—কত গল্প শোনাতে গন্ধ, সব ভুলে গেছ?
—গল্প?
—হ্যাঁ হ্যাঁ, পরস্তাব।
গন্ধ ফোকলা মুখে হাসে হঠাৎ।
—মনে থাকে না কিছু।
মানুষের বুড়ো বয়সের কথা ভেবে ভারী একটু দুঃখ হয় সোমেনের। তার বাপ দাদা গন্ধ বিশ্বেসের কাঁধে চড়েছে। সেই আমান মানুষটা কেমন লাতন হয়ে বসে গেছে এখন।
—যাই গন্ধ। বলে সোমেন ওঠে।
পুবের মাঠ রবিশস্যের চাষ পড়ে গেছে। সেই চৈতি ফসলের জমি চৌরস করছে বহেরুর লোকজন। দিগম্বরের খোলের শব্দ ওঠে হঠাৎ। পৃথিবীকে আনন্দিত করে বয়ে যেতে থাকে শব্দ। গাছগাছালির ছায়ায় ছায়ায় রোদের চিকরি-মিকরি। বুনো গন্ধ, মাটির সুবাস।
বেলায় বিন্দু এল তার রান্নার জোগাড় নিয়ে। ঘরের পাশেই বাবার ছোট্ট পাকশাল। কাঠের জ্বালে রান্না হয়। স্তূপ করে কাটা আছে কাঠ, পাঁকাঠি। কাঠের জ্বালে অনভ্যস্ত রান্না রাঁধতে কাল তার চোখ জ্বলে ফুলে গিয়েছিল। বিন্দুকে বলল—আজ তুমিই বেঁধে দিয়ে যাও। আমার ইচ্ছে করছে না।
বিন্দু চোখ বড় করে বলে—আমি রাঁধব? কাকা তা হলে কেটে ফেলবে।
—কাকা? কাকা আবার কে?
বিন্দু মাথাটি নামিয়ে প্যাঁকাটির আগুনে কাঠের জাল তুলতে তুলতে বলে—কে আবার! বহেরু বিশ্বেস।
ভারী অবাক হয় সোমেন। বহেরু ওর কাকা হয় কী করে? সবাই জানে, বিন্দুর মা বহেরুর দ্বিতীয় পক্ষ। বিন্দুও কি জানে না যে ওই বুড়ো, অক্ষম গন্ধ বিশ্বেসের বিকৃত অঙ্গ থেকে ও জন্মায়নি?
বিন্দু মুখ তুলে বলে—চাল ধুয়ে দিয়েছি, তরকারি মাছ সব কোটা আছে, মশলা বেটে দিয়েছি, আমি সব দেখিয়ে দেব, বেঁধেবেড়ে নিন।
—কলকাতায় হোটেলে রেস্টুরেন্টে আমরা বারো জাতের ছোঁয়া খাই।
—সে কলকাতায়। এখানে নয়।
অগত্যা উঠতে হয় সোমেনকে।
গনগনিয়ে আঁচ ওঠে। বড় তাপ, ধোঁয়া। বিন্দু এটা-ওটা এগিয়ে দেয়, উপদেশ দেয়, হাসেও। এত কাছাকাছি এমন ডগবগে মেয়ে থাকলে কোন পুরুষের না শরীর আনচান করে! সোমেনের কিন্তু—আশ্চর্যের বিষয়—করল না। বরং সে কেমন নিবু নিবু বোধ করে মেয়েটার সামনে। কেন যে! সে কি ওই প্রচণ্ড শরীর, প্রচুর ভিটামিন, প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট, ক্লোরোফিলে ভরা অতিরিক্ত উগ্রতার জন্য? হতে পারে। অত যৌবন সোমেনের সহ্য হয় না। ওই উগ্র শরীরের সঙ্গে টোক্কর দেওয়ার মতো ভিটামিন তার নেই। মেয়েটা কিন্তু টোক্কর দিতেই চায়। ছলবল করে কাছে আসে, যেন বা ছুঁয়ে দেবে, ঘাড়ের ওপর দিয়ে মুখ বাড়িয়ে বলে, ফুলকপিটা আরও সাঁতলান, নইলে স্বাদ হবে না। তার শ্বাস সোমেনের ঘাড়ে লাগে। সোমের সরে বসে, মেয়েটা অমনি জিভ কেটে বলে—ছুঁয়ে দিচ্ছিলাম আর কী! তারপর হাসে। সোমেন নপুংসকের মতো ভীত বোধ করে মেয়েটির কাছে। বহেরুকে ও কাকা ডাকে কেন তা কিছুতেই ভেবে পায় না। গা-টা একটু ঘিন ঘিন করে তার।
নিজের ভিতরে ভিটামিনের বা প্রোটিনের, বা ওইরকম একটা কিছুর অভাব সে চিরকাল বোধ করে এসেছে। বহেরুর খামারবাড়িতে এই যৌবন বয়সে সেটা তার কাছে আর একটু স্পষ্ট হয়।
সোমেন একটু আলগোছে, সতর্কভাবে জিজ্ঞেস করে—শ্বশুরবাড়ি কতদূর?
