খিদমতগারই বোধহয় সব জানত। কোনো গোপন কথা থাকলে সে-ই রবিকে চুপি চুপি বলে যেত। খিদমতগার বেচারার এক মুহূর্তের শান্তি ছিল না। কাউন্টারে দাঁড়িয়ে বারমেডকে কিছু বলতে অতিথিরা তবুও সঙ্কোচ বোধ করেন, কিন্তু খিদমতগারের মাধ্যমে কোনো প্রস্তাব পেশ করতে লজ্জা নেই। শাজাহান হোটেলের মদ্যরসিকরা খিদমতগারকে একটা টাকা এবং একখানা চিঠি মেমসায়েবকে পৌঁছে দেবার জন্যে দিতেন।
জেন-এর কাছে পরে শুনেছি, একরাত্রে সে তিরিশখানা চিঠি পেয়েছিল। তার মধ্যে দশজন তাকে বিয়ে করবার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। জেন বলেছিল, মাই পুওর খিদমতগার, সে যদি তিরিশ টাকা রোজ আয় করতে পারে, আই ডোন্ট মাইন্ড।
হবস একবার টোক গিললেন। সুদূরের স্মৃতিকে কাছে টেনে আনার চেষ্টা করতে করতে বললেন, আমি কিন্তু রবিকে সাবধান করে দিয়েছিলাম। বলেছিলাম, ডোন্ট ফরগেট, ক্যালকাটা ইজ ক্যালকাটা।
সাদারল্যান্ডও যেন মিস্টার হবসের কথায় চমকে উঠলেন। আস্তে আস্তে বললেন, ঠিক। কলকাতা কলকাতাই।
জেন ও রবি যখন বিয়ে করবার মতলব ভঁজছে তখনও রবিকে বলেছিলাম, মনে রেখো ক্যালকাটা ইজ ক্যালকাটা। হোটেলে যাও, ড্রিঙ্ক করো, ফুর্তি করো, কেউ কিছু বলবে না। কিন্তু তাই বলে বারমেডকে বিয়ে করে বোসো না।
মিস্টার হবস এবার একটু থামলেন।
তার কথা শুনে আমি আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিলাম। বিয়ে করে একঘরে হবার সম্ভাবনা ইংরেজ সমাজেও তাহলে আছে? এতদিন ধরে সমস্ত গালাগালিটা শুধু শুধু আমরাই হজম করে এসেছি।
মিস্টার হবস আবার বলতে আরম্ভ করলেন। আমার মধ্যে তবু সামান্য চঞ্চলতা ছিল, কিন্তু সাদারল্যান্ড পাথরের মতো নিশ্চল হয়ে তার কথা শুনতে লাগলেন।
মিস্টার হবস বললেন, আমাদের কোনো আপত্তিই রবি শোনেনি। সে বলেছে, আমি কথা দিয়েছি। শাজাহান হোটেলের নরককুণ্ড থেকে জেনকে আমার উদ্ধার করতেই হবে।
জেনও আপত্তি করেনি। শাজাহান হোটেল থেকে বেরিয়ে আসবার জন্যে সে ছটফট করতে আরম্ভ করেছে। বার-এর কাউন্টারে দাঁড়িয়ে সে যে আপনজনকে খুঁজে পেয়েছে, তা হয়তো গল্পের মতো শোনায়; কিন্তু সত্যি তা সম্ভব হয়েছে। ক্যালেন্ডারের পাতার দিকে তাকিয়ে থেকেছে জেন।
সিলভারটন গুজব শুনে মাথায় হাত দিয়ে বসেছেন। জেনকে আড়ালে ডেকে জিজ্ঞাসা করেছেন, যে-সব গুজব শুনছি, আই হোপ, সেগুলো মিথ্যে। তোমার কাজে আমরা সন্তুষ্ট হয়েছি। তোমার পপুলারিটি কলকাতার সমস্ত বারমেডদের হিংসের কারণ। পরের কনট্রাক্টে তোমার মাইনে বাড়িয়ে দেব।
জেন বলছে, বিবাহিত মেয়েদের চাকরিতে রাখতে আপনার কোনো অসুবিধে আছে?
বিবাহিত মেয়ে! জেন, তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে? ম্যারেড গার্ল দিয়ে কখনও বারমেড-এর কাজ চলে?
