পারুল তখনও ফুঁসছিল। কিন্তু সে বোকা বা অবিবেচক নয়। সে হয়তো জানে না, দুনিয়াটা তার অজান্তে কত পালটে যাচ্ছে দ্রুত। বিশাল প্রজন্মের ব্যবধান। এইসব ছেলেমেয়ে হয়তো তাদের কাছে মঙ্গলগ্রহের জীবের মতোই অচেনা। সে মাথা নেড়ে বলে, তুমি আমার আজকের দিনটা খুব তেতো করে দিলে।
মেয়েটা একটু যেন অবাক হয়ে বলে, ইজনট ইট এ ট্রুথ? টেক ইট ইজি ডিয়ার। আমি কিছু ভেবে বলিনি। ওরকম তো কত হয়।
পারুলের মনে পড়ল, কুড়ি বছর আগে অমল রায়ও এই কথাটা বলেছিল। এরকমই নাকি আকছার হয়, এতে মনে করার কিছু নেই, আজকালকার ছেলেমেয়েরা ওসব মাইন্ড করে না। ইত্যাদি।
পারুল টর্চটা নিবিয়ে ফেলেছিল। ফের জ্বেলে বলল, এরকম হওয়া উচিত নয়। ইট ইজ এ শেম।
ফের অবাক সোহাগ বলে, কেন পারুল? হোয়াই ইট ইজ এ শেম?
সেটা তুমি হয়তো এখনই বুঝবে না। হয়তো কোনওদিনই বুঝবে না। তোমার পরিবার তোমাকে অন্যরকম শিখিয়েছে।
ও কে পারুল, আই ডিড সামথিং রং। কিন্তু আমি আপনার সঙ্গে আলাপ করতেই চেয়েছিলাম। আপনার ছবিটা আমাকে পাগল করে দিত। কী সুন্দর। ইউ আর স্টিল ভেরি বিউটিফুল।
কমপ্লিমেন্টটা পারুলের গায়ে ছ্যাঁকা দিচ্ছিল। বিরক্ত হয়ে সে বলল, বারবার ওকথা বলছ কেন? আমি জানি আমি সুন্দর। কিন্তু তাতে এখন আর আমার কিছু এসে যায় না।
মেয়েটা বোধহয় এবার অপমানিত বোধ করল। বলল, আপনি কি একজন নান? এ পিওর উওম্যান?
নিজেকে আমি তাই মনে করি। তুমি একটি অসভ্য মেয়ে।
মেয়েটা কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, উই হ্যাভ আওয়ার ওন অবসেশনস।
পারুল মেয়েটার পাশ কাটিয়ে খানিকটা চলে এসেছিল।
মেয়েটা হঠাৎ ডাকল, পারুল!
পারুল অনিচ্ছের সঙ্গে দাঁড়াল।
আই হ্যাভ টু টেল ইউ সামথিং।
দৌড়ে এসে হাঁপাচ্ছিল মেয়েটা।
পারুল ঠান্ডা গলায় বলল, আবার কী বলবে?
আমি বলতে চাই, ইন আওয়ার ফ্যামিলি এভরিবডি হেটস এভরিবডি। মাই ড্যাড অ্যান্ড মম হেটস ইচ আদার, আই হেট মাই ড্যাড অ্যান্ড মম অ্যান্ড দে হেটস মি। ইভন মাই ব্রাদার হেটস ড্যাড অ্যান্ড ড্যাড হেটস হিম। কিন্তু তার মধ্যেই দেখতে পাই, আমার বাবা অ্যালবাম খুলে আপনার ছবিটা যখন দেখে তখন তার মুখটা কেমন সফট আর পেনসিভ হয়ে যায়। ছবিটা আমিও মাঝে মাঝে দেখি। দেখতে দেখতে আমারও কেমন যেন হয়। মোনালিসার ছবিতে যেমন ম্যাজিক আছে তেমনই কিছু। বুডঢাও কথাটা আমাকে অনেকবার বলেছে। আমার মন খারাপ লাগলেই আমি ছবিটা দেখি আর মন ভাল হয়ে যায়। ইউ হ্যাভ বিকাম এ কাল্ট ফিগার অ্যান্ড ইভন এ গডেস টু আস। অ্যান্ড ইটস এ ট্রুথ।
এত অবাক হয়েছিল পারুল যে মুখে প্রথমে বাক্যই সরল না। তারপর বলল, এসব তো তোমার কল্পনা। আমি সামান্য মেয়ে, দেবী-টেবী নই।
উই হ্যাভ আওয়ার ইলিউশনস, আই নো৷ তবু আপনাকে দেখার খুব ইচ্ছে ছিল। মে বি ইউ আর নট এ গডেস, বাট মাস্ট বি সামওয়ান ভেরি স্পেশাল।
তুমি ভুল ভাবছ সোহাগ। ওরকম ভেবো না।
আমি একটু বেশি কথা বলে ফেলেছি আজ, কিছু মনে করবেন না। বাই।
মেয়েটা চলে যাচ্ছিল। পারুল টর্চটা জ্বেলে ওর পথের ওপর আলো ফেলে বলল, শোনো সোহাগ, এটা গ্রামদেশ। অন্ধকারে হুটহাট বেরিয়ে পোড়ো না, সাপ-খোপ আছে কিন্তু।
অন্ধকারে সোহাগের হাসি শোনা গেল, আই লাভ স্নেকস। স্নেকস আর অলওয়েজ ওয়েলকাম।
এসবই পরশুদিনের কথা। আজ তার বাবা গৌরহরি চাটুজ্জের শ্রাদ্ধের দিনে বৃহৎ লোকসমাগম থেকে একটু সরে এসে বাগানের নিরিবিলিতে দাঁড়িয়ে পারুল ভাবছিল মেয়েটা কি একটু পাগল? সাপটা সামনে দিয়ে চলে যাওয়ার পরই মেয়েটার কথা মনে পড়ল তার। সুন্দর, তবে মুখটায় একটু বিষণ্ণতা মাখানো ছিল।
অমল রায় তার ছবির দিকে চেয়ে আজও কি পুরনো ভালবাসার কথা ভাবে? নাকি তার বিশ্বাসঘাতকতার কথা মনে করে মনে মনে তেতো হয়ে যায়?
