অত রাত্রে এসে কালকে বললেন, তোমাদের তার পাইনি।
ভদ্রলোককে চিনি। আমাদের অবস্থার কথা খুলে বললাম। এমনকি টেলিফোনে অন্য জানালাম। আমার স্পেশাল রিকোয়েস্টে ওরা একটা ঘর দিতে রাজি হল।
কিন্তু ওঁর শাজাহান হোটেল কী যে ভালো লেগেছে। বললেন, কলকাতায় এই আমার শেষ আসা। শাজাহান হোটেলে থাকব বলে কতদিন থেকে স্বপ্ন দেখছি।
বললাম, যে হোটেলে আপনার ব্যবস্থা করলাম, ভারতবর্ষের সেরা হোটেলের মধ্যে সেটি একটি।
কিন্তু তিনি নাছোড়বান্দা। বোধহয় এয়ারপোর্ট থেকে ড্রিঙ্ক করে এসেছিলেন। না হলে কেউ কি বলে, দরকার হলে শাজাহান হোটেলের মেঝেতে শুয়ে থাকব। তুমি দয়া করে যা-হয়-কিছু একটা করো।
তখন বললাম, ছাদে একটা ঘর পড়ে আছে। মোটেই ভালো নয়। টিনের ছাদ, বৃষ্টি হলে ঘরে জল পড়তে পারে।
উনি তাতেই রাজি হয়ে গেলেন। অসংখ্য ধন্যবাদ দিয়ে আমার সঙ্গে উপরে চলে এলেন। অথচ অন্য সব কথাবার্তা শুনে মনে হল না যে, উনি মদ খেয়ে টাইট হয়ে আছেন।
ওঁকে তিনশো সত্তরে ঢুকিয়ে দিয়ে, আমিও এসে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। রাত্রি শেষ হতে বেশি দেরি ছিল না। ব্যাটা উইলিয়ম বাড়ি যায়নি। ওই প্লেনে অন্য কার আসবার কথা আছে বলে লাউঞ্জে বসে ঢুলছিল। ওকে কাউন্টারে বসিয়ে আমি চলে এলাম।
বোসদার কথায় মনে হল, হয় মার্কোপোলো সাদারল্যান্ডকে বশীকরণ করেছেন, না হয় ভদ্রলোক গুপ্তচরের কাজ করছেন। শাজাহান হোটেলের কোনো অতিথির উপর নজর রাখবার জন্য এখানে থাকা তার বিশেষ প্রয়োজন।
বোসদার ঘর থেকে বেরিয়ে নিজের ঘরে ঢোকার পথে সাদারল্যান্ডের সঙ্গে দেখা হয়ে গেলো। ওঁর মুখের সরল হাসিটা যেন ছোঁয়াচে। যে দেখবে, সেই হাসিতে উত্তর না দিয়ে পারবে না। ও হাসি যে কোনো স্পাই-এর হাসি, তা আমি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। ডাক্তার সাদারল্যান্ড আমাকে কাছে ডাকলেন।
সুপ্রভাত জানালাম। বিনিময়ে সুপ্রভাত জানিয়ে তিনি বললেন, ভারি সুন্দর সকাল। তাই না?