মেয়েটার মুখভাব পালটায় না, হাসিখুশি ভাবটা বজায় রেখেই বলে—কাছেই। বর্ধমান।
—যাও-টাও না?
—না।
—কেন?
—বনে না।
সোমেনের আর কিছু জিজ্ঞেস করতে সাহস হয় না।
মেয়েটা নিজে থেকেই আবার বলে—আমারই দোষ কিন্তু। আমার শ্বশুর-শাশুড়ি ননদ দেওর কেউ খারাপ না।
—তবে?
—যে-মানুষটাকে নয়ে শ্বশুরবাড়ি সেই লোকটাকেই আমার পছন্দ নয়। এমনি মানুষটা মন্দ না, দেহতত্ত্বটত্ত্ব গেয়ে বেড়ায়, এক বোষ্টমের কাছে নাম নিয়েছে। নিরীহ মানুষ। তবে তার কোনও সাধ আহ্লাদ নেই। মেড়া। সে আমার পা চাটত, এমন বাধুক ছিল।
—তবে?
—সেই জন্যই তো বনে না। আমি লাঠেল মানুষ পছন্দ করি।
সাদা দাঁতে চূড়ান্ত একটা অর্থপূর্ণ হাসি হাসল। সোমেন ভিতরে ভিতরে আরও মিইয়ে যায়।
—সে কীরকম? সোমেন জিজ্ঞেস করে।
—ধামসানো আদর সোহাগ যেমন করবে, তেমনি আবার দরকার মতো চুলের মুঠ ধরবে।
বাঁ হাতের কালোজিরের পুঁটলিটা নাকের কাছে ধরে শ্বাস টানে বিন্দু। চোখে চোখ রাখে। সোমেন চোখটা সরিয়ে নেয়। মেয়েটা পুরুষচাটা। বুকের ভিতরটা গুর গুর করে ওঠে সোমেনের, অস্বস্তি লাগে। একবার ভেবেছিল, আজ রাতটা কাটিয়ে কাল ফিরে যাবে কলকাতায়। বাবার সঙ্গে যদি দেখাটা হয়ে যায়। কিন্তু মেয়েটাকে তার ভাল লাগছে না। রাতবিরেতে এসে যদি ঠেলে তোলে! কিছু বিচিত্র নয়। বহেরুর মেয়ে, নিজের পছন্দমতো জিনিস দখল পেতেই শিখে থাকবে। মনে মনে ঠিক করে ফেলে সোমেন, আজ রাতেই ফিরবে। আটটার কিছু পরে বোধ হয় একটা শনিবারের স্পেশাল ট্রেন যায় হাওড়ায়। বিকেল পর্যন্ত বাবার জন্য দেখে ওই ট্রেনটা ধরতে সুবিধে।
ভিটামিনের অভাব তাকে কতটা ভিতু করেছে তা ভাবতে ভাবতে নেয়েখেয়ে দুপুরে ঘুমলো সোমেন।
বিকেলে জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখছিল, পোষা বেজি কাঁধে বহেরু এল সে সময়ে। বলল—চলে যাবেন?
—হ্যাঁ।
—একটা কথা বলি।
—কী?
—ব্রজকর্তা এখানে থাকে থাক। অযত্ন হবে না। এখানে বামুন মানুষ নেই। ব্রজকর্তাকে তাই ছাড়তে চাই না। আরামেই আছে। সোমেন উত্তর দিল না। উত্তর জানা নেই।
একগোছা টাকা হাতে ধরিয়ে দিল বহেরু। বলল—কোমরে আন্ডারপ্যান্টে গুঁজে নেবেন। ঠাকরুনকে বলবেন এবার ধানের দর ভাল। আপনি না এলে মানি-অর্ডার করে দিতাম। আজ কী কাল।
