অজিত এ বাবদে আর কথা বলতে ভরসা পান না।
সিঁড়ি বেয়ে ব্রজগোপাল লবিতে আসেন। রণেন বাধ্য ছেলের মতো ব্রজগোপালের পায়ে পায়ে হাঁটছে। তার মুখে অন্যমনস্কতা, আর বিষাদ, জমিটার ব্যাপারে আর কোনও কথা বলতে আসেনি রণেন। কথা ছিল, ও বউয়ের নামে জমিটা কিনবে। এখনকার নামে যে লক্ষ্মণের জমিটা কেনা হবে তা সঠিক বুঝতে পারছে না অজিত।
ব্রজগোপাল লবি পার হয়ে পেভমেন্টে নেমে দাঁড়ালেন। বললেন—অজিত, তুমি ফিরে যাও বরং। কাজের ক্ষতি হচ্ছে।
কাজ বলতে ব্রজগোপাল কী বোঝাচ্ছেন তা বুঝতে পারে না অজিত। উনি তাকে তাস খেলতে দেখেছেন। বলা যায় না, কুমুদ বোসের দু-একটা রসিকতাও হয়তো কানে গিয়ে থাকবে। তাস খেলাটাকেই ‘কাজ’ বলে ঠাট্টা করছেন নাকি? অবশ্য ঠাট্টা করার লোক নন।
অজিত বলে—না, ক্ষতি হবে না। এইটুকুতে কী আর ক্ষতি?
—তবু তুমি তো ইনচার্জ। তুমি ফাঁকি দিলে কর্মচারীরাও ফাঁকিই শিখবে।
অজিত হেসে বলে—টিফিন শেষ হতে এখনও কিছু বাকি আছে।
—ও।
অজিত কবজির ঘড়িটা আড়চোখে দেখে নেয়। টিফিনের টাইমটা হড়কে গেল। শেষ কয়েকটা ডিল খেলা গেল না। খুব জমেছিল আজ। শ্বশুরের দিকে চেয়ে বলল—আমাদের বাসায় তো আসেন না।
—দূরে থাকি। সময় পাই না। দুর্বল অজুহাত দেন ব্রজগোপাল।
—আপনার মেয়ে আপনার কথা খুব বলে।
—হুঁ! বলে ব্রজগোপাল একটু অন্যমনস্ক হয়ে যান। ছেলেমেয়েরা তাঁর কথা বলে এটা যেন ঠিক তার বিশ্বাস হতে চায় না।
—একদিন যাব গোবিন্দপুরে। অজিত বলল।
ব্রজগোপাল একটা শ্বাস ফেলে জামাইয়ের মুখের দিকে তাকাল। বিশ্বাস করেন না, তিনি কলকাতার লোকের মুখের কথা বিশ্বাস করেন না। তবু মাথা নেড়ে বললেন—যেয়ো। জায়গাটা ভালই লাগবে।
একটু অন্যমনস্ক রইলেন ব্রজগোপাল। পেভমেন্টে গা ঘেঁষে অচেনা লোকেরা চলে যাচ্ছে। হাজার লোকের ভিড়ে এক অদ্ভুত অন্যমনস্কতাবশত তিনি বললেন—শীলার মুখটা ভুলেই গেছি। কতকাল দেখি না।
—আজই তো যেতে পারেন বাসায়, শীলা ভীষণ খুশি হবে।
ব্রজগোপাল জামাইয়ের মুখে মেয়ের নাম শুনে বোধ হয় একটু বিরক্ত হন। অজিত লক্ষ করে। ব্রজগোপাল বললেন—আগে প্রথা ছিল ছেলেপুলে না হলে মেয়ের বাড়িতে তার বাপ-মা যায় না।
অজিত সামান্য হাসে। ছেলেপুলে না হলে—কথা লক্ষ্য করেই হাস্য। বলল—ওসব তো প্রাচীন সংস্কার। না মানলেই হল।
ব্রজগোপাল মাথা নেড়ে বলেন—সংস্কারটা ভাল না মন্দ তা না জেনে ভাঙতে আমার ইচ্ছে করে না। তার দরকারই বা কী! আমরা বুড়ো হয়েছি, সব জায়গায় যাওয়া সম্ভব না হতে পারে। তোমরা যেয়ো।
—যাব।
রণেন একটু এগিয়ে রাস্তার ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়েছিল। একটা খালি ট্যাক্সি দাঁড় করিয়ে ডাকল—বাবা, আসুন।
ব্রজগোপাল বিরক্তির স্বরে বললেন—ট্যাক্সি নিলে নাকি?
