জল ঘেঁচে নর্দমায় ফেলা হতে লাগল; আর কুলির মাথায় বুড়ি করে পাঁক চালান দেওয়া আরম্ভ হল ময়দানে। ওই পাঁকেই তৈরি হল ডালহৌসি ক্লাবের মাঠ।
শুনেছি, সাড়ে ছশ টাকা লাগিয়ে হোটেল-ডি-ইউরোপের মালিক বহু টাকা লাভ করেছিলেন। কতরকমের মাছই যে পাওয়া গিয়েছিল। আর দৈত্যের মতো এক একটা রুই মাছ-মণখানেকের মতো ওজন। দুএকটা আবার পাঁকের মধ্যে লুকিয়েছিল। ফিনবার্গ সায়েবের লোকেরা হৈ হৈ করে কাদা থেকে সেগুলো তুলে নিয়ে এসেছিল।
মাছের গল্প হয়তো অনেকক্ষণ ধরে চলত। কিন্তু হঠাৎ কে যেন আমাদের পিছনে এসে দাঁড়াল। আমাদের চমকে দিয়েই প্রশ্ন করলে, চৌরঙ্গীর মাছগুলো যখন জলের দরে নিলামে বিকিয়ে যাচ্ছিল, তখন শাজাহান হোটেলের মালিক কী করেছিলেন?
বোসদা মুখ ফিরিয়ে বললেন, আরে উইলিয়ম। দেরি করলে যে?
একটু দেরি হয়ে গেল স্যাটা। কলকাতার ব্যাপার তো, ট্রামের মেজাজ সব সময় সমান থাকে না। আজ একটু বিগড়িয়ে গিয়েছিল। উইলিয়ম হেসে উত্তর দিলে।
উইলিয়ম ঘোষের দিকে এতক্ষণ আমি হাঁ করে তাকিয়েছিলাম। কালোর মধ্যে এমন সুন্দর চেহারা সহজে নজরে পড়ে না। পরনে যদি ধুতি থাকত, এবং রংটা যদি একটু ফর্সা হত তা হলে বলতাম কার্তিক। এমন কুচকুচে কাজল চোখ, একমাত্র ছোটবেলায় আমার পুটুদির ছিল। কিন্তু পুটুদি তার কালো হরিণ চোখে সযত্নে প্রচুর কাজল লাগাতেন। দূর থেকে উইলিয়মকে দেখলে ওই একই সন্দেহ হয়। কিন্তু কাছে এলে তবে বোঝা যাবে, ও-কাজল তার জন্ম থেকেই পাওয়া।
সাদা শার্টের উপর কালো রংয়ের প্রজাপতি টাই পরেছে উইলিয়ম ঘোষ। চলো গোঁফটা যেন গলার প্রজাপতির সঙ্গে ছন্দ মিলিয়ে কাটা হয়েছে। হাল্কা নীল রংয়ের প্যান্ট পরেছে উইলিয়ম। সঙ্গে একই রংয়ের কোট। বোতাম-খোলা কোটের মধ্য থেকে সাদা শার্টের বুকপকেটটা দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। সেখানে সিল্কের রঙিন সুতো দিয়ে লেখা—s। এই এস যে শাজাহানের এস, তা না বললেও বোঝা যায়।
খাতাপত্তর বুঝিয়ে দিয়ে বোসদা বললেন, উইলিয়ম, তোমার কপাল ভালো। শুভদিনে তোমার নাইট ডিউটি পড়েছে।
উইলিয়মকে আর কিছুই বলতে হল না, সে যেন সব বুঝে নিয়েছে। এক নম্বর সুইট কি বুক হয়েছে? মিসেস…কি এসে গিয়েছেন?
মিসেস পাকড়াশী এখনও আসেননি। আজ হঠাৎ নিজে ফোন করে ঘরটা ঠিক করলেন। বোধহয় আগে থেকে জানতেন না। নিশ্চয়ই জরুরি কাজে ভদ্রলোককে হঠাৎ চলে যেতে হয়েছে।
টমসন এসেছে? উইলিয়ম ঘোষ প্রশ্ন করলে।
হ্যাঁ, টমসন এসে গিয়েছে। দুখানা দশ টাকার নোট তোমার বাঁধা!
