। নামাজ রোজা ও আমরা ছেড়ে দেই নাই।
শেখঃ কোরআন হাদিসকে মানেন, ইহা মিথ্যা কথা। কোরান হাদিসকে মানরে ব্যসন-বিলাস, কামুকতা, মিথ্যাবাদিতা, কাপুরুষতা এবং অনৈক্য কখনও আমাদের ভিতরে প্রবেশ করত না।
“কোরআনকে মানার অর্থ নয় যে, ভক্তির সহিত কোরআন শরীফকে মস্তকে রাখা বা চুম্বন করা। কোরআনকে মানার অর্থ এই যে, কোরআনের উপদেশ অনুসারে নিজের চরিত্রকে রক্ষা করা। নামাজ রোজার কথা যা’ বললেন তা’ অনেকটা ঠিক। এখনো বহু লোক নামাজ পড়ে ও রোজা রাখে বটে। কিন্তু তারা নামাজ রোজার কোনও উদ্দেশ্য বুঝে না।
“তৌহিদের তেজে তেজীয়ান্ করাই নামাজের উদ্দেশ্য। অর্থাৎ নামাজী ব্যক্তি অটুট বিশ্বাসী, সুতারং অতুল বীর্যশালী হবে। তাঁরা অন্যান্য অসত্যের প্রতি বজ্রাদপি কঠোর এবং সত্য ও ন্যায়ের প্রতি কুসুমাদপি কোমল হবেন। চরিত্রে বল ও তেজ লাভ করাই নামাজের উদ্দেশ্য। রসান দিলে স্বর্ণের বর্ণ যেমন উজ্জ্বল হয় নামাজও মুসলমানের চরিত্রকে তেমনি উজ্জ্বল এবং প্রভামণ্ডিত করবে। কিন্তু আজকার দেখা যায়, অনেক মুসল্লী নীচমনা, স্বার্থপর, হিংসুক ও কাপুরষ। তা’রা নামাজের অর্থ বা উদ্দেশ্য কিছুই অবগত নয়। অনেকে শুধু লোক দেখাবার জন্য নামাজ পড়ে।
“রোজা মসুলমানকে সংযম ও সহানুভূতি শিক্ষা দেয়। কিন্তু দুঃখের বিষয, আমাদের চরিত্রে সংযম ও লোকহিতৈষণা বা সহানুভূতির একান্তই অভাব হয়েছে। রোজা ও নামাজ আমাদের একটি ফ্যাসান এবং পদ্ধতি হয়ে পড়েছে। রোজা নামাজের দ্বারা চরিত্রে সংযম ও পরাক্রম লাভ করতে হবে, তা’আমরা ভুলে গিয়েছি। নৌকায় বা যানে উঠে কেউ যদি নিজের গন্তব্য পথ ভুলে যায়, তা’হলে সে যেমন আরও বিপাকে পড়ে, রোজা নামাজের উদ্দেশ্যের দিকে লক্ষ্য না রাখায় আমাদেরও তেমনি সর্বনাশ হচ্ছে। চরিত্রের উন্নতিই হচ্ছে যে একমাত্র ধর্ম, তা’ যেন আমরা ভুলে না যাই। এর উপরেও আরও একটি পরম ও চরম কর্তব্য আছে। তা’ই হচ্ছে ইসলামের বিশেষত্ব।
মালেকঃ তা’ কি?
শেখঃ তা’ হচ্ছে সর্বদা সঙ্ঘবদ্ধ থেকে সকল বিষযে ইসলামের প্রধান্য রক্ষা করা।
সফদরঃ তবে ত আমরা ইসলাম হ’তে বহু দূর সরে পড়েছি!
বাদশাহঃ সরে পড়েছি বলেই ত আজ দূর্দশা। কাঠ পচে গেলেই তা’তে পোকা ধরে। তাজা কাটে পোকা ধরে না। পানি পচে গেলই তা’হতে দুর্গন্ধ নির্গত হয় এবং শৈবাল জন্মে। নির্মল বিশুদ্ধ জলে গন্ধেও হয় না এবং শেবাল জন্মে না। তেমনি চরিত্রবান জাতিতে কখনও অধঃপতনের ঘুণ ধরে না, তাদের মধ্যে দুর্গতির শৈবাল জন্মগ্রহণ করে না।
এমন সময় বাদশাহ্ আলমের শ্যালক আফসার-উদ্দৌলা সেখানে আসিয়া উপস্থিত ইহলেন। সালাম এবং সাদর সম্ভাষণের পরে সকলেই সোৎসুক চিত্তে তাঁহার কথা শুনিবার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করিতে লাগিলেন।
বাদশাহঃ কতদূর কি হ’ল? কেমন বুঝলেন?
আফসারঃ কি আর বুঝব, সকলই পণ্ডশ্রম। বাঙ্গলার নবাব আলীবদী খাঁ পীড়িত- উদরী রোগে আক্রান্ত। তিন গভীর দুঃখ ও সহানুভূতি প্রকাশ করলেন। কিন্তু বেচারা দীর্ঘকাল পীড়িত্ত – কি করে মহাসমরের আয়োজন করেন। অযোধ্যার সুজা-উদ্দৌলা মারাঠীদিগের সহিত সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ। তিনি যুদ্ধবিগ্রহের নামে ভীত এবং সঙ্কুচিত। কিছুইতেই তাঁকে সম্মত করাতে পারলাম না। হায়দ্রাবাদের নিজামও অসম্মত।
