বল্লালচরিতে যে সমুদয় আখ্যান উদ্ধৃত হইয়াছে তাহা হইতে মনে হয় যে রাজা মনে করিলে কোনো জাতিকে উন্নত অথবা অবনত করিতে পারিতেন। কিন্তু পালরাজগণের লিপিতে তাঁহাদের বর্ণাশ্রমধর্ম্ম প্রতিপালনের উল্লেখ হইতে প্রমাণিত হয় যে সাধারণত রাজগণ সমাজের বিধান সযত্নে রক্ষা করিয়া চলিতেন; বিশেষত রক্ষণশীল হিন্দুসমাজে কোনোরূপ গুরুতর পরিবর্ত্তন সহজসাধ্য ছিল না। অবশ্য কালক্রমে এরূপ পরিবর্ত্তন নিশ্চয়ই অল্পবিস্তর হইয়াছে। কিন্তু বৃহদ্ধর্ম্ম ও ব্রহ্মবৈবর্ত্তপুরাণে সামাজিক জাতিভেদের যে চিত্র পাওয়া যায় তাঁহার সহিত বর্ত্তমানকালের প্রভেদ এতই কম যে, হিন্দু যুগের অবসানে বাঙ্গালী সমাজের এই সমুদয় বিভিন্ন জাতি-অন্তত ইহার অধিকাংশই-যে বর্ত্তমান ছিল এবং তাহাদের শ্রেণীবিভাগ যে মোটামুটি একই প্রকারের ছিল তাহা নিঃসন্দেহে গ্রহণ করা যাইতে পারে।
প্রাচীন শাস্ত্রমতে সমাজের প্রত্যেক জাতিরই নির্দিষ্ট বৃত্তি ছিল। কিন্তু ইহা যে খুব কঠোরভাবে অনুসরণ করা হইত না তাঁহার বহু প্রমাণ আছে। অধ্যয়ন, অধ্যাপনা, যজন, যাজন-ইহাই ছিল ব্রাহ্মণের নির্দিষ্ট কৰ্ম্ম। কিন্তু সমসাময়িক লিপি হইতে জানা যায় যে, ব্রাহ্মণেরা রাজ্যশাসন ও যুদ্ধ বিভাগে কাৰ্য্য করিতেন। এইরূপ আমরা দেখিতে পাই যে কৈবর্ত্ত উচ্চ রাজকার্যে নিযুক্ত ছিলেন, করণ যুদ্ধ ও চিকিৎসা করিতেন, বৈদ্য মন্ত্রীর কাজ করিতেন এবং দাসজাতীয় ব্যক্তি রাজকর্ম্মচারী ও সভাকবি ছিলেন।
বিভিন্ন জাতির মধ্যে অনুগ্রহণ ও বৈবাহিক সম্বন্ধ বিষয়ে উনবিংশ শতাব্দীর ন্যায় কঠোরতা প্রাচীন হিন্দু যুগে ছিল না। একজাতির মধ্যেই সাধারণত বিবাহাদি হইত, কিন্তু উচ্চশ্রেণীর বর ও নিম্নশ্রেণীর কন্যার বিবাহ শাস্ত্রে অনুমোদিত ছিল এবং কখনো কখনো সমাজে অনুষ্ঠিত হইত। শিলালিপিতে স্পষ্ট প্রমাণ আছে যে ব্রাহ্মণ শূদ্রকন্যা বিবাহ করিতেন, এবং তাঁহাদের সন্তান সমাজে ও রাজদরবারে বেশ সম্মান লাভ করিতেন। সামন্তরাজ লোকনাথ ভরদ্বাজ গোত্রীয় ব্রাহ্মণ বংশে জন্মগ্রহণ করেন কিন্তু তাঁহার মাতামহ ছিলেন পারশব অর্থাৎ ব্রাহ্মণ পিতা ও শূদ্রা মাতার সন্তান। কিন্তু পারশব হইলেও তিনি সেনাপতির পদ অলঙ্কৃত করিতেন। হিন্দু যুগের শেষ পর্য্যন্ত যে এইরূপ বিবাহ প্রচলিত ছিল ভট্টভবদেব ও জীমূতবাহনের গ্রন্থ হইতে তাহা বেশ বোঝা যায়। তবে দ্বিজাতির শূদ্রকন্যা বিবাহ যে ক্রমশ নিন্দনীয় হইয়া উঠিয়াছিল সে বিষয়ে সন্দেহ নাই।
