রণেন হঠাৎ বলে—বসে না থেকে আই এ এসটা দিয়ে দে না!
সোমেন অবাক হয়ে বলে—আই এ এস! আমি?
রণেন মাথা নাড়ে। বলে—আজকাল যেন কোথায় ট্রেনিং দেয়?
—ইউনিভার্সিটিতে।
—ভরতি হয়ে যা। আমি টাকা দেব। নিশ্চিত গলায় বলে রণেন।
সোমেন সামান্য হাসে, বলে—টাকাফাকার জন্য নয়। আমার ইচ্ছে করে না।
—কেন, ইচ্ছে করে না কেন?
—ওসব আমার হবে না। খামোখা চেষ্টা।
—দ্যাখ না। লেগে যেতে পারে। বলে খুব ভরসার হাসি হাসে রণেন। বহুকাল এমন সহজভাবে কথাবার্তা হয়নি তিনজনে। বীণা নার্সিং হোমে যাওয়ার পর থেকে হচ্ছে। ভাইয়ের দিকে একটু চেয়ে থাকে রণেন। ওই রকম তেইশ চব্বিশ বছর বয়সে তারও কি সোমেনের মতো চেহারা ছিল? অবিকল না হলেও ওরকমই অনেকটা ছিল সে। বহেরুর খামারবাড়িতে সে যেতটেত তখন। নয়নতারার সঙ্গে তখন তার একটা সম্পর্ক ছিল।
মনে পড়তেই ফুড়ুক ফুড়ুক একটু হেসে ফেলল সে, আপনমনেই। ব্যক্তিত্বের অভাব। হাসিটা চাপা উচিত ছিল। গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করে বলল—বহেরুর ওখানে কাকে কাকে দেখলি?
সোমেন বলে—কাকে দেখব? হাজারটা লোক, কাউকে আলাদা করে দেখার উপায় কী? তবে গন্ধ বিশ্বেস, দিগম্বর…
বিরক্ত হয়ে রণেন বলে—ওরা নয়।
—তবে?
—বহেরুর ছেলেপুলেদের কাকে দেখলি?
—চারটে ছেলের সঙ্গে আলাপ হল, আরও সব আছে। একটা মেয়েকে দেখলাম—বিন্দু, ডিভোর্সড।
—ডিভোর্সড আবার কী! ওরা ওইরকম, ছেড়ে চলে আসে, আবার বিয়েফিয়েও করে। আইনটাইন মানে না। আমি যখন যেতাম তখন নয়নতারা নামে একজন ছিল, সেও ওইরকম—
সোমেন মাথা নেড়ে বলে হ্যাঁ হ্যাঁ, আছে একজন। আলাপ হয়নি। দূর থেকে আমাকে খুব দেখছিল।
রণেন আপনমনে হাসে। বহুকাল আগের কয়েকটা দিন মনে পড়ে। নয়নতারা খুব জমিয়েছিল তার সঙ্গে। বেশি কিছু নয় অবশ্য। এই একটু জড়িয়ে-উড়িয়ে ধরা। দু-চারটে চুমু, আনাড়ির কাজ সব। তবু ভোলা যায় না। সে সবের জন্য সে তার পৈতেয় পাওয়া একটা আংটি খুলে দিয়ে এসেছিল নয়নতারাকে। বাড়ি এসে একটা ছিনতাইয়ের গল্প বলেছিল। মা অনেকদিন আংটিটার কথা দুঃখ করে বলেছে। আংটিটা তার নামের দুটো আদ্য অক্ষর মিনা করা ছিল—আর এল। আংটিটা কি আজও আছে নয়নতারার আঙুলে, বা বাক্সে? ভারী বিহ্বল লাগছিল ভাবতে।
সুখের স্বপ্নটা ভেঙে হঠাৎ চমকে ওঠে রণেন। ভারী ভয়-ভয় করে হঠাৎ। আংটিটা কি এখনও রেখেছে নয়নতারা? সর্বনাশ ওই আংটি দিয়ে যে এখনও অনেক কিছু প্রমাণ করা যায়। রণেন মনে মনে নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে বলতে থাকে—অবশ্য, বেশি কিছু নয়, বেশি কিছু নয়। সবই আনাড়ির কাজ, ছেলেমানুষি…ইত্যাদি।
চায়ের সুঘ্রাণ এবং তাদের তিনজনের এই কাছাকাছি বসে থাকা—বেশ ভাল লাগছিল রণেনের। বলল—সোমেন, কাল তুই বরং নার্সিং হোমে যাস, বউদিকে দেখে আসিস। আমি বরং কাল একবার বাবাকে দেখতে যাই।
সোমেন বলল—তোমার যাওয়ার কী দরকার? আমিই বরং—
—না, না। কাল রবিবার আছে। আমিই যাব’খন। অনেককাল যাই না। বাবাকে দেখে আসি, বহেরুটাও গড়বড় করছে
মা বলে—বউমাকে আর কদিন রাখবি ওখানে?
