বললাম, হাওড়ায়।
সে আবার কোথায়? মার্কোপোলো যেন অমন জায়গার নামই শোনেননি। বুঝিয়ে বললাম, গঙ্গার পশ্চিমদিকে হাওড়া স্টেশনের পরে।
ওঁর মুখ দেখে মনে হল, হাওড়া স্টেশনের পরে যে কোনো ভূখণ্ড আছে, তা যেন ওঁর জানাই ছিল না। যেন ওইখানেই স্থলভাগ শেষ হয়ে, সমুদ্র আরম্ভ হয়ে গেল!
মার্কোপোলো এবার যা প্রস্তাব করলেন তার ইঙ্গিত সত্যসুন্দরবাবুর কাছে আগেই পেয়েছিলাম। সত্যসুন্দরবাবু বলেছিলেন, এ আপনার সাধারণ আপিস নয় যে, দশটা পাঁচটায় বাঁধা জীবন—শনিবার অর্ধেক, রবিবারে পুরো ছুটি। যদি এখানে চাকরি পাকা হবার কোনো সম্ভাবনা থাকে, তাহলে কর্তা একদিন আপনাকে দুনিয়ার সঙ্গে সম্বন্ধ চুকিয়ে, শাজাহান হোটেলে এসে আশ্রয় নিতে হুকুম করবেন।
চাকরিটা রক্ষে করবার জন্য, দুনিয়ার যে কোনো বাড়িতে এসে থাকতে প্রস্তুত আছি আমি।
আমার মনের অবস্থা বুঝতে পেরে, সত্যসুন্দরবাবু বলেছিলেন, যা বুঝছি, শাজাহান হোটেলের অন্ন আপনার জন্যে অনেকদিন বাঁধা রয়েছে। স্টুয়ার্ড জিমির হাবভাব দেখে আন্দাজ করতে পারছি আমি। আপনার সম্বন্ধে জিমি এখন খুব নরম হয়ে গিয়েছে। জিমি উপরওয়ালার মন বুঝে চলে।
সত্যসুন্দরবাবুর ভবিষ্যদ্বাণী সফল হল। মার্কোপোলো একটা বার্মা সিগার ধরিয়ে বললেন, তোমাকে একটা ইমপর্টান্ট ডিসিশন নিতে হবে। তোমার আগে যে এখানে কাজ করত তার নাম রোজি। তাকে এখানে থাকতে হত। তাতে ম্যানেজমেন্টের সুবিধে। পাঁচটার মধ্যে কাজ শেষ করে ফেলবার জন্যে আমাকে হাঁকপাক করতে হত না; জরুরি কাজগুলো আসামাত্রই সঙ্গে সঙ্গে শেষ করে ফেলা যেত। আমাকে বলতেই হবে, রোজির মতো ওয়ান্ডারফুল সেক্রেটারি আমি কখনও দেখিনি। তার আঙুলগুলো টাইপরাইটারের কি-বোর্ডের উপর দিল্লি মেলের স্পিডে ছোটাছুটি করত, অথচ মুখে হাসি লেগেই আছে। আনগ্রাজিং, কখনও কাজ করতে অসন্তুষ্ট হত না।
একদিন তো বেচারাকে রাত বারোটা থেকে ডিক্টেশন নিতে হল। আমার কাজ নয়। এক গেস্টের কাজ। সে ভদ্রলোক ভোরবেলাতেই দমদম থেকে লন্ডন চলে যাচ্ছেন। পথে করাচিতে একটা চিঠি ডেলিভারি দিতেই হবে। বেচারার টাইপরাইটার নেই, নিজেও টাইপ জানেন না। আমাকে এসে রাত এগারোটায় ধরলেন। আমি বললাম, এত রাত্রে, কোথায় স্টেনো পাব? সে ভদ্রলোক নাছোড়বান্দা। এত বড় কলকাতা শহর, এখানে তোমরা চেষ্টা করলে কোনো কিছুই অসম্ভব নয়।
আমার রোজির কথা মনে পড়ে গেল। বিলিভ মি, সেই রাত্রে রোজি প্রায় তিনটে পর্যন্ত টাইপ করেছিল। আমি জানতাম না। রোজিকে কাজে বসিয়ে দিয়ে আমি ঘুমোতে চলে গিয়েছিলাম। পরের দিন ভোরে রোজিও আমাকে কিছু বলেনি। কিন্তু পরে বিলেত থেকে ভদ্রলোকের চিঠি পেলাম। তিনি লিখেছেন—সেদিন আপনার সেক্রেটারি আকাশের পরীর মতো উপর থেকে নেমে এসে আমাকে রক্ষে করেছিলেন। তাঁকে এবং আপনাকে কীভাবে ধন্যবাদ দেব জানি না। তিনি রাত তিনটে পর্যন্ত টাইপ করলেন, অথচ একটুও বিরক্ত না-হয়ে কাজ শেষ করে, আমাকে সুপ্রভাত জানিয়ে নিজের ঘরে চলে গেলেন!—মার্কোপোলো সগর্বে তাঁর সেক্রেটারির কাহিনি আমাকে বললেন।
