প্রাণপণে ওদের সঙ্গে তাল রেখে হাঁটে রাজু। টুসি সামনে থেকে বলে রাস্তায় পা দেবেন না। পিছল। ঘাসে পা রেখে আসুন।
কুঞ্জ সামনে থেকে মাঝে মাঝেই টর্চ ঘুরিয়ে ফেলে। বলে–এই তো এসে গেছি।
ফটকে ঢুকে অনেকখানি বাগান পার হয় তারা। তারপর অন্ধকার এক বাড়ির দাওয়ায় ওঠে।
এই তো সেই সুন্দর মেয়েটার বাড়ি। না? কী যেন নাম মেয়েটার! বনশ্রী। হ্যাঁ, বনশ্রীই।
রাজুর বুক ধক ধক করে ওঠে। প্রেম নয়। এত সহজে আর আজকাল প্রেম হয় না। রাজু জীবনে বহু মেয়ের সঙ্গে অনেক ঘনিষ্ঠভাবে মিশেছে। তবু যে বুক ধ্বক করে ওঠে তার কারণ অন্য। সে ভাবে আহা, ওই মেয়েটা যদি আমার বউ হত! ভাবে, তার কারণ আজকাল তার খুব বিয়ের ইচ্ছে হয়। প্রেম বা কাম বা গেরস্থালির জন্য নয়। সে চায়, সারা রাত তার একজন সঙ্গী থাক। তার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সদাসতর্ক একজোড়া চোখ তাকে নজরে রাখুক। তার কথা ভাবে এমন এক ঘনিষ্ঠ হৃদয় বড় চায় সে।
টুসি দরজায় ধাক্কা দিয়ে ডাকতে থাকে–মাসি! ও মাসি। এই বনাদিদি। চিরু। এই চিরু।
বনশ্রীর ঘুমই সব চাইতে পাতলা। বরাবর এক ডাকে ঘুম ভাঙে তার।
আজও ভাঙল। টুসির গলার স্বর না? এমনিতে বনশ্রীর ভয়টয় খুব কম। তবু মাঝ রাতে চেনা স্বর শুনেই সাড়া দিতে নেই বা দরজা খুলতে হয় না। তাই একটু অপেক্ষা করে বনশ্রী।
পাশের ঘর থেকে সবিতা পরিষ্কার গলায় বলে ওঠেন-কে রে? কী হয়েছে?
বাইরে থেকে টুসি বলে–মাসিমা, আপনাদের গরম জলের ব্যাগটা নিতে এসেছি। বউদির খুব অসুখ।
দাঁড়া। দিচ্ছি। বলে সবিতাশ্রী উঠতে যাচ্ছিলেন বোধ হয়।
বনশ্রী লেপ সরিয়ে উঠে পড়ে। বলে–মা, তুমি উঠো না। আমিই উঠেছি।
বউটার কী হয়েছে জিজ্ঞেস করিস তো। সবিতাশ্রী উদ্বেগের গলায় বললেন।
বাইরের ঘরে এসোশ্রী দরজা খোলে এবং একটু সংকুচিত হয়ে পড়ে। টুসির পিছনে কুঞ্জ দাঁড়ানো আর তার পিছনে বারান্দার বাইরে উঠোনের মলিন জ্যোৎস্নায় দাঁড়িয়ে রয়েছে রাজু।
কপাটের আড়ালে ঘরে এসে বনশ্রী বলে– সাবির কী হয়েছে?
টুসি কলকলিয়ে মিথ্যে কথা বলল, আর বোলো না, পিছল উঠোনে পড়ে গিয়ে খুব লেগেছে।
– সর্বনাশ। বনশ্রী একটু শিউরে ওঠে, তারপর চাপা গলায় বলে-পোয়াতি ছিল যে!
সেই তো। রক্ষে হল না বোধ হয়।
দাঁড়া, ব্যাগ এনে দিচ্ছি।
দ্রুতপদে কাশী মায়ের ঘরে ঢোকে। দেয়ালে পুরনো ন্যাকড়ায় বাঁধা ব্যাগটা যথাস্থানে ঝুলছে। এ বাড়িতে সব জিনিস নিখুঁত গোছানো। জায়গার জিনিস সব সময়ে ঠিক জায়গায় পাবে। রবারের ব্যাগটা রাখাও হয়েছে ভারী যত্নে। জল ঝরিয়ে কনো করে, ফুঁ দিয়ে একটু হাওয়া ভরে ফুলিয়ে ছিপি এঁটে।
বনশ্রী সেটা এনে টুসির হাতে দিয়ে বলে কী হবে তা হলে?
