তারপর বললেন—সময় থাকতে যদি ও জায়গা ছেড়ে পালিয়ে আসতে পারতে তবে ভাল হত। একদিন দেখবে কলকাতায় দিন-দুপুরে শেয়াল ডাকছে, মড়ার মাথা পড়ে আছে এখানে-সেখানে, জনমনুষ্য কেউ থাকবে না। একটু ভেবে দেখ।
—আপনি মাকে যা লেখার লিখে দিন।
—এসব কথা চিঠিতে লেখার নয়, তোমার মাকে মুখের সামনে কিছু বলাও মুশকিল। ওঁর সবসময়ে একটাই ভাব ‘এই পেয়েছি ঝগড়ার গোড়া, আর যাব না বালি-ওতরপাড়া।’
—তবে আমি মাকে গিয়ে কী বলব?
এই প্রথম বাবা একটু হাসলেন। বললেন—তোমরা তবু কিছুতেই এদিকে চলে আসবে না?
—আমার কোনও মত নেই।
—তোমরা বড় হয়েছ, মত নেই কেন? এই বয়সে নিজস্ব মতামত তৈরি না হলে আর কবে হবে? তোমাদের যদি এদিকে থাকার মত হয় তবে তোমার মায়েরও হবে। মেয়েরা স্বামীর বিরুদ্ধে যত শক্ত হয়েই দাঁড়াক না কেন, ছেলের বিরুদ্ধে যাওয়ার সাহস পায় না। ওখানে মেয়েরা বড় কাবু।
সোমেন কথাটার সত্যতা বুঝতে পারে। জীবন থেকেই মানুষ কিছু সহজ দার্শনিকতা লাভ করে। বাবার কথাটা মিথ্যে নয়। সে একটু স্মিত হাসল।
বাবা একটু শ্বাস ফেলে বললেন—বুঝেছি। রণেনই চায় কলকাতায় বাড়ি হোক। তোমারও হয়তো তাই ইচ্ছে। বলে বাবা আবার একটু হেসে মাথা নেড়ে বললেন—তোমাদের চেহারায় কলকাতার ছাপ বড় স্পষ্ট। তোমরা আর দেশ গাঁয়ে থাকতে পারবে না। আমার ইচ্ছে করে তোমাদের জন্য কলকাতা থেকে দূরে একটা নকল কলকাতা তৈরি করে দিই। তা হলেও হয়তো বাঁচাতে পারতুম তোমাদের।
বাবা উঠে দাঁড়ালেন। জিজ্ঞেস করলেন—ক’টার গাড়িতে যাবে?
—যেটা পাই। রাত আটটার গাড়িটা—
পরে ঘড়ি দেখে বললেন—রাত আটটার পর শনিবার গাড়ি খুব ফাঁকা যায়। দিনকাল ভাল নয়, অত রাতের গাড়িতে যাবে কেন? যেতে হলে একটু আর্লি যাও। ভাল হয়, আজ রাতটা কাটিয়ে কাল সকালে গেলে।
—দেরি হলে মা ভাববে। আমার আজই ফেরার কথা।
বাবা চিন্তিতভাবে বললেন—সাড়ে পাঁচটা বাজে, এখন রওনা হলেও রাত আটটার আগে গাড়ি পাবে না।
—কিছু হবে না। ঠিক চলে যাব।
বাবা আবার হাসলেন। গাড়ু-গামছা নিয়ে বৌলওলা খড়মের শব্দ তুলে দরজার কাছে যেতে যেতে বললেন—তোমাদের জন্য আমিও কিছু কম চিন্তা করি না, বুঝলে?
বাবা খড়মের শব্দ তুলে বাইরে বেরিয়ে যান। কুয়োতলার দিকেই যান বুঝি। অদূরে জলের শব্দ হয়। দশবাতির ল্যাম্প-এর নীচে খাতাটা পড়ে আছে, তারই একটা পৃষ্ঠায় লেখা আছে—ভগবান, উহারা যেন সুখে থাকে। কথাটা ভুলতে পারছে না সোমেন। বার বারই মনে পড়ে। কেমন যেন অস্থির লাগে।
বাবা ঘরে নেই, সেই ফাঁকে বিন্দু এল। নিঃশব্দে। খানিকটা চুপি চুপি ভাব ছিল আসায়। একটু আগে যেমন পোশাক ছিল, তেমন আর নেই। একটু সেজেছে বুঝি। দশবাতির আলোয় ভাল বোঝা যায় না, তবু মনে হয়, চোখে কাজল টেনেছে, কপালে সবুজ টিপ, গায়ে একটা রঙিন উলের স্টোল। একটু অবাক হয় সোমেন, স্টোলটা দেখে। তারপর ভাবে, বহেরু তো আর সত্যিই সাধারণ চাষা নয়, তার মেয়ের ফ্যাশন করতে বাধা কী?
