বেশিক্ষণ ওই অবস্থায় থাকলে হয়তো ভয় পেতাম। কিন্তু পোর্টার বাঁ হাত দিয়ে সামনের দিকে টেনে একটা দরজা খুলে ফেললে। একঝলক ইলেকট্রিক আলো দরজা ভেঙে সঙ্গে সঙ্গে হুড়মুড় করে ভিতরে ঢুকে পড়লো। সেই আলোতে দেখলাম, দরজায় লাল অক্ষরে ইংরেজিতে লেখা-PULL; দরজাটা পেরিয়ে যেতে সেটা আপনাআপনিই দড়াম করে বন্ধ হয়ে গেল। দরজার এদিকে একইভাবে লেখা-PUSH।
ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। বোসদা হেসে বললেন, বুঝতে পারলে না! দুনিয়ার পুরনো নিয়ম। এদিক থেকে ঠেলো, ওদিক থেকে টানো। দুনিয়ায় যাদের কপাল, চওড়া, তাদের সৌভাগ্যের দরজা এইভাবেই খুলে যায়। আর অভাগাদের বেলায় ঠিক উলটো—যেদিক টানবার কথা, সেই দিকে ঠেলে, আর ঠ্যালার দিক থেকে টানা হয়। তাদের ভাগ্যের দরজা তাই কিছুতেই নড়তে চায় না। আমাদের মধ্যে পাছে সেই ভুল কেউ করে, সেইজন্য লিখে সাবধান করে দিয়েছি!
সমস্ত ছাদ জুড়ে ছোট ছোট অসংখ্য কুঠরি রয়েছে, যার মাথায় টালি, টিন, না-হয় এসবেস্টস।
ওইগুলোই আমাদের মাথা গোঁজবার ঠাই। আমাদের বিনিপয়সার পান্থশালা; আর শাজাহান হোটেলের অন্তরাল। বোসদা বললেন।
জানলার পর্দা টুইয়ে ঘরের ভিতর থেকে সামান্য আলো বাইরে এসে পড়েছে। আকাশ অন্ধকার।
অন্ধকারে ঠিক বুঝতে পারিনি। প্রায়-উলঙ্গ কোনো মহিলা যেন একটা ইজি-চেয়ারে বসেছিলেন। আমাদের দেখে দ্রুতবেগে সেই নারীমূর্তি কোথায় ঢুকে পড়লেন।
আমি যে সঙ্গে রয়েছি তা যেন ভুলে গিয়ে বোসদা আপন মনে শিস দিতে দিতে নিজের ঘরের দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন।
বোসদার ঘরও অন্ধকার। সাদা পোশাকপরা একজন বেয়ারা ছুটে এল। তাকে দেখে বোসদা মাথা নিচু করে আস্তে আস্তে বললেন-হে রাত্রিরূপিণী, আলো জ্বালো একবার ভালো করে চিনি!
সত্যসুন্দরবাবুর ঘরে আলো জ্বলে উঠল। ঘরটার তেমন কোনো আব্রু, নেই। দেওয়ালগুলোও ইটের নয়। আসলে কাঠের কেবিন। পশ্চিমে আর উত্তরদিকে দুটো ছোট ছোট জানলা আছে। দক্ষিণে এক পাল্লা দরজা, ঠিক রাস্তার উপরেই। দরজা খোলা রাখলে ভিতরের সবকিছু দেখা যায়।
ঘরের ভিতরে ঢুকেই সত্যসুন্দরদা প্রথমে বিছানায় ঝাঁপিয়ে পড়লেন। সারাদিন দাঁড়িয়ে থেকে থেকে তিনি বেশ ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। দুএক মিনিট মড়ার মতো চিত হয়ে পড়ে থাকবার পর, সত্যসুন্দরদার দেহটা একটু নড়ে উঠল। শোয়া অবস্থায় তিনি বেয়ারাকে ডাকলেন। বেয়ারা মহলে সত্যসুন্দরদার প্রতাপের নমুনা পেলাম। সে ঘরের মধ্যেই, কোনো কথা না বলে সত্যসুন্দরদার পা থেকে জুতোটা টেনে বার করে নেবার জন্যে ফিতে খুলতে লাগল।
বেয়ারা সাবধানে জুতো জোড়া খাটের তলায় সরিয়ে দিয়ে, অভ্যস্ত কায়দায় পায়ের মোজা দুটোও খুলে নিল। পাশে একটা সস্তা কাঠের রং-ওঠা আলমারি ছিল। সেইটা খুলে বেয়ারা একজোড়া রবারের স্লিপার খাটের কাছে রেখে দিল।