–কী করে বলি?
— আমি যাব?
-এত রাতে আর তোমার যেয়ে দরকার নেই। সকালে যেয়ো। যা হওয়ার তো হয়েই গেছে।
–সাবি বাঁচবে তে, ও কুঞ্জদা?
কুঞ্জ চুপচাপ ছিল এতক্ষ, এবার এক পা এগিয়ে এসে বলল–বেঁচে যাবে।
শ্রীকুর দিকে চেয়ে বলে চিকিৎসা আপনি করছেন না তো?
কুঞ্জ ম্লান হেসে বলে-না না। আমার ওষুধে ওরা কেউ বিশ্বাস করে না।
টুসি তাড়া দিয়ে বলে– চলো বড়দা।
ওরা চলে যাওয়ার ও কিক্ষণ বনশ্রী দরজা বন্ধ করল না। দু হাতে দুই পাল্লা ধরে দাঁড়িয়ে রইল। বাইরে মেঘ ভেঙে সামান্য জ্যোৎস্না ফুটেছে। অল্প কুয়াশা। প্রচণ্ড শীত। বনশ্রীর বেশ লাগছিল চেয়ে থাকতে। এমনিতে দেখার কিছু নেই। সেই রোজকার দেখা একই বাগান, গাছপালা। তবু রঙের একটা অদল বদল, দু-একটা চৌকস তুলির টানে চেনা ছবিটা কত গম্ভীর হয়ে গেছে। রাজু ওদের সঙ্গে এসেছিল কেন তা কিছুতেই ভেবে পায় না বনশ্রী। কেনই বা ওর মন খারাপ।
.
ঝরঝরে রোদ মাথায় করে ভোর হল। বনশ্রীর দিন শুরু হয় খুব ভোরে। বিছানাপাটি তুলে ঘরদোর গুছিয়ে সে যখন একটু অবসর পেয়ে ভোর দেখতে বাইরের বারান্দায় এসে দাঁড়াল তখনও সে অন্যমনস্ক। সিঁড়ির ধাপে পা রেখে দাওয়ায় বসে সে নিজের একরাশ খোলা চুলের জট ছাড়ায় আঙুলে। আর ভাবে।
বাইরের ঘরে জনা দশ-বারো ছাত্রকে বসিয়ে পড়াচ্ছেন সত্যব্রত। পড়ানোর শব্দ ভাল লাগছিল না বনশ্রীর। খানিকক্ষণ বসে সে উঠে পড়ল। বাগানের ভিতরে বেড়াতে বেড়াতে চলে গেল অনেকটা। নির্জনে একা একা থাকতে ইচ্ছে করছে আজ। অলস লাগছে।
সাইকেলের শব্দে বনশ্রী ফিরে দেখে, ঝকঝকে মুগার পাটভাঙা পাঞ্জাবি, ধোয়া শাল আর ধবধবে সাদা ধুতি পরা রেবন্ত সাইকেলের মুখ ঘুরিয়ে ফটক দিয়ে সোঁ করে ঢুকে পড়ল। এত সকালেও গালের দাড়ি কামানো। ভারী সুন্দর দেখাচ্ছে ওকে। কিন্তু মুখখানা গম্ভীর।
দেখে একটু আড়ষ্ট হয়ে গিয়েছিল বনশ্রী৷ রেবন্ত অনেকটা এগিয়ে গেছে ভিতরবাগে।
পিছন থেকে বনশ্রী হঠাৎ ডাকল–রেবন্তদা!
সেই ডাকে সাইকেলটা দুটো মস্ত টাল খেল। যেন পড়ে যাবে। পড়ল না অবশ্য। রেবন্ত লম্বা পা বাড়িয়ে ঠেক দিয়ে ফিরে দেখল তাকে।
বনশ্রী হেসে বলল–এত সকালে?
সাইকেলটা হাঁটিয়ে নিয়ে রেবন্ত আস্তে আস্তে কাছে আসে। মুখে হাসির একটা চেষ্টা আছে, কিন্তু আসলে ওর মনে যে হাসি নেই তা দেখলেই বোঝা যায়।
হালকা হওয়ার জন্যই বনশ্রী বলল–একেবারে জামাইবাবু সেজে এসেছেন যে! ওমা। কী সুন্দর, দেখাচ্ছে।
ফর্সা রেবন্তর মুখটা লাল হল একটু। গলা সামান্য ভাঙা, একটু কাশি আছে সঙ্গে। সেই গলাতে বলল–আমি একটা কথা জানতে এসেছি না।