কেন? আপত্তি কী? জেন প্রশ্ন করেছে।
আপত্তি আমার নয়! শাজাহান হোটেলের পেট্রনদের। তারা অপমানিত বোধ করবেন। হয়তো শাজাহান বারকে বয়কট করে বসবেন। সিলভারটন বলেছেন।
জেন সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিয়েছে, আমি তা হলে কন্ট্রাক্ট সই করব না। আমাকে চাকরি ছাড়তে হবে।
সিলভারটন তখন লোভ দেখিয়েছেন। জেনকে সব ভেবে দেখতে বলেছেন। এমনকি বিক্রির উপর একটা কমিশন দিতেও রাজি হয়েছেন। জেন তবুও রাজি হয়নি। বড়লোক হবার জন্যে সে কলকাতায় আসেনি। অভাবে বিরক্ত হয়ে, বাঁচবার জন্যে, ভুল করে চলে এসেছিল বিলেত থেকে। এখন নিজের চোখে সব দেখছে।
সিলভারটন বলেছেন, তোমার প্রাইভেট লাইফে আমি কোনোরকম বাধা দেব না। দুপুরবেলা তালা দিয়ে রাখার ব্যাপারটা প্রচারের জন্য করেছিলাম। তুমি যদি চাও সে তালার চাবিও তোমাকে দিয়ে দেব। তোমার যা খুশি তাই করো।
জেন বলেছে, চাবির মধ্যে থাকবার আর প্রয়োজনই নেই। নতুন যে বারমেড আসবে, তাকে বরং ওই সুযোগটা দেবেন।
সিলভারটন তখন ভয় দেখিয়েছেন। নিজের সর্বনাশ এইভাবে ডেকে এনো না, জেন। এই ডেনজারাস শহরকে তুমি এখনও চেনো না। শাজাহান হোটেলের বারে তোমার একটু মিষ্টি হাসি দেখবার জন্যে যাঁরা সাধ্যসাধনা করেন, রাস্তায় বেরিয়ে তারাই অন্য মানুষ হয়ে যান। তাদের সমাজ আছে, হিন্দুদের থেকেও কড়া সামাজিক আইন আছে, সেখানে রাত-জেগে-মদ বিক্রি-করা মেয়েদের কোনো স্থান নেই।
জেন হেসে বলেছে, তাদের চরণে তো আমি স্থান ভিক্ষে করছি না। আমি যার কথা ভাবছি, কেবল তিনি আমার কথা ভাবলেই আমার চলে যাবে।
সিলভারটন রবির সঙ্গেও দেখা করেছেন। বলেছেন, একবার যে বার-বনিতা—সে চিরকালই বার-বনিতা। ওয়ান্স এ বারমেড অলওয়েজ এ বারমেড। আমরা খরচ দিয়ে বিদেশ থেকে মেয়ে আনি। অ্যাডেলফি, হোটেল-ডি ইউরোপ বেশি পয়সার লোভ দেখিয়ে তাদের ভাঙিয়ে নেয়। তারপর ওদের যৌবন যখন স্তিমিত হয়ে আসে, দৃষ্টির ছোবলে যখন আর তেমন বিষ থাকে না, তখন তাড়িয়ে দেয়। ওরা তখন দর্জিকে দিয়ে জামাগুলো আরো টাইট করে নিয়ে, খিদিরপুরে গিয়ে লাইন দেয়। ডকের ধারে আফ্রিকা, এশিয়া, ইউরোপ সব একাকার হয়ে যায়; ফিরিঙ্গি, কিন্তলী, বিলিতি পাশাপাশি গা ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে থাকে।
রবি বলেছে, ওই বিষয়ে আমার কোনো বই লেখবার ইচ্ছে নেই, সুতরাং আমি কিছু জানতে চাই না।
সিলভারটন শেষ চেষ্টায় রবির বড়সায়েবের কাছে দরবার করেছেন। বড় সায়েব বলেছেন, আই সি। দ্যাট গার্ল উইথ এ নটি স্মাইল। দুপুর বেলায় ওর দরজায় তোমরা যে তালা লাগিয়ে রাখো, তার কটা ড়ুপ্লিকেট চাবি আছে?