বিভিন্ন জাতির মধ্যে পান ও ভোজন সম্বন্ধে নিষেধের কঠোরতাও এইরূপ আস্তে আস্তে গড়িয়া উঠিয়াছে। প্রাচীন স্মৃতি অনুসারে সাধারণত কেবলমাত্র ব্রাহ্মণেরা শূদ্রের অন্ন ও জল গ্রহণ করিতেন না, এবং এই বিধিও খুব কঠোরভাবে প্রতিপালিত হইত না। এ সম্বন্ধে হিন্দু যুগের অবসানকালে বাংলা সমাজের কিরূপ বিধি প্রচলিত ছিল ভবদেবভট্ট প্রণীত ‘প্রায়শ্চিত্ত-প্রকরণ’ গ্রন্থে তাঁহার কিছু পরিচয় পাওয়া যায়।
ভবদেব বিধান করিয়াছেন যে চাণ্ডালস্পৃষ্ট ও চাণ্ডালদি অন্ত্যজ জাতির পাত্রে রক্ষিত জল পান করিলে ব্রাহ্মণাদি চতুৰ্ব্বণের প্রায়শ্চিত্ত করিতে হইবে। শূদ্রের জল পান করিলে ব্রাহ্মণের সামান্য প্রায়শ্চিত্ত করিলে শুদ্ধি হইত। ব্রাহ্মণেতর জাতির পক্ষে এরূপ কোনো নিষেধ দেখা যায় না।
অন্ন বিষয়েও কেবল চাণ্ডালস্পৃষ্ট এবং চাণ্ডাল, অন্ত্যজ ও নটনৰ্তকাদি কতকগুলি জাতির পক্ অন্ন বিষয়ে নিষেধের ব্যবস্থা আছে। আপস্তম্বের একটি শ্লোকে উক্ত হইয়াছে যে, ব্রাহ্মণ শূদ্রের অন্ন গ্রহণ করিলে তাঁহাকে প্রায়শ্চিত্ত করিতে হইবে। ভবদেব এই শ্লোকের উল্লেখ করিয়া নিম্নলিখিতরূপ মন্তব্য করিয়াছেন : ব্রাহ্মণ বৈশ্যান্ন গ্রহণ করিলে প্রায়শ্চিত্তের মাত্রা চতুর্থাংশ কম এবং ক্ষত্রিয়ান্ন গ্রহণ করিলে অর্ধেক; ক্ষত্রিয় শূদ্ৰান্ন ভোজন করিলে প্রায়শ্চিত্তের মাত্রা চতুর্থাংশ কম ও বৈশ্যান্ন গ্রহণ করিলে অর্ধেক; এবং বৈশ্য শূদ্ৰান্ন গ্রহণ করিলে প্রায়শ্চিত্ত অর্ধেক–এইরূপ বুঝিতে হইবে। ভবদেব যে মূল শ্লোক উদ্ধৃত করিয়াছেন তাহাতে কিন্তু এরূপ কোনো কথা নাই, এবং এই উক্তির সমর্থক অন্য কোনো শাস্ত্রবাক্য থাকিলে ভবদেব নিশ্চয়ই তাঁহার উল্লেখ করিতেন। ইহা হইতে অনুমিত হয় যে শূদ্র ও অন্ত Uজ ব্যতীত অন্য জাতির অনুগ্রহণ করা পূর্ব্বে ব্রাহ্মণের পক্ষেও নিষিদ্ধ ছিল না; ক্রমে হিন্দু যুগের অবসানকালে এই প্রথা ধীরে ধীরে গড়িয়া উঠিতেছিল। ভবদেব-শূদ্রের কন্দুপক্ক, তৈল-পক্ক, পায়েস, দধি প্রভৃতি ভোজ্য গ্রহণীয়-হারীতের এই উক্তি এবং আপস্তম্বের একটি বচন সমর্থন করিয়াছেন-তাহাতে বলা হইয়াছে যে ব্রাহ্মণ যদি আপকালে শূদ্রের অন্ন ভোজন করেন তাহা হইলে মনস্তাপ দ্বারাই শুদ্ধ হন। দ্বাদশ শতাব্দীর প্রসিদ্ধ বাঙ্গালী স্মাৰ্ত্ত ভবদেবভট্টের এই সমুদয় উক্তি হইতে অনুমিত হয় যে বিভিন্ন জাতির মধ্যে পান-ভোজন সম্বন্ধে নিষেধ তখনো পরবর্ত্তীকালের ন্যায় কঠোর রূপ ধারণ করে নাই এবং চাণ্ডালান্ন গ্রহণ করিলেও ব্রাহ্মণের জাতিপাত হইত না-প্রায়শ্চিত্ত করিলেই শুদ্ধি হইত।
.
২. ব্রাহ্মণ
