হঠাৎ চমকে উঠে শোনে পুরুষ-হাতে রেডিয়োটা বন্ধ করে দিল বীণা। ঝাঁঝ-গলায় বলে—এই কপাল-কুষ্ঠিটা খুলে রেখে ঘুমচ্ছো কেন? ব্যাটারি নষ্ট হয় না!
রণেন চোখ চায়। বীণার ক্লান্তির ভাবটা কি কেটে গেল। ঘরের আসবাবপত্র টেনে টেনে সরাচ্ছে আর আপনমনে বলছে—কদিন ছিলাম না, নোংরার হদ্দ হয়ে আছে ঘরদোর। ঝুল-কালি-ধুলো, বিছানাপত্র গু হয়ে আছে…বলতে বলতে আবার ও ঘরে যায়, আলনা হাঁটকে জামা-কাপড় ছুঁড়ে ফেলে মেঝেয়—আন্ডারওয়্যার, গেঞ্জি কী কালেকুষ্টি হয়ে আছে! আমাকে আবার আচার-বিচার শেখাতে আসে সব। নোংরার হদ্দ, বস্তিবাড়িতে গিয়ে থাকা উচিত।
রণেন বুঝতে পারে, এসব কথা শোনানোর জন্যই তাকে জাগিয়ে নিয়েছে বীণা। এখন সে যুদ্ধের ক্ষেত্র প্রস্তুত করছে। সহজে ছাড়বে না। বিষণ্ণ মনে রণেন বসে শোনে, বীণা ও-ঘরে ছেলেমেয়েদের ডেকে নিয়ে বলছে—কী সব চেহারা হয়েছে এ ক’দিনে। খাস না নাকি তোরা? হাড় জিরজির করছে! কনুইতে ময়লা, ঘাড়ে ময়লা, চোখে পিচুটি, দাঁতে ছ্যাতলা—কেউ এসব দেখে না নাকি! এই শীতে গায়ে গরম জামাও কেউ পরায়নি!
ননীবালা গ্যাসের উনুনের সামনে বসে আছেন নিশ্চুপে। কিন্তু সেটা তাঁর পরাজয়-মেনে-নেওয়া মনে করলে ভুল হবে। মনে মনে তিনিও তৈরি হচ্ছেন, লেগে যাবে। রণেন উঠে বসল এবং বীণার উদ্দেশে একটা দুর্বল ধমক দিয়ে বলল—আঃ কী হচ্ছে! চুপ করে শুয়েটুয়ে থাকো না।
বীণা প্রায় ঝাঁপিয়ে আসে—কেন চুপ করে থাকব? এই ঘর-সংসারে আমি কি ফ্যালনা? আমার বলার কথা কিছু থাকতে পারে না?
—এই দুর্বল শরীরে অত চেঁচিও না। ডাক্তার তোমার ওঠা-হাঁটা বেশি বারণ করেছেন।
—থাক, অত দরদে কাজ নেই। মুখের দরদ অনেক দেখা আছে।
এইভাবে শুরু হয়েছিল। ননীবালা কেন যেন উত্তর দিচ্ছেন না। চুপচাপ আছেন। বীণা গনগন করে যেতে লাগল একা একা। দু-চার ঘা বাচ্চাদের মারধরও করল শোওয়ার ঘরে। বোঝা যায়, সে ননীবালাকে উত্তেজিত করে ঝগড়ায় নামাতে চাইছে। একটা হেস্ত-নেস্ত করাই তার উদ্দেশ্য। ক্রমে ক্রমে তার কথাবার্তায় মরিয়া ভাব ফুটে উঠতে লাগল, রণেন শুনতে পায় শোওয়ার ঘরের ভেজানো দরজার ওপাশে বীণা চাপা গলায় বলছে—পাগলের গুষ্ঠি। দ-পড়া কপাল না হলে কারও এরকম শ্বশুরবাড়ি হয়।
বহুকাল আগে রণেনের একবার কড়া ধাতের টাইফয়েড হয়েছিল। তখন টাইফয়েডের চিকিৎসা ছিল না। গ্রামে-গঞ্জে ডাক্তার-কবিরাজও ছিল না সুবিধের। প্রায় বাহান্ন দিনে তার জ্বর কমেছিল বটে, কিন্তু কিছুকাল তার বিকারের অবস্থা হয়েছিল। জ্বরের পরও প্রায় মাস তিনেক সে মস্তিষ্কবিকারে ভুগেছে। লোকে বলে টাইফয়েডের পর ওই পাগলামির সময়ে সে মা-বাপকে