ব্যাডলাক ব্রাদার! চামড়াটা সাদা হলে, দুখানা কেন, আরও অনেক দশ টাকার নোট রোজগার করতে পারতাম।
নেমকহারামি করো না, উইলিয়ম। মিসেস পাকড়াশী ছাড়া আর কাউকে কখনও রিসেপশনিস্টকে টাকা দিতে দেখিনি আমি। ভদ্রমহিলার মনটা খুবই ভালো।
উত্তরে উইলিয়ম কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তার আগেই বোসদা বললেন, এবার মন চলো নিজ নিকেতনে। চামড়ার ব্যাগটা নিজের হাতে তুলে নিতে যাচ্ছিলাম। বোসদা ডাকলেন, পোর্টার।
পোর্টার দূরে টুলের উপর বসে ছিল। উঠে এসে আমাদের দুজনকে সে সেলাম করলে। কিন্তু বোসদা তার উপর চটে উঠলেন। টুপিটা বেঁকে রয়েছে কেন? ম্যানেজার সায়েব দেখলে, এখনি হাতে একটি চিঠি ভিড়িয়ে দিয়ে বিদায় করে দেবেন।
ঠিক সার্কাস দলের ক্লাউন। ক্লাউনদের ড্রেস দেখেই যেন শাজাহান হোটেলের পোর্টারদের ইউনিফর্ম তৈরি করা হয়েছিল। বেগুনি রংয়ের গলা বন্ধ কোট-অথচ হাতের অর্ধেকটা কাটা। হাতার মধ্যিখানে আবার সবুজ রংয়ের লম্বা লাইন। সেই লাইনটা প্যান্টের উপর থেকে নিচে পর্যন্ত নেমে গিয়েছে। মাথায় ভেলভেটের গোল টুপি—সেখানেও ওই সবুজ রংয়ের দাগ। টুপি, কোট এবং প্যান্ট পরার পর একটা তুলি এবং বড়ো রুল-কাঠ নিয়ে কেউ যেন একটা সবুজ রংয়ের সরল রেখা টেনে দিয়েছে। টুপির রেখাটা মাঝে মাঝে বেঁকে যেতে বাধ্য-কারণ মাল তোলবার জন্য টুপিটা খুলে প্রায়ই কাঁধের স্ট্যাপে আটকে রাখতে হয়।
পোর্টার তাড়াতাড়ি টুপিটা সোজা করে নিয়ে বললে, কসুর মাফ কিজিয়ে, হুজুর। বোসদা বললেন, লাউঞ্জে অতগুলো আয়না রাখা হয়েছে কেন? দেখে নিতে পারিস না?
পোর্টার আমার হাতের ব্যাগটা তুলে নিল। আমরা দুজনে বোসদার পিছন পিছন চলতে শুরু করলাম। লিফটে যাবে, না হেঁটে? বোসদা জিজ্ঞাসা করলেন। তারপর কী ভেবে বললেন, না, লিফটেই চলো৷ লিফ্ট চলতে আরম্ভ করল।
দোতলায় একবার থেমে লিট আবার উঠতে আরম্ভ করল।
দোতলায় সব ঘর গেস্টদের জন্যে। শুধু মার্কোপোলো কোনোরকমে টিকে রয়েছেন। তিনতলাতে একবার লিটে থামল। এয়ারকন্ডিশনের এক-ঝলক ঠান্ডা বাতাস মুখের উপর নেচে গেল। তিনতলায় শুধু গেস্ট।
তিনতলা থেকে লিষ্ট যেমনি আরও উপরে উঠতে আরম্ভ করল, সঙ্গে সঙ্গে যেন আবহাওয়ার পরিবর্তন শুরু হল। যে লিটম্যান এতক্ষণ মিলিটারি কায়দায় সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছিল, সেও যেন হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে এক হাতে পা চুলকোতে লাগল; ঠান্ডা হাওয়াটাও সুযোগ বুঝে যেন কাজে ফাঁকি দিয়ে গরম হতে আরম্ভ করল। বোসদা বললেন, এয়ারকন্ডিশন এলাকা শেষ হয়ে গেল। এবার আমাদের এলাকা।
দরজা খুলে লিফ্ট যেখানে আমাদের নামিয়ে দিলে সেখানে ঘুটঘুটে অন্ধকার। কোলাপসেবল গেট বন্ধ করে যেমনি লিফ্ট আবার পাতালে নেমে গেল, সঙ্গে সঙ্গে মনে হলো কেউ জোর করে আমাদের অন্ধকার কারাগারে বন্দি অবস্থায় ফেলে রেখে, গেট বন্ধ করে পালিয়ে গেল।
