—কী?
—এখন যাও না।
—আমার কানে কয়েকটা উড়ো কথা এসেছে শীলা।
—পরে শুনব।
—না, এখনই। সুভদ্রর সম্পর্কে…
শীলা হঠাৎ যেন থমকে গেল। গলার স্বরটা হয়ে গেল অন্যরকম। বলল—কী কথা? কী শুনছ?
—তোমার সঙ্গে সুভদ্রর রিলেশনটা…
—কীরকম?
—লোকে বলে।
—কে লোক?
—আছে। তুমি চিনবে না।
বাথরুমের ঝুঁঝকো আলোয় শীলা কেমন ছাইরঙা হয়ে গেল। অবাক বড় চোখ, ঠোঁট দুটো ফাঁক হয়ে আছে, ক্ষতচিহ্নের মতো।
—তারা কী বলেছে? শীলা নরম গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করে।
শীলার চেহারা দেখে অজিত ভয় পেয়ে গেল। ঠাট্টার এমন প্রতিক্রিয়া হবে, এতটা পালটে যাবে শীলা তা সে ভাবেনি। হাত বাড়িয়ে বলল—কী হয়েছে? শরীর খারাপ লাগছে নাকি!
—তুমি ও কথা বললে? শীলার গলায় মেঘ ঘনিয়ে এসেছে। কাঁদবে।
—কিছু না। কেউ কিছু বলেনি। বলল অজিত। কিন্তু গলায় কোনও আন্তরিকতা ফোটাতে পারল না। মাঝে মাঝে মানুষের বড় ভুল হয়ে যায়। গলা খাঁকারি দিয়ে অজিত বলে—ঠাট্টা করছিলাম। আমি যাচ্ছি।
ম্লান মনে বেরিয়ে এল অজিত। হঠাৎ বুঝতে পারল, সে যে ঠাট্টা করে কথাটা বলেছে তী শীলাকে কোনওদিন বিশ্বাস করানো কঠিন হবে। কিন্তু ঠাট্টাটা কী? অজিতের মনেও কি কিছু ছিল না!
সম্পূর্ণ আনমনা অজিত বাইরের ঘরে এসে দেখল তার শ্বশুর ব্রজগোপাল লাহিড়ি তার শাশুড়ি ননীবালা লাহিড়ির হাতে মোটা টাকার চেক তুলে দিচ্ছেন। দৃশ্যটা অনেকটা খবরের কাগজের ছবির মতো, কোনও সংস্থার পক্ষ থেকে কেউ যখন বন্যাত্ৰাণ বা ওইরকম কিছুর জন্য রাজ্যপাল বা প্রধানমন্ত্রীর হাতে চেক তুলে দেয়, স্রেফ পাবলিসিটির জন্য। বিজ্ঞাপন দেওয়ার চেয়ে সংবাদে নাম তোলা অনেক বড় বিজ্ঞাপন। আজকাল সবাই সংবাদ হতে চায়। পারিবারিক ক্ষেত্রে ব্রজগোপালও এখন সংবাদ। শেষ পর্যন্ত টাকা তিনি দেবেন এমন বিশ্বাস অনেকেরই ছিল না। কিন্তু এই মুহুর্তে চেকটা দেওয়ার সময়ে তাঁর ভাবমূর্তিটা বেশ বড়সড় হয়ে উঠল। ননীবালা বাঁ-হাতে চোখ মুছে ধরা গলায় বললেন—রণোর নামে দিলেই তো পারতে!
ব্রজগোপাল রক্তাভ লাজুক মুখে বললেন—তোমাকেই দেওয়ার কথা ছিল।
শ্বশুরকে বহুকাল বাদে একটু মন দিয়ে দেখল অজিত। ক্ষ্যাপাটে, বাতিকগ্রস্ত বুড়ো। তবু মুখের ওই রক্তাভাব যে লাজুকভাব, যে চাপা অস্থিরতা তার মধ্যে একটা গভীর মমতাময় হৃদয়ের চিহ্ন আছে। বুড়ো মানুষরা চিঠির শেষে পাঠ লেখে ইতি নিত্য শুভাকাঙ্ক্ষী অমুক। সেটা কথার কথা। কিন্তু এই লোকটার শরীরের মধ্যে যেন সেই কথাটা গোপনে ভোগবতীর মতো বয়ে যাচ্ছে—নিত্য শুভাকাঙ্ক্ষী।
ননীবালার চোখে বুঝি জল এল আবার। প্রায় রুদ্ধ গলায় বললেন—বাড়িটা যদি হয় তাহলে…
বলে একরকম প্রত্যাশায় তাকালেন স্বামীর দিকে। ঘোমটাটা আর একটু টেনে মুখখানা প্রায় ঢেকে বললেন—রণো বলছিল, বাড়ি করলে বাবার জন্য একটা আলাদা ঘর করব।
কথাটায় ইঙ্গিত ছিল। নিরুদ্দিষ্টের প্রতি আহ্বান।
ব্রজগোপাল একটু চেয়ে রইলেন ননীবালার দিকে। তারপর মাথা নেড়ে বললেন—কতকাতায় আর না। তোমরা থাকো। গোবিন্দপুর ছেড়ে আসা হবে না। তা হলে সব দেখবে কে?
