হিংস্র অস্ফুট চাপা স্বরে ক্রোধ হতাশা অপমানকে মুক্তি দিয়ে মণিদীপা বলে ওঠে, আপনি! শুধু আপনি! আর কেউ নয়। আর কিছু নয়। দয়া করে আমার আর ভাল করতে হবে না আপনাকে। এবার যান! যান!
এরকমভাবে ভেঙে পড়ার মেয়ে মণিদীপা নয়। দীপনাথ একটু অবাক হয়ে তাকাল। মণিদীপা পেছন ফিরে আবার ফুলদানিতে ফুল সাজাচ্ছে। কাঁদছে কি না তা পিছন থেকে বোঝা গেল না।
প্রথম ধাক্কাটা কাটিয়ে নিয়েছে দীপনাথ। গাঢ় এক ভালবাসা বহুকাল যাবৎ তার বুক থেকে ওই কিশোরীপ্রীতম মেয়েটির দিকে বয়ে যাচ্ছে। এত লোভনীয় বহুকাল যাবৎ তার কাছে আর কেউ নয়। এই তো সময়। উঠে গিয়ে শুধু একবার স্পর্শ করে বলতে পারে যে, তোমাকে ভালবাসি মণিদীপা। তা হলেই ও বুকের মধ্যে ভেঙে পড়বে, আর কোনওদিকে চাইবে না, তার হয়ে যাবে চিরকালের মতো। বড় অসুখী মণিদীপা, বহুকাল এই পরের ঘরে বাস করছে।
লোভ হল, বড় লোভ হল আজ। সমস্ত শরীর পিপাসায় উন্মুখ। পলকা ডিমসুতোর মতো একটু নীতিবোধের বাধা আছে বটে, সেটুকু ছিঁড়তে কষ্ট নেই।
ঘর ভাঙবে দীপনাথ? ভিতরে ভিতরে সেই সিরিওকমিক স্বরটা আবার বহুকাল বাদে শুনতে পেল সে।
ঘরই কি সব? ভালবাসা কিছু নয়?
ভালবাসার মানে হল ভাল-তে বাস করা। বাস করতে ঘর চাই, দীপনাথ। পাকা ঘর। নইলে আবার কোন ভালবাসার ঘুঘু এসে তোমার ভিটেতেও চরবে। ওকে বরং এই ঘরে স্থিতু হতে দাও। নিজের সুখ-অসুখ বুঝতে দাও। সওয়া নেই, বওয়া নেই, বিয়ে কি চাট্টিখানি কথা! কত সুখ-দুঃখ সয়ে, কত ঝড়ঝাপটা পেরিয়ে তবে স্বামী আর স্ত্রীর ভালবাসা হয়। ওদের সময় দাও আর-একটু।
দিলাম।
দীপনাথ ওঠে।
মিসেস বোস!
মণিদীপা খুব আস্তে মুখ ফিরিয়ে তাকায়। বড় চোখ, অবাক দৃষ্টি।
আমি আজ আসি।
একটু হাসল মণিদীপা, অনেকক্ষণ ধরেই যাই-যাই করছেন। এত তাড়া কিসের?
আমিও সুখে নেই। বড় জ্বালা, এক জায়গায় বেশিক্ষণ বসে থাকতে পারি না।
তাই বুঝি? আজ আমি কেবল ঝগড়া করলাম।
না। তা নয়। আপনার দুঃখ আমি বুঝি।
ধন্যবাদ। কিন্তু বেশি বুঝতে যাবেন না। তাতে বিপদ বাড়বে।
তার মানে?
বোস সাহেবকে ঘাটানোর দরকার নেই। ও আমাকে চায় না। আমি বরং চলেই যাব। আপনি শুধু কিছু টাকার ব্যবস্থা করে দিন ওকে বলে। আমার তো একটু ফুটিং চাই।
সেই দোকানের কথা এখনও মাথা থেকে যায়নি?
অন্য কোনও আইডিয়া আসছে না যে!
দোকান করাটা আমার পছন্দ নয় মিসেস বোস।
আচ্ছন্ন দৃষ্টিতে চেয়ে মণিদীপা মৃদু হেসে বলে, তবে কী পছন্দ?
ভেবে দেখি। বলব। কিন্তু যা বলব শুনবেন তো?