—হ্যাঁ। রণেন কুণ্ঠিত ভাব দেখায়।
—কেন?
—এ সময়টায় বড্ড ভিড়। ট্রামে বাসে ওঠা যায় না।
—ভিড় হলেও তো লোকে যাচ্ছে আসছে! আমাদের বাবুগিরির কী দরকার?
ট্যাক্সিটা ছেড়ে যেতে অজিত সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ধরাল। আজ টিফিন খায়নি। খিদে পেয়েছে।
কিছু খাবে বলে ফুটপাথের হরেক টিফিনওয়ালাদের দিকে কয়েক কদম এগিয়েও গিয়েছিল সে। হঠাৎ মনে পড়ে যায়, শীলা বলেছিল ভাল চকোলেট নিয়ে যেতে। আর ঝাল আচার। আর চানাচুর। এই প্রথম শীলা এসব খেতে চাইছে। তার অর্থ, প্রেগন্যান্সির কোনও গোলমাল নেই।
ছোরার মারের মতো একটা তীক্ষ্ণ ও তীব্র আনন্দ বুক ছুঁড়ে দেয় হঠাৎ। এত তীব্র সেই আনন্দের অনুভূতি যে অজিতের শ্বাসকষ্ট হতে থাকে, হাত পায়ে রিমঝিম করে একটা ঝিঁঝি ছাড়ার মতো হতে থাকে।
অজিত অফিসের সিঁড়ি ভেঙে উঠে যায়।
আই-বি-এম মেশিনগুলি সঙ্গমকালীন সুখের শব্দ তুলে চলছে। মেশিনগুলির পাশ দিয়ে হালকা পায়ে চলে যায় অজিত। অফিসার সেনগুপ্তর টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।
—সেনদা!
উঁ। বলে সেনগুপ্ত মুখটা তোলেন। হাসেন।
—আজ চলে যাচ্ছি।
—কী একটা খবর শুনছি!
—কী?
কুমুদ বোস বলে গেল। বউমার নাকি—
অজিত দাঁতে ঠোঁট কামড়ে বলে—একদিন বোসটাকে ঠ্যাঙাব সেনদা।
—মুখটা খারাপ, নইলে লোকটা খারাপ না। বলছিল—
—কী বলছিল?
—বলছিল, ম্যাজিসিয়ানের সব বিফলে যাচ্ছিল, আসল ম্যাজিকটা এতদিন দেখাতে পারছিল না। বউয়ের পেটে দুনিয়ার সবচেয়ে আশ্চর্য ম্যাজিকটা দেখাতে না পারলে নাকি সব বৃথা। বলে সেনগুপ্ত মোটা শরীরে দুলে দুলে হাসেন—সেটা এতদিনে দেখিয়েছে ম্যাজিসিয়ান।
—এখনও কিছু বলা যাচ্ছে না। সেনদা, আজ যাচ্ছি।
—যাও। কিন্তু আমার পড়ার স্কুলে একটা চ্যারিটি শো দিতে হবে, মনে থাকে যেন। বিনা পয়সায়।
—আমার তো টেবিল-ম্যাজিক। শো দিতে অ্যাপারেটাস লাগে।
—ওসব শুনছি না। আমি কথা দিয়ে রেখেছি। ফান্ডের অভাবে স্কুলটা উঠে যাবে হে৷ আমি সেক্রেটারি হয়ে বসে বসে দেখব?
—আচ্ছা।
অজিত অফিস থেকে বেরোবার আগে আর একবার আই-বি-এম মেশিনগুলির সামনে দাঁড়ায়। কতকাল ধরে এই সব মেশিন সে ঘাঁটছে। একঘেয়ে সব শব্দ। কিন্তু আজ শব্দটা অন্য রকম শোনায়। রতিক্রিয়াকালে শ্বাসবায়ুর মুখের শব্দ, দাঁত ঘষার শব্দ, চুম্বনের শব্দ—সব মিলেমিশে একটা তীব্র কম্পন উঠছে। অজিতের বুক এ-ফোঁড় ও-ফোঁড় করে একটা আনন্দ ছোরা মারে আবার। বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো শরীর চমকায়।