তুমিও এখানে থেকে যাও। মার্কোপোলো বললেন।
মিস্টার মার্কোপোলো আমার সম্মতির জন্য অপেক্ষা করলেন না। ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বললেন, আমি জিমিকে বলে দিয়েছি। সে নিশ্চয়ই সব ব্যবস্থা করে রেখেছে। যদি কোনো অসুবিধে হয় সে যেন আমার সঙ্গে দেখা করে।
মার্কোপোলো এবার বিল রেজিস্টারটা পরীক্ষা করবার জন্যে কাউন্টারের দিকে চললেন। আমি প্রথমটা বুঝতে না পেরে এবং শেষে বুঝতে পেরে ধপাস করে বসে পড়লাম। আকাশের নক্ষত্রদের কোন ষড়যন্ত্রে গৃহ থেকেও গৃহহারা হতে চলেছি কে জানে!
আমার নিজস্ব একটা নাম ছিল। হাইকোর্টে সেটা হারিয়ে এসেছিলাম। একটা ঠিকানা অবশিষ্ট ছিল। বহুকষ্টের মধ্যেও এতদিন ধরে কোনোরকমে সেটা রক্ষে করে আসছিলাম। পয়সা জমিয়ে একটা চিঠির কাগজ পর্যন্ত ছাপিয়েছিলাম। ইউরোপীয় কায়দায় তার ডানদিকে শুধু ঠিকানাটাই লেখা ছিল। নাম এবং ধাম সমেত একটা রবার স্ট্যাম্পও আত্মপ্রসাদের নেশায় নগদ বারো আনা পয়সা খরচ করে তৈরি করিয়েছিলাম। স্থানে-অস্থানে সেই স্ট্যাম্প অকৃপণভাবে ব্যবহার করে, সগর্বে আমার কৌলীন্য প্রচার করেছি! সে দুটো একসঙ্গে একইদিনে নিষ্প্রয়োজনীয় হয়ে গেল। শাজাহান হোটেলের বিশাল গহ্বরে যে মানুষটা এবার হারিয়ে যাবে তার নামও থাকবে না, ঠিকানাও থাকবে না। সে যেন সত্যিই সরাইখানার নামহীন গোত্রহীন অজানা মুসাফির।
রেজিস্টারে নাম লিখতে লিখতে সত্যসুন্দরবাবু মুখ তুলে তাকালেন। বললেন, আগাম খবর পেয়ে গেছি।
সামনে একজন বিদেশি অতিথি দাঁড়িয়েছিলেন। বেয়ারা দূর থেকে ছুটে এসে কাছে দাঁড়াতেই, সত্যসুন্দরবাবু বললেন, এক নম্বর সুইট।
বেয়ারা দেওয়ালের বোর্ডে যে অসংখ্য চাবি ঝুলছে, তার একটা সায়েবের দিকে এগিয়ে দিয়ে সেলাম করলে। সায়েব বাঁহাতে মাথার সোনালি চুলগুলোকে সাজিয়ে গুছিয়ে, ডানহাতে চাবির রিঙটা ঘোরাতে ঘোরাতে উপরে উঠে গেলেন।
সত্যসুন্দরদা ফিস ফিস করে বললেন, একলা এসেছেন, কিন্তু ডবল বেডের রুম নিলেন। আমাদের সবচেয়ে সেরা সুইট, যার প্রতিদিনের রেট দুশো পঞ্চাশ টাকা। তাও বেড অ্যান্ড ব্রেকফাস্ট।
বেড অ্যান্ড ব্রেকফাস্ট কথাটার অর্থ তখনও আমার জানা ছিল না। শুনলাম, তার মানে থাকার ব্যবস্থা ছাড়া শুধু ব্রেকফাস্ট দেওয়া হবে। বাকি খাওয়ার জন্যে আলাদা বিল। যেসব টুরিস্টরা সারাদিন ঘোরাঘুরি করেন, তারা বেড অ্যান্ড ব্রেকফাস্ট রেট পছন্দ করেন। হোটেলও কম খুশি হয় না। হাঙ্গামাও কম।