চিনতে পারত না, নিজের বাড়ি কোথায় বলতে পারত না। সেই পাগলামি সেরে যাওয়ার পর রণেন খুব ঠান্ডা আর ভালমানুষ হয়ে যায়। কিন্তু সে যে একদা পাগল হয়ে গিয়েছিল এই ঘটনাটা সে কোনওদিনই ভুলতে পারে না। মাঝে মাঝে তার মনে হয় পাগলামিটা ছাই চাপা হয়ে আছে তার অভ্যন্তরে। সেই কারণেই বোধ হয় আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে চেয়ে আজও এই বয়সেও সে নানা অঙ্গভঙ্গি করে, ব্যক্তিত্ব খোঁজে, ফাঁকা মাঠ পেলে ছেলেমানুষের মতো দু-চক্কর দৌড়ে নেয়, কিংবা একাবোকা অবস্থায় সে এরকম অনেক কিছুই করে। ‘পাগল’ কথাটা শুনলেই বরাবর একটু চমকে ওঠে। তার বুকের ভিতরে একটা ভয় যেন হনুমানের মতো এ-ডালে ও-ডালে লাফিয়ে বেড়ায়।
সে উঠে শোওয়ার ঘরের দরজার কাছে গিয়ে বলল—শোনো, এত অশান্তি কোরো না। যদি বাড়াবাড়ি করো, তা হলে আমি বেরিয়ে যাব।
বীণা টুবাইকে হাত-মুখ ধুইয়ে এনে গরম পোশাক পরাচ্ছিল হাঁটু গেড়ে বসে। মুখ না ফিরিয়েই বলে—তুমি বেরিয়ে যাবে বলে ভয় দেখাচ্ছ কাকে? তুমি কবে ঘরে থাকো, কতক্ষণই বা থাকো? ঘরের কোনও খবর কি তোমার কানে যায়? যেতে হয় যাও, আমাকে চোখ রাঙাতে এস না। আমি আর ও-সব গ্রাহ্য করি না।
অগত্যা বেরিয়েই গেল রণেন। শীতের রাস্তায় রাস্তায় খানিক হাঁটল। মাথাটা গরম। মোড়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট খেল। দু-চারজন চেনা পাড়ায় লোকের সঙ্গে কথাবার্তা বলল। সোমেন তার আড্ডা সেরে ফিরছিল। রাত হয়েছে। রণেনকে রাস্তায় দেখে সিগারেট লুকিয়ে নতমুখে পেরিয়ে যাচ্ছিল, রণেন তাকে ডাকল। এত রাত করে ফেরে, একটু শাসন করা দরকার। দিনকাল ভাল নয়।
—এত রাত করে ফিরিস কেন? লোকের চিন্তা হয় না?
সোমেন তার কমনীয় সুন্দর মুখটি তুলে হাসল। হাসিটি ভুবন-ভোলানো। রণেন শাসন করতে গিয়ে মুগ্ধ হয়ে যায়। সোমেন বলে—একটা পিকনিকে যাব কাল, তার সব জোগাড়যন্ত্র করছিলাম, তাই দেরি হয়ে গেল।
রণেন গলাখাঁকারি দেয়। ভাইটাকে সে কোনওদিনই কড়া কথা বলতে পারে না। বড্ড মায়াবী। আজকালকার এই বয়সের ছেলেদের যেমন ডোন্টপরোয়া ভাব তেমন নয়। তাই রণেন বলে—ও। গায়ে গরম জামা নেই কেন? ওই পাতলা সোয়েটারে কি শীত মানে? একটা পুল-ওভার কিনে নিস।
—তেমন শীত কই? আমার তো ঠান্ডা লাগেই না।
—পিকনিকে বাইরে যাচ্ছিস তো! সেখানে শীত লাগবে। বরং আমার কোটটা নিয়ে যাস।
—তোমারও তো কাল বাইরে যাওয়ার কথা। কোট তোমারও তো লাগবে!
বাইরে যাওয়ার কথা! তাই তো! গোলমালে খেয়াল ছিল না। বাবার কাছে কাল তার একবার যাওয়া উচিত। ওই অভিশপ্ত জমিটার হাত থেকে তো রেহাই নেই।
