আলো-আঁধারে ঠিক চিনতে পারেননি ব্রজগোপাল। ঠাহর করে দেখেই চমকে ওঠেন। বুকের ভিতরটা ধক ধক করে। বহেরু ঝুঁকে দেখে বলে—রণেনবাবু না?
ব্রজগোপাল সর্বদাই দুঃসংবাদের অপেক্ষা করেন। বয়সটা ভাল না। ননীবালার বা তাঁর নিজের। গলাটা সাফ করে নিয়ে বলেন—তুমি?
রণেনের গলার স্বরটা ভারী মৃদু, বলে—দুপুরে এসেছি, তখন থেকে বসে আছি।
—ও। তা খবর কী? খারাপ খবর নাকি?
—না না। আপনার শরীর খারাপ খবর পেয়ে এলাম।
—চিঠি দিয়ে আসতে পারতে, তা হলে আর যেতাম না বর্ধমান। আমিও দুপুরের দিকেই গেছি। কিছু বলবে?
—কেমন আছেন এখন?
—ভাল। একটু বুকে ব্যথা হয়। বোধ হয় হার্টটার জন্যই। তা এই বয়সে আদিব্যাধি তো হবেই। চিন্তা কী?
—কলকাতা শীগগীর যাবেন-টাবেন না?
—যাব-যাব তো রোজই করি। হচ্ছিল না। শরীরটার জন্যই। দু-চারদিনের মধ্যেই যাব।
—সেই জমিটার ব্যাপারে—
ব্রজগোপাল থমকে যান। পুরনো অভিমানটা বুকের ব্যথার মতোই ঘনিয়ে ওঠে। এরা কেবল দশটি হাজার টাকা চায়, তার জন্যই এত যাওয়া-আসা, এত খোঁজখবর!
ব্রজগোপাল গলাটা পরিষ্কার করে নিয়ে বলেন—জমিটা তোমরা কিনা। আমি কয়েকদিনের মধ্যেই গিয়ে টাকা দিয়ে আসব।
বড় ছেলের চেহারায় ঘরগৃহস্থালির ছাপ পড়ে গেছে। কচি-ভাবটি আর নেই। বরাবরই ছেলেটা মা-বাপ ন্যাওটা, শান্ত প্রকৃতির, আর একটু বোকাসোকা ছিল। এখনও প্রায় তাই আছে, তবে বোধ হয় এখন মা-বাপের জায়গায় বউয়ের ন্যাওটা হয়ে পড়েছে।
বহেরু ওদিকে মালপত্র ভাগাভাগি করে মুনিশদের মাথায় তুলে দিয়েছে। টর্চ আর লম্বা লাঠি হাতে ছেলেরা দাঁড়িয়ে আছে। ব্রজগোপাল আদেশ করলে রওনা হতে পারে সবাই। বহেরু দুকদম এগিয়ে এসে বলে—ওদের রওনা করে দিই কর্তা। আপনি ছেলের সঙ্গে কথা বলুন, আমি মাস্টারবাবুর সঙ্গে একটু কথা বলে আসি, তিনি পুরনো তেঁতুল চেয়ে রেখেছিলেন। একসঙ্গে যাবখন।
ব্রজগোপাল ঘাড় নাড়েন। প্ল্যাটফর্মের ফাঁকা কংক্রিটের বেঞ্চে বসেন দুজন। শিশির ভিজে সেঁতে আছে সিমেন্ট। হাওয়া দিচ্ছে, খুব শীত। রণেন বলে—আপনি বেশি দেরি করবেন না, ঠান্ডা পড়েছে, রওনা হয়ে পড়ুন।
—তুমি একা বসে থাকবে? আর বোধ হয় আধ ঘণ্টার মধ্যে গাড়ি নেই।
—তাতে কী? ঘোরাফেরা করব, তা করতেই সময় কেটে যাবে।
—আচ্ছা যাচ্ছি। ছুটির দিনে-টিনে এদিকে চলেও আসতে পারো তো, বহেরুর খামারের দক্ষিণে একটা চমৎকার জায়গা আছে, বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে এসে চড়ুইভাতি করে যেতে পারো।
রণেন একটু অবাক হয়। বাবা এসব কথা এতকাল বলেননি। বরং রণেন এলে বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। সে চুপ করে থাকে।
ব্রজগোপাল বলেন—কলকাতা শহর আর ইংরেজি স্কুলে কোনও শিক্ষা হয় না। বাচ্চা-কাচ্চাদের নানা জায়গায় নিয়ে যেতে হয়, লোকের সঙ্গে মিশতে দিতে হয়, নইলে মাথায় গাদ জমে যায়।
