মেকো বলে—বাবুকে ঝাড়ব একদিন। এত বিয়েবাড়ি ‘রেড’ করলাম, সন্দেহ করলেও ভদ্রলোকেরা বেশি কিছু বলে না, কিন্তু এরকম খচাই পার্টি কখনও দেখিনি।
মেকো দ্রুত চিনেবাদামের খোসা ভাঙে। তিনজন তার দিকে চেয়ে হাসে। মেকো হাসে না।
চতুর্থজন বলে—মেজাজটা না নিলে ঠিক ছেড়ে দিত তোকে।
মেকো তাকে একটা লাথি মারল! আচমকা। বলল—বেশ করেছি মেজাজ নিয়েছি।
লাথি খেয়ে চতুর্থজন বলে—তাতে লাভ কী হল? ভরপেট হাওয়া।
তিনজন হাসে।
দ্বিতীয়জন বলে—আসল কথাটা কী জানিস মেকো, তোর ড্রেসটা আজ সব মাটি করেছে। বিয়েবাড়ি ভদ্রলোকের জায়গা। আমাদের রাস্তা-ঘাটে দেখে তো বাবুর বাবা, ছোটোলোকের মতো দেখতে। তুই যদি একটু মেক-আপ নিয়ে যেতিস—
—খচাস না কেলো। ছোট ভাইটাকে বললাম পুলওভারটা রেখে যাস, এক জায়গায় যাব, বিকেলে দেখি সেটা নেই। মেজাজটা সেই থেকে বিলা হয়ে আছে।
তৃতীয়জন হঠাৎ বলে—মেকো, তোকে একটা জিনিস দিতে পারি।
—কী? নিস্পৃহ মেকো জিজ্ঞেস করে।
তৃতীয়জন তার প্যান্টের পকেট থেকে একটা ডেলা বের করে আনে।
—কী রে? মেকো চোখ ছোট করে জিজ্ঞেস করে।
—ফ্রাই। হাতছিপ্পু করে একটা সরিয়েছিলাম।
—কার জন্য?
কার জন্য আবার! এমনি।
মেকো জোর হেসে ওঠে—সুধাকে দিতিস? আলু!
সবাই খ্যা-খ্যা করে হাসতে থাকে।
মেকো আর তার সঙ্গীদের পুরো গল্পটা শোনা হল না। ব্যান্ডেলে ওরা নেমে গেল। সোমেন পকেটে হাত দিয়ে দেখল তার ঘড়ি আংটি, কোমরে টাকা। কিছু বিশ্বাস নেই। এখনও অনেকটা পথ।
হাওড়ায় যখন গাড়ি ঢুকল তখন স্টেশন ফাঁকা। রেল পুলিশ স্টেশনের চত্বর থেকে ভবঘুরেদের সরিয়ে দিচ্ছে, তবু এমন ভাল শোওয়ার জায়গা পেয়ে কিছু লোক এধার-ওধার পড়ে আছে চাদরমুড়ি দিয়ে শবদেহের মতো। শীতের রাত দশটার পরই ঝিমিয়ে গেছে শহর। কয়েকজন মাত্র তোক নিয়ে স্টিমারের মতো প্রকাণ্ড পাঁচ নম্বর বাসটা ছেড়ে যাচ্ছিল, সোমেন দৌড়ে গিয়ে ধরল। হাওড়ার পোল পেরিয়ে শহর ভেদ করে যেতে যেতে কিছুতেই যেন বিশ্বাস হয় না, একটু আগেই সে বহেরুর খামারবাড়িতে ছিল।
রাত এগারোটায় বাড়ি ফিরে এল সোমেন। সবাই তার অপেক্ষায় জেগে বসে আছে। কেউ খায়নি।
খেতে বসলে পর মা জিজ্ঞেস করে—কী বলল রে? দেবে?
—কী জানি। স্পষ্ট কথা বলল না।
মা শ্বাস ফেলে বলে—দেবে না। আমি জানতাম।
দাদা বিরক্ত মুখ তুলে বলে—জানতে যদি তবে আগ বাড়িয়ে চেয়ে পাঠালে কেন? আমি তো বারণই করেছিলাম।
—বুড়ো হয়েছে, এখন যদি মতিগতি পালটে থাকে—সেই আশায়।
দাদা ভাত মাখতে মাখতে বলে—যে লোকটার কোনওকালে মন বলে বস্তু ছিল না তার কাছ থেকে কিছু আশা করা বৃথা। তুমি কোন আক্কেলে যে চিঠিটাতে আমার নাম করে চাইলে! তোমার কি ধারণা, আমার নাম করে চাইলে বাবা গলে যাবে!