সত্যসুন্দরদা বললেন, তোমাদের দুজনের আলাপ হওয়া প্রয়োজন। বেয়ারার দিকে হাত বাড়িয়ে বললেন, ইনি আমার গার্জেন, গুড়বেড়িয়া। আমার দিকে আঙুল দেখিয়ে বললেন, বস গুড়বেড়িয়া, এই বঙ্গসন্তান নতুন চাকরিতে ঢুকেছেন। শাজাহান হোটেলের ঘোটলাট সায়েব বলে এঁকে জানবে। রোজি মেমসায়েবের ঘরে আপাতত ইনি থাকবেন।
গুড়বেড়িয়া বেচারা বিনয়ে গলে গিয়ে, মাথার পাগড়ি সমেত ঘাড় নামিয়ে আমাকে নমস্কার করলে।
সত্যদা বললেন, গুড়বেড়িয়া, ৩৬২-এ ঘরের চাবিটা নিয়ে এসো। সায়েব ওঁর নিজের ঘরে চলে গিয়ে এখন বিশ্রাম নেবেন।
গুড়বেড়িয়া সঙ্গে সঙ্গে অ্যাবাউট-টার্ন করে প্রায় ছুটতে ছুটতে চাবির সন্ধানে চলে গেল। সত্যদাকে বললাম, বাঃ, বেয়ারাটি বেশ তো।
সত্যদা হেসে ফেললেন, এখন বেশ না হয়ে ওর উপায় নেই। শ্রীমান গুড়বেড়িয়া বর্তমানে নির্বাসিত জীবন যাপন করছেন।
মানে? আমি জিজ্ঞাসা করলাম।
আগে তিনতলায় ডিউটি পড়তো ওর। সেদিন আধ ডজন কাপ ভেঙে ফেলায়, কর্তারা এখানে পাঠিয়ে দিয়েছেন। হোটেলের অতিথিদের কাছ থেকে বদলি হয়ে শাজাহানের স্টাফের সেবায় আত্মনিয়োগ করাটা অনেকটা বার্মা শেলের চাকরি ছেড়ে মাখনলাল হাজরার গোলদারি মসলার দোকানে খাতা লেখার কাজ নেওয়ার মতো। বেচারাকে হাতে না মেরে ভাতে মেরেছেন ম্যানেজার সায়েব। বকশিশের ফোয়ারা থেকে ছাদের এই মরুভূমিতে পাঠিয়ে দিয়েছেন। এদিকে হেড বেয়ারা পরবাসীয়া নিজের মেয়ের সঙ্গে ওর একটা সম্বন্ধ করছিল। শ্রীমানের এই আকস্মিক ভাগ্যবিপর্যয়ে সেও পেছিয়ে যাবার মনস্থ করেছে। বেচারা এখন তাই আমার সেবা করে বিপদ থেকে উদ্ধার পাবার চেষ্টা করছে। ওর ধারণা, পরবাসীয়া এবং মার্কোগোলো দুজনের উপরই আমার বেজায় প্রভাব। আমার কোনো অনুরোধই ওঁরা নাকি ঠেলতে পারবেন না।
সত্যদা আরও কিছু হয়তো বলতেন। কিন্তু চাবি হাতে গুড়বেড়িয়া এসে পড়াতে তিনি চুপ করে গেলেন। গুড়বেড়িয়া আমাকে বললে, চলুন হুজুর।
সত্যদা বললেন, আমার কি আর তোমার সঙ্গে যাবার প্রয়োজন আছে?
মোটেই না। গুড়বেড়িয়া আমাকে সব দেখিয়ে দেবে।-বলে ওঁর কাছ থেকে বিদায় নিলাম।
৩৬২-এ ঘরটা যে কয়েকদিন খোলা হয়নি, তা দরজার উপরে জমে ওঠা ধুলো থেকেই বোঝা যাচ্ছে। চাবি খুলে ভিতরের আলোটা জ্বালিয়ে দিয়েই গুড়বেড়িয়া বোধহয় অন্য কোনো কাজে সরে পড়ল।
ঘরের মধ্যে ঢুকেই আমি কিন্তু বেশ অস্বস্তির মধ্যে পড়লাম। এই ঘরেই যে রোজি থাকত, তা ঢোকামাত্রই ড্রেসিং টেবিলের উপর যত্ন করে রাখা প্রসাধন সরঞ্জাম দেখেই বুঝতে পারলাম। যাবার সময় রোজি বোধহয় কিছুই নিয়ে যায়নি। ওর জিনিসপত্তর সবই পড়ে রয়েছে, মনে হল। যেন একটু আগে ছুটি নিয়ে মেয়েটা সিনেমা দেখতে গিয়েছে, এখন আবার ফিরে আসবে। এবং এসেই দেখবে তার অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে একটা অচেনা পুরুষ গোপনে তার শোবার ঘরে ঢুকে বসে রয়েছে।
