এতক্ষণ আপনি-আজ্ঞে করছিল, হঠাৎ গলা নামিয়ে নয়নতারা বলে—বলো তো, একটা বয়সের ছেলে আর একটা বয়সের মেয়ের দিকে যখন তাকায় তখনই সব সময়ে একটা কিছু পাপ ইচ্ছে জাগে কিনা? যেখানেই হোক, যখনই হোক, চেনা বা অচেনা যা-ই হোক, হয় কিনা-ওরকম? আমার তো মনে হয়, না হয়ে যায় না।
ভারী বিস্ময় বোধ করে রণেন শুয়ে থাকে। ভাবে। এবং আশ্চর্য হয়ে বোধ করে, ঠিক তাই। চোখে চোখে যৌনতার বীজ ছড়ায় বটে। নিজেকে দিয়েই সে বুঝতে পারে। যখন ভিড়ের মধ্যে, যখনই নিঃসঙ্গতায়, যখনই কখনও বয়সের মেয়ের দিকে চেয়েছে তখনই মনে হয়নি কি—ওই ওটা হচ্ছে মেয়েছেলে! হাঁ হাঁ বাবা, মেয়েছেলে। আর মেয়েছেলের মানে কী? মানে তো একটাই—পুরুষের কাছে মেয়েছেলের যা মানে হতে পারে। এই রকমই যৌনতার বীজাণুযুক্ত চোখ বটে আমাদের। এইজন্যই কী রামকৃষ্ণদেব বলেছেন—মাতৃভাব হৃদয়ে না এলে মেয়েদের ছুঁতে নেই। এমনকী মুখ দর্শন না করাই ভাল!
রণেন লজ্জা-টজ্জা পেল না, সে বয়স পেরিয়ে এসেছে। তা ছাড়া নয়নতারার কাছে লজ্জাই বা কী? বলল—মাইরি, কেবল জাঁতিটার দিকেই চোখ ছিল আমার!
নয়নতারা বিছানায় পড়ে-থাকা জাঁতিটা তুলে তার হাতে ফের ধরিয়ে দিয়ে বলল—তা হলে জাঁতিটাই দেখ। ভাল জিনিস। মুরগিহাটা থেকে বাবা কিনে এনেছিল, স্টেনলেস ইস্টিলের। অনেক দাম।
তখন জাঁতিটা ফেলে নয়নতারার হাত ধরতে কোনও বাধা হল না আর। তখন মনে মনে রণেন বলল—মেয়েছেলে, হাঁ হাঁ বাবা মেয়েছেলে! মেয়েছেলের মানে তো একটাই হয় পুরুষের কাছে।
চোখে চোখ রেখে নয়নতারা বলে—ঠিক বলিনি?
—ঠিকই বলেছ। ভেবেটেবে দেখলাম, জীবনের কোনও মানেই হয় না। এক-আধটা যা মানে করা যায় তার একটা হচ্ছে টাকা, অন্যটা মেয়েছেলে।
নয়নতারা ফের আপনি-আজ্ঞেয় ফিরে গেল। বলল—আমি মোটেই সে-কথা বলিনি আপনাকে।
—বলোনি?
—না, কেন বলব? টাকা আর মেয়েছেলে ছাড়া জীবনে আর কিছু থাকে না নাকি? সে আবার কীরকম? কত কিছু আছে!
—আমি তো খুঁজে পাই না।
নয়নতারা হাসল, বলল—আপনি আচ্ছা একটা লোক। অনেক ভেবেচিন্তে একটা কঠিন কথা বের করেছিলাম মাথা থেকে, সেটা জল করে দিলেন। জটিল কথা অত সহজে বোঝা যায় না।
নয়নতারারও বয়স হল, রণেনের চেয়ে বড়জোর এক-দুবছরের ছোট হতে পারে। বহেরুর প্রথম পক্ষের মেয়ে। গাঁ ঘরের তুলনায় ফরসা, মুখটায় সর্বদা একটা হাসি-মাখানো সহৃদয় ভাব, সকলের সঙ্গে ভাল ব্যবহার করে, রাগ নেই। সেই ব্যবহারটাই আবার প্রেম-ট্রেম বলে ভুল করে লোকে। চোখ দু’খানা বড়, নাক-টাক, ঠোঁটের কায়দা সব মিলিয়ে একরকম চটক আছে। বুদ্ধি বোধ হয় বেশি রাখে না, হাসিখুশি মেয়েদের বুদ্ধি কম হবেই, কিন্তু এক-আধটা কথা বলে বড় মারাত্মক। যেমন এই পাপ-ইচ্ছের কথাটা।
বিকেল পর্যন্ত নয়নতারার হাতখানা মাঝে মাঝে ধরে রইল রণেন। হাতটা থেমে গেল, গলে গেল, কিন্তু সহৃদয়া নয়নতারা তা ফেরত নিল না। ভাগ্যিস শীতের বিকেল কিছু তাড়াতাড়ি আসে! অবশ্য রণেন হাতের বেশি এগোবার উৎসাহও পাচ্ছিল না। মেয়েমানুষ কথাটা তার মধ্যে মাঝে মাঝে বজ্রাঘাত করছিল তখন। মেয়েমানুষের গায়ে কাল রাতে জীবনে প্রথম হাত তুলেছিল রণেন। এ পাপ কি স্খালন হওয়ার?
