আমি হেসে বলি, তাহলে ব্রোথেলেই যাচ্ছো?
অনন্যা হেসে বলে, একবার যেতে চেয়েছিলাম। যে-রিকশাঅলা আমাকে নিয়ে যেতে আসতো, সে একদিন কই যাইবেন আফা বলতেই আমি বলি, বাদামতলির। পাড়ায় যাব, সেখানে চলো। রিকশাঅলা আমার দিকে পাগলের মতো তাকায়, শেষে আমার পায়ে পড়ে বলে, এমন কথা কইবেন না আফা, আপনারে আমি পাড়ায় লইয়া যাইতে পারুম না। তাই আমার আর ব্রোথেলে যাওয়া হয় নি।
আমি বলি, বড়ো দুঃখের কথা।
অনন্যা হাসতে থাকে, আমি তার মুখ দেখতে পাই না, কিন্তু তার হাসি দেখতে পাই; অনেকক্ষণ ধরে আমি তার তরুণ হাসি শুনতে থাকি, দেখতে থাকি, তার হাসির সুগন্ধ গ্রহণ করতে থাকি। যখন আমি অনন্যার সাথে টেলিফোনে কথা বলি তখন সিগারেট খাই না।
একদিন আটটা দশে টেলিফোন বাজে না, আমি একটু উৎকণ্ঠিত হই; ওই মুহূর্তে আমার ব্যক্তিগত সহকারিণী তাকে নিয়ে আমার কক্ষে ঢোকে। আমি বিব্রত হতে পারতাম, হওয়ারই কথা ছিলো, কিন্তু আমি বিব্রত হই না, আমি হঠাৎ আলোর। ঝলকানি বোধ করি, দাঁড়িয়ে অনন্যাকে অভ্যর্থনা করি। আমি কী করে পারলাম? আমার সহকারিণী অবাক হয় মর্মান্তিকভাবে, একটি তরুণীকে আমি এমন অভ্যর্থনা। করতে পারি, সে কখনো ভাবতে পারে নি; তাই সে সম্ভবত অনন্যাকে কোনো দেশের রাজকন্যা বলে মনে করতে থাকে, তার মাথায় একটা মুকুট খুঁজতে থাকে। সে কোনো মুকুট দেখতে না পেয়ে হতাশ হয়, কিন্তু আমি মুকুট দেখতে পাই। আমার কক্ষে সাধারণত ঢোকে দর্প অর্থ শক্তি দাস, সৌন্দর্য আর কোমলতা ঢোকে না; এই প্রথম সৌন্দর্য কোমলতার স্যান্ডলের স্পর্শে আমার কক্ষ শিউরে ওঠে, তাঁতের শাড়ির শোভায় বদলে যেতে থাকে। আমার চেয়ারটিতে আমার বসতে ইচ্ছে করে না, ওটাকে কোনো হাবশি বাদশার সিংহাসন বলে মনে হয়, ওটিতে আমি অস্বস্তি বোধ করতে থাকি; মনে হতে থাকে চেয়ারকার্পেটের জগত থেকে অনেক দূরে কোনো ঘাস খড় কাশবন।
ফড়িঙের জগতে যেতে পারলে আমি স্বস্তিতে বসতে পারতাম। সে সুন্দর, সেটা সুন্দরীর থকথকে সৌন্দর্য নয়, তার সৌন্দর্য চারপাশের কদর্যতার উল্লাসকে শান্ত করে আনে, তাকে দেখার পর সব ধরনের বাড়াবাড়িকে মনে হয় হাস্যকর। আমার কেনো যেনো নির্মলতা নিষ্পপতা ব্যাপারগুলো মনে পড়ে, যদিও আমি ঠিক নির্মলতা নিষ্পপতায় বিশ্বাস করি না, ওগুলোকে ভাবালুতাই মনে করি, তবু আমার ওগুলোর কথাই মনে পড়ে। এখন আর কারো ছোঁয়ায় মৃত প্রাণ ফিরে পায় না, কুষ্ঠরোগী সেরে ওঠে না; কিন্তু আমার মনে হতে থাকে সে যদি এখন কোনো মৃতকে ছোঁয়, তবে মৃত প্রাণ ফিরে পাবে; যদি কোনো কুষ্ঠরোগীর দিকে তাকায়, তবে ওই অভিশপ্ত দেবদূতের মতো। কান্তিমান হয়ে উঠবে। আমিও তার করুণা লাভ করি, আমার বয়স কমে যেতে থাকে ওই প্রায়-অপার্থিব উপস্থিতিতে; অপার্থিব বলছি এজন্যে যে তার উপস্থিতি আমার ভেতরে কোনো কামবোধ সৃষ্টি করে না, যদিও অমন কোনো বোধের উন্মেষ ঘটা বেশ স্বাভাবিক ছিলো; যেমন আমার ব্যক্তিগত সহকারিণী তরুণীটি বেশ চমৎকার তরুণী, কোনো বাড়াবাড়ি করে না, কিন্তু সে যততবারই আমার কক্ষে ঢোকে, আমি তার দিকে তাকালেও লঘু একটা কাম বোধ করি।
অনন্যা বলে, আপনি এতো উঁচুতে থাকেন, মাটি ঘাস নদী থেকে এতো ওপরে।
আমি হেসে বলি, পারলে আমি মেঘে থাকতাম।
অনন্যা বলে, কিন্তু সাততলায় উঠতেই আমার মাথা ঘোরাচ্ছে, লিফট আমি ভীষণ ভয় পাই, মেঘে থাকলে আপনার সাথে আর দেখা হতো না।
আমি বলি, তখন তোমার দুটি ডানা থাকতো, কোনো কষ্ট হতো না। ডানার কথায় সে বেশ প্রফুল্ল বোধ করে, এবং আমি আরো বলি, সাত কি সতেরো তলায় থাকার একটি সম্ভাব্য উপকারিতা আছে।
সে জানতে চায়, উপকারিতাটি কী?