—আছে থাক না। রণেন অন্যমনস্কভাবে বলে—বেশ তো আছে। বলেই নিজের ভুল বুঝতে পেরে কথা উলটে বলে—ডাক্তার ঠিক এখনই ছাড়তে চাইছে না।
মা একটু অনুযোগ করে—ততাদের সবটাতেই বাড়াবাড়ি। হুট বলতে ডাক্তার। হুট বলতে নার্সিং হোম। মেয়েরাও কেমনধারা হয়ে গেল, সজ্ঞান অবস্থায় একটা পরপুরুষ ডাক্তার মেয়েদের শরীরে হাত দেবে এ কেমন কথা! পেটে বাচ্চা এলে দশবার চেক-আপ, লজ্জা হায়া কোথায় যে গেল। তুই নিয়ে আয় তো, কিছু হবে না।
সোমেন এসব শুনে উঠে পড়ে। রণেন হাসে। বলে—ডাক্তারই ছাড়তে চাইছে না যে!
—কেন? স্রাব বন্ধ হয়ে গেছে, অপারেশনও যখন দরকার নেই, তখন আর গুচ্ছের টাকা গুনবি কেন?
—অপারেশন! বলে একটু চোখ বড় করে চায় রণেন। বলে—একটা মাইনর অপারেশন দরকার ছিল বটে।
—তা না হয় সেটাই করিয়ে আন।
—পাগল হয়েছ? ওখানকার ডাক্তার হচ্ছে সাহা। এমনিতে ডাক্তার ভালই। কিন্তু দিনরাত কেবল খাওয়ার গল্প। অমন ইলিশ-ভক্ত তোক দুটো নেই। আমাকে প্রায়ই বলে—পদ্মার ইলিশ! ও আর উনুনে চড়াতে হয় না, একটু তেল-সরষেবাটা মেখে বগলে চেপে রাখুন, বগলের ভাপেই সেদ্ধ হয়ে যাবে—এত নরম সুখী মাছ! বলতে বলতে বুঝলে মা, ডাক্তারের চোখ দুখানা স্রেফ কবির চোখ হয়ে গেল। উদাস, অন্যমনস্ক। হাত থেকে স্টেথেসকোপের চাকতিটা পড়ে গেল ঠকাস করে, চশমা খুলে বুঝি চোখের জলও মুছল। সেই থেকে অপারেশনের নামে আমি ভয় পাই। রুগির শরীরে ছুরি বসিয়ে যদি লোকটার হঠাৎ ইলিশের কথা মনে পড়ে, যদি ওরকম অন্যমনস্ক আর উদাস হয়ে যায়, তা হলে তোমার বউমার কী হবে!
সোমেন যেতে যেতেও শেষটুকু শুনে হেসে ফেলে। মা স্মিতমুখ ফিরিয়ে নেয়।
বেলায় অফিস বেরনোর সময়ে রণেনের মাজার ব্যথাটা যেমন খচাং করল একবার জুতোর ফিতে বাঁধার সময়ে, তেমনি তার মনেও একটা খচাং খিঁচ ধরল হঠাৎ। সে যে বউয়ের নামে জমিটা কিনতে চেয়েছে এটা মা জানে না তো! নিশ্চিন্ত হওয়ার জন্য সে বেরোবার মুখে জিজ্ঞেস করল—ওরা কেউ এসেছিল নাকি মা?
—কারা?
—শীলা, কিংবা অজিত।
মা বিরক্তির শ্বাস ফেলে বলে—আসবে কী! সেখানেও আদেখলাপনার চূড়ান্ত।
—কেন?