কে যেন পারুলকে ডাকছে চেঁচিয়ে। পারুল ফিরে আসছিল। উঠোনে পা দিতেই সামনে বুড়ো মানুষটা এসে পড়ল।
হ্যাঁ মা, তা খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা কি ছাদে করা হয়েছে?
হ্যাঁ ধীরেনখুড়ো। আপনি ভাল আছেন তো!
ভাল আর কী, গৌরহরিদা গেলেন, আমরাও সব পা বাড়িয়ে আছি।
একটা পেচ্ছাপের গন্ধ পাচ্ছিল পারুল। এসব গন্ধ সে একদম সইতে পারে না। নাকে আঁচল চাপা দিয়ে বলল, ইস, কী বিচ্ছিরি গন্ধ! কেন যে এরা ব্লিচিং পাউডার বা ফিনাইল ছড়ায় না!
ধীরেন কাষ্ঠ তাড়াতাড়ি দু পা পিছিয়ে গিয়ে বলে, খাওয়া-দাওয়া কি শুরু হয়ে গেছে মা? আমার আবার অনেকটা পথ– এই রোদ্দুরে–
যান না খুড়ো, ওপরে চলে যান। বোধহয় শুরু হয়েছে।
.
০৩.
গত দশদিন যাবৎ বড় জ্যাঠামশাইয়ের ভূত চারদিকে আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়াচ্ছে। চটির শব্দ শোনা যায়, গলাখাঁকারির শব্দ পাওয়া যায়, নিশুত রাতে দীর্ঘশ্বাস অবধি ভেসে বেড়ায়। দশ দিন আগে বড় জ্যাঠামশাই যখন মারা যান তখন ভরসন্ধেবেলা। চারদিকে ধোঁয়াটে আবছা অন্ধকার নেমে আসছে। সন্ধেবেলাটা হল সবচেয়ে মন খারাপ করার সময়। কালিঝুলিমাখা এক ডাইনি বুড়ি যেন এসে হাজির হলেন। প্রত্যেক দিন এই সময় তার খুব মরার কথা মনে হয়।
এক ছুটের রাস্তা। অবস্থা খারাপ শুনে তারা সব গিয়েছিল দেখতে। কয়েকজন মুরুব্বিগোছের পাড়াপ্রতিবেশী, বর্ধমান থেকে গাড়ি-চেপে-আসা গম্ভীরমুখো ডাক্তার আর আত্মীয়স্বজনে বারান্দা আর ঘর ভর্তি। তাদের জ্যাঠার ঘরে ঢুকতেই দেওয়া হয়নি। নিঃশব্দ ঘরে জ্যাঠা একা একা মারা যাচ্ছিল যখন, সেই সময়ে দুটো-তিনটে বাড়ি থেকে শাঁখের আওয়াজ এল, জ্যাঠামশাইয়ের গোয়ালঘর থেকে একটা গোরু গাঁ গাঁ করে ডাকছিল। সে বোধহয় আলো। সাদা ধবধবে আলো বড় জ্যাঠামশাইয়ের এমন বাধুক যে, জ্যাঠা গায়ে হাত রেখে পাশে না দাঁড়ালে সে দুধ ছাড়ে না, আটকে রাখে। আলো কি কিছু টের পেয়েছিল? অবোলা জীবরা বোধহয় ঠিক বুঝতে পারে। জাম্বো কুকুরটা যেমন। জ্যাঠার বারান্দার এক কোণে কেমন ঝুম হয়ে বসা। সামনের দু পায়ের ফাঁকে মাথাটা রাখা। নড়ছে না, চড়ছে না। এত লোক দেখেও একটা ঘেউ পর্যন্ত দিল না।