আমি বলি, প্রয়োজনের মুহূর্তে লাফিয়ে পড়ে দ্রুত সমাধানে পৌঁছা যায়।
সে ভয় পায়, আঁতকে উঠে বলে, আপনার লাফিয়ে পড়ার প্রবণতা আছে না কি?
আমি বলি, কততবার আমি লাফিয়ে পড়েছি।
সে ভয় পায়, আর আমি তার চোখেমুখে বিস্ময় ছড়ানো দেখতে পাই; এতো বিস্মিত হয়েছে যে ভয় পেয়ে যাচ্ছে, যেনো এই সব আসবাবপত্র টেলিফোনদঙ্গল শীততাপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র পিসি জিসি টিসি তাকে গ্রাস করার জন্যে এগিয়ে আসছে।
অনন্যা বলে, আমার ভয় লাগছে।
আমি জানতে চাই, কেনো?
অনন্যা বলে, আমি কখনো এতো কিছু দেখি নি, এতো ঝকমকে কিছু দেখি নি। আমি একা হলে ভয়ে চিৎকার করে উঠতাম। আপনি ভয় পান না?
আমি বলি, এগুলো না থাকলেই আমি ভয় পেতাম, এগুলোই আমাকে সাহস দেয়, বারবার বলে ভয় পেয়ো না তোমার পেছনে আমরা সবাই আছি।
অনন্যা বলে, কিন্তু আপনার এখানে যে আমার আর আসার সাহস হবে না, এসবের কথা মনে হলেই আমার মাথা ঘোরাবে। আপনাকে আমি আর দেখতে পাবো না।
আমি বলি, তুমি তো পদার্থবিজ্ঞান পড়াও।
অনন্যা বলে, কিন্তু এসব পদার্থকে আমি ভয় পাই। আমার বোধ হয় উচিত ছিলো গ্রামে খালের পারে একটি কুঁড়েঘরে থাকা, মরিচ আর লাউ বোনা, একটি ছাগল। পোষা। অনন্যা নিঃশব্দে হাসতে থাকে।
কোনো নারীর মুখোমুখি হলে আমি প্রথমেই একটি জরিপ করে নিই, ব্রিজ তৈরি করতে হলে যেমন জরিপ করি, কয়েক মুহূর্তেই তার অবয়ব সম্পর্কে আমার একটি
স্পষ্ট ধারণা হয়ে যায়। তার পাড় কেমন, মাটির অবস্থা কী, ভিত্তিকূপ তৈরিতে কতোটা বিপর্যয় দেখা দেবে, এমন একটা জরিপ কয়েক মুহূর্তেই আমার করা হয়ে যায়, যেমন, অন্য পুরুষরাও করে; কিন্তু অনন্যার বেলা তা হয় না, আমার মন কোনো জরিপ করতে রাজি হয় না। তার কোনো দেহ আছে, দেহের সংস্থান অন্য নারীদের মতোই, সে-সংস্থান থেকে একই রকমে মধু উৎসারিত হতে পারে, এটা ভাবতে ঘেন্না লাগে–আমার। অনন্যা ওঠার জন্যে প্রস্তুত হয়। আমি তাকে চাও দিতে পারি নি; কী খাবে: তাও জিজ্ঞেস করতে পারি নি। তবে আমার ব্যক্তিগত সহকারিণীর দক্ষতা অসীম, সে। কোনো কিছুই বাদ রাখে নি, পাঁচতারা থেকে বাছাই করে সে সব নিয়ে এসেছে-তাকে, একটি প্রোমোশন দেয়া উচিত ছিলো; কিন্তু অনন্যা কিছুই ছুঁতে চায় না। শুধু এক। টুকরো চকোলেট কেক আর লাল চা। আমি তাকে নিচে নামিয়ে দিয়ে আসি, লিট সে ভয় পায়, তার মাথা ঘোরে; তবে লিফটে সে মাথা ঘুরে আমার ওপর পড়ে যায় নি, আমাকে বিব্রত করে নি। আমি তাকে পৌঁছে দেয়ার প্রস্তাব করতে পারি নি; সেটা বাড়াবাড়ি মনে হয় আমার; এমনকি পথ পর্যন্তও দিয়ে আসতে পারি নি, সেটাও মনে; হয় বাড়াবাড়ি।