সত্যি সুন্দর সকাল।
সাদারল্যান্ড বললেন, আমি ডাক্তার মানুষ। রোগ আমাকে আকর্ষণ করে, নেচার আমাকে কখনও বিপথে নিয়ে যেতে পারে না। কিন্তু আজ আমারও কবিত্ব করতে ইচ্ছে করছে—মনে হচ্ছে, বুকের কাপড় ছিড়ে ফেলে সুন্দরী প্রভাত যেন আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। মাদার ইন্ডিয়া তার শাড়ির আঁচলের তলায় যা এতদিন লুকিয়ে রেখেছিলেন, বিদেশি সন্তানের সামনে তা এবার পরমস্নেহে তুলে ধরলেন।
আমি বললাম, আমাদের মা অকৃপণা। ভারতবর্ষের যেখানে যাবে সেখানেই তুমি তার এই স্নেহময়ী রূপ দেখতে পাবে।
হয়তো তাই। সাদারল্যান্ড বললেন। কিন্তু আমি সমস্ত ভারতবর্ষ ঘুরেছি যেখানে যেখানে এপিডেমিক হয়, সেখানে থেকেওছি। অথচ কোথাও তাঁকে আবিষ্কার করতে পারিনি। এতদিন পরে ছুটি নিয়ে এই কলকাতায় এসে আজ যেন তাকে সম্পূর্ণ আবিষ্কার করলাম।
বাইরের রোদ এবার প্রখর হতে আরম্ভ করেছে। নিজের চেয়ার থেকে উঠে পড়ে, ঘরে ঢুকতে ঢুকতে সাদারল্যান্ড আমাকেও তার ঘরে আসতে অনুরোধ করলেন।
বিছানায় নিজে বসে সাদারল্যান্ড আমাকে চেয়ারটা ছেড়ে দিলেন। বললেন, আপনার কাজের ক্ষতি করছি না তো? হয়তো আপনার ডিউটিতে যাবার সময় হয়ে গিয়েছে।
বললাম, এখন আমার ছুটি। ডিউটি আরম্ভ হবে আরও পরে। রাত্রেও বোধহয় করতে হবে।
তা হলে সারারাত আপনাকে আজ জেগে থাকতে হবে? সাদারল্যান্ড প্রশ্ন করলেন।
হ্যাঁ। তাতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই। আপনারা ডাক্তারি পড়বার সময় নাইট ডিউটি দিতেন না? আমি উত্তর দিলাম।
হাসতে হাসতে সাদারল্যান্ড বললেন, দুটোর মধ্যে কোনো তুলনা চলে না। আমরা কতকগুলো অসুস্থ মানুষের চিকিৎসার জন্য রাত্রে জেগে থাকতাম। আর হোটেল-বোঝাই একদল সুস্থ সবল লোক নরম বিছানায়, ততোধিক নরম বালিশে মাথা রেখে যখন ঘুমোবেন, তখনও তাদের পরিচর্যার জন্য কাউকে জেগে থাকতে হবে, এ আমি ভাবতে পারি না। অহেতুক ওরিয়েন্টাল লাক্সারি।
মিস্টার সাদারল্যান্ড বেশ রেগে উঠলেন। একটু থেমে বললেন, আমাকে যদি সত্যি কথা বলতে বলা হয়, আমি বলব, It its a shameful system. সত্যি লজ্জাজনক।
ডাক্তার সাদারল্যান্ড টেবিলের ঘণ্টাটা বাজালেন। তুমি যদি আপত্তি না করো, এক গ্লাস কোল্ড ড্রিঙ্ক পান করা যাক।
ডাক্তার সাদারল্যান্ডের ব্যবহারে এমন একটা আন্তরিকতার সুর ছিল যে
বলবার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।
গুড়বেড়িয়া ডিউটি শেষ করে চলে গিয়েছে। তার জায়গায় ঘন্টার ডাকে যে এল, তার নাম জানি না। তাকে নম্বর ধরে ডাকি আমরা। সে এসে সেলাম করে দাঁড়াতেই ডাক্তার বললেন, দু গ্লাস পাইন-আপেল জুস প্লিজ।
আবার সেলাম করে সে চলে যাচ্ছিল। কিন্তু সাদারল্যান্ড তার মুখের দিকে তাকিয়ে, দাঁড়াতে বললেন। এতক্ষণে আমারও নজর পড়ল। তার সারা মুখে বসন্তের দাগ। কিন্তু ডাক্তার সাদারল্যান্ড যেন হাঁ করে কোনো আশ্চর্য জিনিস দেখছেন।
জিজ্ঞাসা করলেন, কবে হয়েছিল?
বেয়ারা লজ্জা পেয়ে গিয়েছিল। কোনোরকমে বললে, অনেকদিন আগে সায়েব।
ছোটবেলায়?
আজ্ঞে, হাঁ সায়েব।
টিকে নিয়েছিলে? সায়েব জিজ্ঞাসা করলেন।
না সায়েব, টিকে নেবার আগেই হয়েছিল।
আই সি। সাদারল্যান্ড সায়েব বললেন।
বেয়ারা অর্ডার তামিল করতে বেরিয়ে গেল। সাদারল্যান্ড আমাকে বললেন, ভগবান ওকে যে মুহূর্তে দয়া করেছেন। আর একটু হলেই চোখ দুটো যেত।
