রাত একটা পর্যন্ত ওরা কিছু কাজ করতে পারে না। লাউঞ্জে তখনও লোক বসে থাকে। কাউন্টার থেকেই ক্যাবারে দর্শকদের হাততালি শোনা যায়। হোটেলের নাম শাজাহান; কিন্তু বার ও রেস্তোরাঁর নাম মমতাজ। ইতিহাসের সম্রাজ্ঞী মমতাজ তার স্বামী অপেক্ষাও ঐশ্বর্যবিলাসিনী ছিলেন কি না জানি না। কিন্তু আমাদের মমতাজ আরও অনেক সুন্দরী, আরও অনেক রোমাঞ্চময়ী। আমাদের মমতাজ রাজশয্যায় সারাদিন ঘুমিয়ে থাকেন। তার সব লীলাখেলা রাত্রে। কিন্তু কলকাতার পুলিস ও আবগারি বিভাগ মোটেই সুরসিক নন। ছোট ছেলের মতো কলকাতাওয়ালাদের আগলে রাখেন; ভাবেন রাত জাগলে শরীর খারাপ করবে। সাধারণভাবে রাত দশটা। অনেক সাধ্যসাধনা করলে মধ্যরাত্রি। হেড বারম্যান নির্ধারিত সময়ের কিছু আগে ঘরের কোণে রাখা ছোট্ট নোটিশটা সামনে এনে টাঙিয়ে দেয়-Bar closes at twelve tonight.
রাতের অতিথিরা হঠাৎ যেন ঘুম থেকে উঠে বসেন! সময় হয়েছে নিকট, এবার বাঁধন ছিড়িতে হবে। যারা চালাক তারা কিন্তু চিন্তিত হন না, শুধু বারম্যানের দিকে তাকিয়ে কাছে আসতে ইঙ্গিত করেন।
বেয়ারা সে ইঙ্গিতের অর্থ বোঝে। বলে, কপেগ হুজুর?
সাহেব হিসেব করতে শুরু করেন। এক এক পেগে যদি আধঘণ্টা সময় গিলে ফেলা যায়, তাহলে আট পেগে রাত্রির অন্ধকারকে ভোরের আলোর খপ্পরে আনা যাবে। বারোটায় বার বন্ধ, কিন্তু বার-এ বসে আগে থেকে অর্ডার দেওয়া পানীয় পানে আপত্তি নেই। আর কয়েকটা ঘণ্টা টেবিলে জড়ো করে রাখা মদ সাবাড় করতে করতে কাটিয়ে দিতে পারলেই আবার যা হয় একটা সুযোগ এসে যাবে। যে তোবারক আলী আট পেগ মদ টেবিলে দিয়ে বার বন্ধ নোটিশ টাঙিয়ে দিয়ে, চোখ মুছতে মুছতে ঘর থেকে বেরিয়ে যাবে, সেই আবার ততক্ষণে রাত্রির ঘুম শেষ করে ডান হাতে লাল ব্যাজটা জড়াতে জড়াতে আবার বার-এ এসে ঢুকবে। দেখবে সাহেব সবকটা পেগ উড়িয়ে দিয়ে তীর্থকাকের মতো ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকিয়ে বসে আছেন, কখন আবার বার খুলবে।
শাজাহান হোটেলের মেন গেট পেরিয়ে ভিতরে এসে ঢুকলাম। সত্যসুন্দরবাবু কাউন্টারে ডিউটি দিচ্ছেন। বাঁ হাতে টেলিফোনটাকে কানে ধরে আছেন, আর ডান হাতে বোধহয় কোনো মেসেজ লিখে নিচ্ছেন। আমাকে দেখে সত্যসুন্দরদা মাথা নাড়লেন। ইঙ্গিতে বললেন, সোজা কিচেনে চলে যাও। ওখানে তোমার কাজ আছে। কী কাজ? কে কাজ দেবেন, কিছুই জিজ্ঞাসা করতে পারলাম না। সত্যসুন্দরবাবু তখন কাগজের উপর ঝুঁকে পড়ে বলছেন, হা, হ্যাঁ। শাজাহান রিসেপশন থেকে আমি স্যাটা বোস কথা বলছি। করবী গুহকে এখন ফোনে পাওয়া সম্ভব নয়। যদি আপনার কিছু বলবার থাকে বলুন, আমি লিখে নিচ্ছি। উনি ঘুম থেকে ওঠা মাত্রই আপনার মেসেজ পেয়ে যাবেন।