নয়নতারা মুখের ওপর একটু ঝুঁকে বলে—বাবা একটা মানুষের চিড়িয়াখানা বানাচ্ছে, শুনেছেন?
—সে কীরকম? বিষণ্ণ রণেন জিজ্ঞেস করে।
—সে চিড়িয়াখানায় থাকবে অদ্ভুত সব মানুষ। খুব বেঁটে, খুব লম্বা, খুব সুন্দর, খুব কচ্ছিৎ, হিজড়েও থাকবে। আরও থাকবে নানারকম। সাহেব থেকে সাঁওতাল। যত আজব মানুষ হতে পারে সব এনে জড়ো করবে। যদি বলেন তো বাবাকে আপনার কথা বলে দিই।
—কেন?
—বাবা ঠিক চিড়িয়াখানায় ভরতি করে নেবে আপনাকে।
হাতটা তখন ছেড়ে দিল রণেন।
নয়নতারা তখন দুঃখের গলায় বলে—আপনি পালটে গেছেন।
—একটু মোটা হয়ে গেছি বলে বলছ?
—তাই হবে বোধ হয়। একটা সময়ে আপনি খুব ভিতু ছিলেন, মেয়েমানুষকে বড় ভয় ছিল আপনার।
রণেন সনিঃশ্বাসে বলে—এখনও আছে।
নয়নতারা হাসে, বলে—সে মেয়েমানুষের ভয় নয়, এ বয়সের পুরুষ ডরায় কেবল বউকে, মেয়েমানুষকে নয়।
আবার চমকায় রণেন। ঠিক কথা, হক কথা। বলে—তুমি বেড়ে কথা বলছ আজ।
নয়নতারা জাঁতিটা ফের তুলে নিয়ে বলল—তখন আমাকে বড় ভয় ছিল আপনার, আজ আর নেই।
—সেটা ভাল, না খারাপ?
—খারাপ।
—কেন?
—ভয়ডর থাকাই ভাল।
—বউ কি মেয়েমানুষ নয়? তাকে তো ডরাই ঠিকই।
—দূর! বউ বিয়ের পর আর মেয়েমানুষ থাকে নাকি? পাশবালিশ হয়ে যায়।
কথাটা কতদূর অশ্লীল ও সত্য তা চোখ কপালে তুলে ভাবে রণেন। তারপর বলে—শুধু পাশবালিশ?
সে কথার উত্তরে নয়নতারা বলে—তা নয় অবশ্য, রাতের পাশবালিশ আর দিনের দারোগা-পুলিশ।
তারপর সে কী হাসি হেসেছিল সে। সারাটা দিনে কাল রাতের পাপবোধ অনেকটাই ধুয়ে মুছে দিয়েছিল। আংটিটা চাইবে বলে ভেবে রেখেছিল রণেন, তা আর চাইতে ভুলে গেল।
নয়নতারা বলে—আমাদেরও একটু একটু ভয় খাওয়া ভাল।
—কেন?
—স্বামী নেয় না বলে আমাকে সবাই কুমড়োলতা ভাবে, মাচান দিতে চায়। সে সব লোক আমার ভাল লাগে না। আমি লতানে গাছ নই, লতার মতো দেখতে যে জীব তাই। বিষ-দাঁত আছে।
—তোমার মনে পাপ। রণেন চোখ বুজে বলেছিল।