ননীবালা উত্তর দিলেন না। রণেন চুপ করে বসে আছে। কিংবা ঠিক চুপ করেও নেই। তার ঠোঁট নড়ছে নিঃশব্দে। আপনমনে কথা বলছে নাকি?
অজিত সকলের কাছ থেকে দূরে। ঘরের কোণে একটা গদি আঁটা শান্তিনিকেতনি মোড়ায় বসে রইল। ব্রজগোপালের দিকে চোখ। এ লোকটাকে তার বড় হিংসে হয়। সব থেকেও কেমন একা, আলগা। হৃদয়হীন বলে মনে হয়। মনে হয়, বুঝি সন্ন্যাসী।
সে যাইহোক, লোকটা সংসারকে লাথি মারতে পেরেছে। বুকের পাটা আছে এ বয়সেও।
উৎকর্ণ হয়ে বসেছিল অজিত। বাথরুমে শীলা অনেকক্ষণ সময় নিচ্ছে। বড় ভয় হয়। পাঁচ মাসের পেট নিয়ে, যদি পড়েটড়ে যায়। ঠাট্টাটা করা ঠিক হয়নি।
আবার অজিত ভাবে, ঠাট্টা! ঠাট্টাই কী! আর কিছু নয়? উৎকর্ণ হয়ে থাকে। এ বাড়ির নিঃসঙ্গতার ভূতটা কখন যে কার ঘাড়ে ভর করে কী অনর্থ ঘটায়! সেই নিঃসঙ্গতা ভাগিয়ে দেওয়ার জন্য একজন আসছে। উগ্র আগ্রহে অপেক্ষা করছে অজিত। শীলা, পড়েটড়ে যেয়ে না, সাবধান! মন খারাপ কোরো না, ওটা একটা ভূতুড়ে ইয়ারকি।
ব্রজগোপাল চেক-দান অনুষ্ঠানের ভাবগম্ভীরতা থেকে হঠাৎ সম্বিৎ পেয়ে চারদিকে চেয়ে বললেন—শীলুকে দেখছি না!
ননীবালা ডাকলেন—অ শীলা।
—বাথরুমে। জবাব দিল অজিত।
—ও। ব্রজগোপাল খানিক চুপ করে থেকে বললেন—শীলুর বাড়িতে এলাম, অথচ ওর জন্য হাতে করে কিছু আনিনি।
—কী আনবে! ননীবালা বলেন।
— বাচ্চাদের কাছে আসতে বাপের কিছু হাতে করে আনতে হয়। ব্রজগোপাল বলেন।
—ওরা কি বাচ্চা! ত্রিশের কাছে বয়স হল। বলেন ননীবালা। একটু হাসলেনও বুঝি।
বড় হয়েছে! বলে ভ্রূকুটি করেন ব্রজগোপাল। যেন বা তাঁর বাচ্চারা যে বড় হয়েছে এটা তাঁর বিশ্বাস হয় না। তিনি জানেন, ওরা এখনও ভুলে ভরা, বায়নাদার, অবুঝ শিশু তাঁর। বড় হয়নি, একদম বড় হয়নি।
বাচ্চা ঝিটা বাইরে থেকে মিষ্টি নিয়ে ঘরে এল। রান্নাঘর থেকে চায়ের জলের শিস শোনা যাচ্ছে। শীলার এবার বাথরুম থেকে বেরনো উচিত।
ব্রজগোপাল জামার ভিতরের পকেট থেকে দশটা টাকা বের করে অজিতের দিকে চেয়ে বললেন—তোমরা মিষ্টি খেয়ো।
অজিত হাসল, বলল—না, না। সে কী!