বোসদার মুখ দেখে বুঝলাম, টেলিফোনের অপর প্রান্তের ভদ্রলোক তাঁর উত্তরে খুশি হননি। বোসদা বলে উঠলেন, আমি সবই বুঝতে পারছি। কিন্তু স্পেশাল ইনস্ট্রাকশন না থাকাতে, কোনো বোর্ডারকে আমরা ঘুমের মধ্যে জ্বালাতন করি না।…আজ্ঞে, এ-বি-সি। এ কেমন নাম? বলছেন ওই বললেই শ্ৰীমতী গুহ বুঝতে পারবেন। তবে আমাদের কাস্টম হল, পুরো নাম, ঠিকানা এবং টেলিফোন নম্বর টুকে নেওয়া…না, না, প্লিজ রাগ করবেন না; সব কিছু বলা–বলা আপনার ইচ্ছে। আমি তাকে বলব, মিস্টার এ-বি-সি ফোন করেছেন।
ফোনের ওধার থেকে ভদ্রলোক তখনও কী সব বলছেন। টেলিফোন পর্ব শেষ হবার জন্য অপেক্ষা না করে আমি সোজা কিচেনের দিকে পা বাড়ালাম।
হটাও, হটাও,—দূর থেকেই মার্কোপোলো সাহেবের বাজখাই গলার স্বর শুনতে পেলাম। কাছে এসে দেখলাম ঝাড়ুদাররা সব মাথা নিচু করে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। ভয়ে ওরা ঠক ঠক করে কাঁপছে। মুখের অবস্থা দেখে মনে হয় মিলিটারি ক্যাম্পে ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে ওদের কেউ দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। ম্যানেজার সাহেবের দিকে ওরা এমনভাবে তাকাচ্ছে যেন উনিই সেনাবাহিনীর মেজর—এখনই গুলি করবার হুকুম দেবেন।
দুনিয়ার আর কোথাও এর থেকে নোংরা হোটেল আছে? মার্কোপোলো তারস্বরে প্রশ্ন করলেন।
সবাই মাথা নিচু করে নীরবে দাঁড়িয়ে রইল। ওদের নীরবতায় বিরক্ত হয়ে মার্কোপোলো এবার গর্জন করে উঠলেন, ডেফ অ্যান্ড ডাম্ব ইস্কুলের এক্স-স্টুডেন্টরা কি সবাই দলবেঁধে এই হোটেলে চাকরি নিয়েছে? তোমরা কথা বলো না কেন?
মার্কোপোলোর সন্ধানী চোখ এবার সার্চলাইটের মতো ঘুরতে আরম্ভ করল। ঘুরতে ঘুরতে চোখটা যেখানে এসে থামল, সেখানে স্টুয়ার্ড জিমি দাঁড়িয়েছিলেন। ম্যানেজার আবার তোপ দাগলেন, জিমি, তুমি কি গ্যান্ডি পার্টিতে জয়েন করেছ? সায়লেন্স-এর ভাও নিয়েছ?
স্টুয়ার্ড, যাঁর প্রতাপের খানিকটা অভিজ্ঞতা আমার আছে, যেন কেঁচো হয়ে গিয়েছেন। কোনোরকমে বললেন, সত্যি খুব নোংরা, আপনি যা বলছেন…
এবং তুমি সেই হোটেলের স্টুয়ার্ড-যার রান্নাঘর দিয়ে দিনেরবেলায় কুমিরের মতো বড় বড় ইঁদুর ছোটাছুটি করে।
ব্যাপারটা এতক্ষণে বুঝতে পারলাম। সায়েবের সামনে দিয়ে দুটো সঁদুর কিচেনের ফ্লোরে ছোটাছুটি করেছে। তারপরই এই দৃশ্য। সায়েব আর কাউকে ছাড়তে রাজি নন।
মুখের পাইপ থেকে একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে, মার্কো এবার ঘুরে দাঁড়ালেন। তারপর বললেন, মাইডিয়ার ফেলাজ, তোমরা যেভাবে চলছ, যেভাবে স্টোরস এবং কিচেন নোংরা করে রাখছ, তাতে যদি সামনের সপ্তাহে দেখি, ইঁদুর কেন এখানে হাতি ঘুরে বেড়াচ্ছে, তাহলেও আমি আশ্চর্য হব না।