রণেন বলে—সারা সপ্তাহ খেটেখুটে ওই একটা ছুটির দিনে আর বেরোতে ইচ্ছে করে না।
ব্রজগোপাল একটা শ্বাস ছাড়েন। একটু চুপ থেকে বলেন—আমার ঘরের বিশ্রামের চেয়ে বাইরের শ্রমটাই ভাল লাগত বরাবর। তোমার মা অবশ্য পছন্দ করতেন না। কিন্তু বাইরেটাই আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে।
রণেন মাথা নাড়ে। কথা খুঁজে পায় না।
ব্রজগোপাল বলেন—আমার কথা বাদ দাও। আমার জীবনের দশা দেখে লোকে হাসে হয়তো। তবু বলি, মাঝেমধ্যে সংসার থেকে পালানো ভাল, নইলে সংসারের মাঝখানে সারাক্ষণ থাকলে কেবলই খিটিমিটি বাঁধে, সম্পর্কগুলো বিষ হয়ে যায়, একঘেয়েমি থেকে পরস্পরের প্রতি বিতৃষ্ণা আসে।
কথাগুলো খুব গভীর থেকে উঠে আসছে মনে হয় রণেনের। এবং বাবার এই অতি সাধারণ কথাগুলো তার ভিতরে যেন ছ্যাঁকার মতো লাগে। আত্মসংবরণ রণেনের আসে না। সে হঠাৎ বলে ওঠে—সংসারে বড় অশান্তি।
ব্রজগোপাল মুখ ফিরিয়ে বলেন—কীরকম?
রণেন নিজেকে সংযত করে নেয়, বলে—ওসব শুনে আপনার দরকার নেই।
ব্রজগোপাল মাথা নাড়লেন। বোঝেন। বলেন—কলকাতা শহরটাকে লক্ষ কোরো। চারদিকে মানুষকে লোভানী দেখাচ্ছে, স্বার্থপর করে তুলছে। ও হয়েছে মানুষ পচানোর জায়গা, সাধুকেও অসৎ করে ফেলে। সেই জন্যই আমি ভেবেছিলাম এদিকটায় বসত গড়ে তুলব—
রণেন গভীর দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। তার খুব ইচ্ছে করে সংসারের বাতিল এই মানুষটির কাছে থেকে যেতে। কাল রাত থেকে এক প্রবল অস্থিরতা, ভয়ংকর এক পাপবোধ তাকে তাড়া করে ফিরছে। তার বলতে ইচ্ছে করে—তাই হোক বাবা, এইখানেই বসত গড়ে তুলি।
কিন্তু বলে না। বহেরুর বিশাল শরীর চরাচর ঢেকে সামনে এসে দাঁড়ায়। হেসে সে বলে—আধ ঘণ্টার মধ্যেই কলকাতার গাড়ি আছে।
রণেন মুখ তুলে বলে—বাবা, আপনি রওনা হয়ে পড়ুন। খুব ঠান্ডা।
ব্রজগোপাল গা করেন না, বলেন—তুমি একা বসে থাকবে। আমিও থাকি, দেখতে দেখতে আধ ঘণ্টা কেটে যাবে।
—না, আপনি উঠুন। রণেন জোর করে।
অগত্যা ব্রজগোপাল ওঠেন।
ওরা প্ল্যাটফর্মের গেট পর্যন্ত এগিয়ে যায়। ব্রজগোপাল সেখান থেকে পিছু ফিরে চান। কুয়াশা আর ঝুঁঝকো আঁধারে কিছু দেখতে পান না বোধ হয় ভাল করে। তবু অন্ধকারে চেয়ে থাকেন।
বহেরু ডাক দিয়ে বলে—কর্তা, রিশকা নিয়ে নেব নাকি!
ব্রজগোপাল বলেন—না রে, ও-সব বাবুগিরির কী দরকার? চল্। হেঁটে মেরে দিই।
দীর্ঘ রাস্তা হাঁটতে হাঁটতে বহেরু বলে—কর্তা, এক বামন বীরের খবর পেয়েছি। আর একটা লোক আছে গুসকরায়, তার দুহাতে চোদ্দোটি আঙুল। ছ-আঙুলে অনেকে আছে, ও সাত আঙুলে। ছনম্বর আঙুল থেকে নাকি আবার একটা আঙুল বেরিয়েছে। আশ্চর্য ব্যাপার। এনে ফেলব দুজনকে বহেরু গাঁয়ে।