—তোকে তো ভালবাসত খুব। সংসারে একমাত্র তোর দিকেই টান ছিল।
—ওসব বাইরের টান, মায়া। সত্যিকারের ভালবাসা নয়…।
বলতে বলতে দাদা লাল হয়ে ওঠে রাগে, অপমানে।
মা দুঃখ করে বলে—অজিত বলছিল জমিটা আর ধরে রাখা যাবে না, ভাল ভাল দর দিচ্ছে লোক। ওর বন্ধুও দাদাকে দিয়ে গত সপ্তাহে চিঠি দিয়েছে।
—বেচে দিক গে। দাদা প্রচণ্ড রাগের গলায় বলে।
মা অনেকক্ষণ চুপ করে থাকে। দাদার রাগকে এ বাড়ির সবাই ভয় পায়। দীর্ঘকাল হয় দাদার রোজগারে সংসার চলছে। সাঁইত্রিশ বছর বয়সে দাদা সংসারের পরিপূর্ণ অভিভাবক।
মা হঠাৎ নিস্তব্ধতা ভেঙে বলে—তুই একটু দেখ না!
দাদা অবাক চোখ তুলে বলে—কী দেখব?
—একবার যা, তোর মুখ দেখলে যদি মায়া হয়।
দাদা স্থির দৃষ্টিতে মার মুখের দিকে চাইল। মাও তক্ষুনি কথাটার ভুল বুঝতে পারে। চোখ সরিয়ে নিয়ে প্রসঙ্গ পালটে বলে—না হলে দেখ যেমন করে পারিস, ধারধোর করেও যদি রাখা যায়। আমার একখানা গয়না থাকলেও আজ খুলে দিলাম। কিন্তু ওই রাক্ষস তো সবই খেয়েছে।
দাদা কোনও উত্তর দেয় না, খাওয়ার শেষে উঠে যায়।
সোমেন আর মা এক ঘরে দুটো চৌকিতে শোয়। মশারি ফেলা হয়ে গেছে, সোমেন শোওয়ার আগে সিগারেট খাচ্ছিল। মার সামনেই খায়। মা তার মশারির মধ্যে বসে মশা খুঁজল কিছুক্ষণ। চুলের জট ছাড়াল বসে। তারপর এক সময়ে বলল—কেমন সব দেখে এলি?
—কীসের কথা বলছ? বাবার কথা?
—হুঁ।
—ভালই তো।
—বহেরু মোটে চারশো টাকা পাঠাল, ধানের দর কি এবার কম?
—বলল তো দর ভালই। যা দিল নিয়ে এলাম।
—তুই তো ওরকমই, বাপের মতো ন্যালাক্ষ্যাপা। হিসেব বুঝে আসতে হয়। বহেরু কি সোজা লোক! তোর বাপের প্রভিডেন্ট ফান্ডের আর হাতের-পাতের যা ছিল তা দিয়ে নাকি জমি-টমি কিনিয়েছে। শেষে সব ও নিজেই ভোগ করবে।
সোমেন একটু বিরক্ত হয়ে বলে—লোকটাকেই যখন ছেড়ে দিয়েছ তখন তার টাকার হিসেব দিয়ে কী হবে!
মা চুপ করে যায়। কিন্তু বেশিক্ষণ নিজেকে সামলাতে পারে না, বলে—আমার দুঃখ তোরা তার কিছু পেলি না। দশভূতে লুটে খাচ্ছে।
—খাক গে। আমার ওসব দরকার নেই।
—ঠিক ঠিক কী বললে বল তো?
—একবার তো বললাম।
—আবার বল। খতিয়ে দেখি, কথার মধ্যে কোনও ফাঁক রেখেছে কিনা।
—কলকাতায় আমরা বাড়ি করি তা চান না। গোবিন্দপুরে গেলে বাড়ি করার টাকা দেবে।
—চাকরি-বাকরি ছেড়ে যাবে কী করে!
—সেটা কে বোঝাবে!
—তুই বুঝিয়ে-সুঝিয়ে আসতে পারলি না?
সোমেন নীরব উত্তেজনায় আর একটা সিগারেট ধরাল।