মণিদীপা মাথা নাড়ে, শুনব। আমাকে কেউ তো গাইডেন্স দেয়নি এতকাল। আমি ভারী একা হয়ে গেছি। এত একা সহ্য হয় না।
আমি আপনার ভাল চাই। ভীষণভাবে চাই।
মণিদীপা সত্যিকারের লজ্জায় মাথা নত করে বলে, জানি। খুব জানি।
আজ যাই।
আসুন।–বলে একটু থেমে মণিদীপা আরও মৃদু স্বরে বলে, এবার ফোন করলে কথা বলব।
দীপনাথ বোস সাহেবকে এতটাই জানে যে, খুব বেশি খোঁজ-খবর না করেই সে মেয়েটির পাত্তা লাগিয়ে ফেলতে পারল পরদিন।
বোস সাহেব বোকা নয়। সন্ধের মুখে দীপনাথ হঠাৎ বিনা এত্তেলায় তার খুপরিতে ঢুকলে দীপনাথের মুখের দিকে চেয়েই বোস সাহেব বুঝতে পারে, সামথিং রং।
বসুন চ্যাটার্জি। দীপনাথ বসে এবং বিনা ভূমিকায় বলে, মহুয়া আপনার কাজিন?
বোস স্তব্ধ ও স্থির হয়ে বসে থাকে। চোখ টেবিলে। বোস সাহেবের শরীরের যন্ত্রপাতি খুব ভাল নয়, দীপনাথ জানে। তাই ওই স্তব্ধতায় একটু ভয় পেল সে। কিন্তু তবু নীরবতা ভাঙল না। ব্যক্তিত্বের লড়াইতে প্রথম রাউন্ডটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
বোস সাহেব ঠিক এক মিনিট দশ সেকেন্ড বাদে বাঁ হাতের তর্জনীর ধার দিয়ে থুতনিটা ঘষে নিয়ে নড়ে বসল। তারপর খসখসে ভাঙা গলায় বলে, দরজাটা লক করে দিয়ে আসুন।
দরকার নেই। অফিস ফাঁকা।
বোস মাথা নাড়ল। মুখটা ফ্যাকাসে, অসহায়, ভিতু কেমন এক ধরনের হয়ে গেছে। হাতে একটা কাগজচাপা নিয়ে নাড়তে নাড়তে তেমনি অদ্ভুত গলায় বলে, দীপা কতটা জানে?
সামান্যই। অন্তত মহুয়ার কথা জানে না। শুধু জানে সামথিং ইজ কুকিং।
মহুয়া আমার ডিসট্যান্ট কাজিন।
তা যোক বোস সাহেব। ইট ইজ এ রং চয়েস।
উই হ্যাভ অ্যান আন্ডারস্ট্যান্ডিং ফ্রম অলমোস্ট চাইল্ডহুড। কিন্তু পারিবারিক বাধায় বিয়ে হতে পারেনি। ওর বাবা ছিল ভীষণ কনজারভেটিভ।
বাট ইট ইজ নাউ এ ডেড কেস।
বোস মাথা নাড়ে, না, রিলেশন না থাক, উই অলওয়েজ হ্যাড দ্যাট ফিলিং ফর ইচ আদার।
বোস সাহেব!–দীপনাথের গলাটা ধমকের মতো শোনায়, ব্যাপারটা ইনএভিটেবল নয়, আমি জানি।
আমি তা বলিনি।
তবে? আপনি অতীতকে খুঁড়ে বের করছেন।
দীপার সঙ্গে আমার রিলেশন তো আপনি জানেন। অথচ আই নিড সামওয়ান। যাকে বিশ্বাস করা যায়, যার ওপর নির্ভব করা যায়।
বোস সাহেব, আপনার এক ভাই এই অফিসে কাজ করে।
বোস অবাক হয়ে বলে, ও কিছু বলেছে?
না। তবে ও শুনেছে। ওর মুখে ঘেন্নার ভাব দেখলেই তা বোঝা যায়।
বোস সাহেব পিছনে মাথা হেলিয়ে বলে, দীপা অলসো উইল হেট মি। চ্যাটার্জি, আই অ্যাম সরি। কিছু করার নেই।
দীপনাথ বিদায় নেওয়ার একটা নাটকীয় এবং জুতসই ক্ষণের জন্য অপেক্ষা করছিল। একটা সাইকোলজিক্যাল মোমেন্ট। এই কথার পরই তা পেয়ে গেল সে। আচমকা উঠে দরজা ঠেলে বেরিয়ে এল।
৬৩. নিজের টেবিলে এসে অপেক্ষা
নিজের টেবিলে এসে অপেক্ষা করছিল দীপনাথ। একটু বাদেই বোস তার লম্বা মেদবহুল চেহারাটা নিয়ে ধীর পায়ে বেরিয়ে এল। মুখ ভীষণ ভাবালু, গম্ভীর। চোখে অনির্দিষ্ট দৃষ্টি।