গলা নিচু করে বিন্দু বলে—জিনিসপত্র গুছিয়ে দেব?
—গোছানোর কিছু নেই।
—আজ থাকবেন না?
—না
—ব্রজকর্তার সঙ্গে সব কথা হয়ে গেল?
সোমেন একটু হাসে, ম্লান হাসি।
বিন্দু গলাটা বিষণ্ণ করে বলে—ব্রজকর্তা একা একা পড়ে থাকে। আগে রণেনবাবু আসত, আজকাল কেউ আসে না।
সোমেন নীরবে শুনে যায়। কথা বলে না।
—খেয়ে যাবেন না?
—কী খাব?
—ভাত।
—না, দেরি হয়ে যাবে।
—মাঝে মাঝে আসবেন।
সোমেন চোখ তোলে। বিন্দু চেয়ে আছে। চোখে পিপাসা।
সোমেন বলে—কেন?
ব্ৰজকর্তাকে দেখতে। আবার কেন? বলে হাসে।
সোমেন চোখ নামিয়ে নয়। বুকটার মধ্যে কী একটা মাতামাতি করে।
বিন্দু দু-পা এগিয়ে এসে বলে—ব্ৰজকর্তার খুব অসুখ করেছিল। সোমেন চমকে উঠে বলে—কী অসুখ?
—বুকের। হার্টের।
—কেউ জানায়নি তো!
—বাবা ভয়ে জানায়নি, যদি আপনারা ব্রজকর্তাকে নিয়ে যান এখান থেকে। বাবা ওঁকে ছাড়তে চায় না।
—অবস্থা খুব খারাপ হয়েছিল?
—হয়েছিল। বৈঁচীর হাসপাতাল, তারপর বর্ধমানেও নিয়ে যেতে হয়েছিল ডাক্তার দেখাতে।
—সসামেন চুপ করে থাকে।
—মাঝে মাঝে আসবেন। আপনাদের জন্য ভেবে ভেবে বুড়োমানুষের বুক ঝাঁঝরা।
একটা শ্বাস ফেলে সোমেন বলে—আচ্ছা, আসব।
—আসবেন কিন্তু।
—রিকশা পাওয়া যাবে না বিন্দু? আমি এবার রওনা হই।
—রিকশা আনতে লোক চলে গেছে গোবিন্দপুর। এসে যাবে যখন-তখন।
খড়মের শব্দটা বাইরে শুনেই বিন্দু পালিয়ে গেল।
বাবা ঘরে আসেন। নিঃশব্দে জামাকাপড় ছাড়েন৷ কোণের দড়িতে আলগা হলদে রঙের শুদ্ধবস্ত্র আছে, সেটা পরে নিয়ে খুঁটটা গায়ে জড়ান। খালি গা, ধপধপ করছে পৈতেখানা।
—কিছু খেয়েছ-টেয়েছ?
—খেয়েছি।
—কোনও অসুবিধে হয়নি তো?
—না। বহেরু খুব যত্ন করেছে।
—বিছানাপত্র ভাল নয়, রাতে কষ্ট হয়েছিল নিশ্চয়ই?
—তেমন কিছু না। আপনার কি অসুখ হয়েছিল?
—অসুখ?
—শুনলাম হাসপাতাল পর্যন্ত যেতে হয়েছিল। আমাদের জানাননি কেন?
বাবা গম্ভীর মুখে বলেন—তোমাদের জানাব কেন? কলকাতায় ভাল আছ, এত দূরে টেনে এনে কষ্ট দেওয়া।
—কষ্ট কীসের?
—কষ্টই তো! অভিমান করে বাবা বলেন। তারপর গলা খাঁকারি দিয়ে বলেন—বেশ আছি, অসুখ-টসুখ কিছু নেই। এরা আত্মীয়ের চেয়ে বেশি দেখাশোনা করে। তা ছাড়া, আমিও খাড়া আছি এখনও, বসে যাইনি।
