সামলবর্ম্মার পর তাঁহার পুত্র ভোজবর্ম্মা রাজত্ব করেন। তাঁহার রাজধানী বিক্রমপুর হইতে তাঁহার রাজত্বের পঞ্চম বৎসরে বেলাব-তাম্রশাসন প্রদত্ত হয়। এই তাম্রশাসনে ভোজবর্ম্মা পরমবৈষ্ণব পরমেশ্বর পরমভট্টারক মহারাজাধিরাজ প্রভৃতি উপাধিতে ভূষিত হইয়াছেন। সুতরাং তিনি যে একজন স্বাধীন ও পরাক্রান্ত রাজা ছিলেন এরূপ অনুমান করা অসঙ্গত নহে। কিন্তু ভোজবর্ম্মার পরে এই বংশের কোনো বিবরণ পাওয়া যায় না। সম্ভবত দ্বাদশ শতাব্দের প্রথমার্ধে সেনরাজবংশীয় বিজয়সেন এই বৰ্ম্মরাজবংশের উচ্ছেদ করেন।
১২. সেনরাজবংশ
দ্বাদশ পরিচ্ছেদ –সেনরাজবংশ
১. উৎপত্তি
সেনরাজগণের পূর্ব্বপুরুষগণ দাক্ষিণাত্যের অন্তর্গত কর্ণাটদেশের অধিবাসী ছিলেন। বম্বে প্রদেশ ও হায়দ্রাবাদ রাজ্যের দক্ষিণ এবং মহীশূর রাজ্যের উত্তর ও পশ্চিম ভাগ প্রাচীন কর্ণাটদেশের অন্তর্ভুক্ত ছিল। সেনরাজগণের শিলালিপি অনুসারে তাঁহারা চন্দ্রবংশীয় এবং ব্রহ্মক্ষত্রিয় ছিলেন। বাংলা দেশের প্রাচীন কুলজী গ্রন্থে তাঁহাদিগকে বৈদ্য জাতীয় বলা হইয়াছে। আধুনিককালে তাহাদিগকে কায়স্থ এবং বাংলা দেশের অন্যান্য সুপরিচিত জাতিভুক্ত বলিয়া প্রতিপন্ন করিবার চেষ্টা হইয়াছে। কিন্তু এ বিষয়ে সমসাময়িক লিপিতে তাঁহাদের নিজেদের উক্তি সত্য বলিয়া গ্রহণ করিতে হইবে। সুতরাং সেনরাজগণ যে জাতিতে ব্রহ্মক্ষত্রিয় ছিলেন সে সম্বন্ধে সন্দেহ করিবার কোনো কারণ নাই। বাংলা দেশে আসিবার পর তাহারা হয়ত বৈবাহিক সম্বন্ধ দ্বারা বৈদ্য অথবা অন্য কোনো জাতির অন্তর্ভুক্ত হইয়াছিলেন, কিন্তু এ সম্বন্ধে নিশ্চিত কিছু বলা যায় না।
ব্ৰহ্মক্ষত্রিয় একটি সুপরিচিত জাতি। অনেকে মনে করেন যে প্রথমে ব্রাহ্মণ ও পরে ক্ষত্রিয় হওয়াতেই এই জাতির এরূপ নামকরণ হইয়াছে। সেনরাজগণের এক পূৰ্বপুরুষ ব্রহ্মবাদী বলিয়া উল্লিখিত হইয়াছেন। এই সময় কর্ণাটদেশে (বর্ত্তমান ধারবাড় জিলায়) সেন উপাধিধারী অনেক জৈন আচার্যের নাম পাওয়া যায়। ইঁহারা সেনবংশীয় বলিয়া অভিহিত হইয়াছেন। কেহ কেহ অনুমান করেন যে বাংলার সেনরাজগণ এই জৈন আশ্চার্যবংশে জন্মগ্রহণ করেন। প্রথমে তাঁহারা জৈনধর্ম্ম ত্যাগ করিয়া শৈবধর্ম্ম ও পরবর্ত্তীকালে ধৰ্ম্মচৰ্য্যার পরিবর্তে শস্ত্ৰচৰ্য্যা গ্রহণ করেন। এই অনুমান কত দূর সত্য তাহা বলা কঠিন।
সেনরাজগণ কোন সময়ে বাংলা দেশে প্রথম বসতি স্থাপন করেন সে সম্বন্ধে সেনরাজগণের লিপিতে যে দুইটি উক্তি আছে তাহা প্রথমে পরস্পরবিরোধী বলিয়াই মনে হয়। বিজয়সেনের দেওপাড়া লিপিতে কথিত হইয়াছে যে সামন্তসেন রামেশ্বর সেতুবন্ধ পর্য্যন্ত বহু যুদ্ধাভিযান করিয়া এবং দুৰ্বত্ত কর্ণাটলক্ষ্মী-লুণ্ঠনকারী শত্রুকুলকে ধ্বংস করিয়া শেষ বয়সে গঙ্গাতটে পুণ্যাশ্রমে জীবন যাপন করিয়াছিলেন। ইহা হইতে স্বতঃই অনুমিত হয় যে সামন্তসেনই প্রথমে কর্ণাট হইতে বঙ্গদেশে আসিয়া গঙ্গাতীরে বাস করেন। কিন্তু বল্লালসেনের নৈহাটি তাম্রশাসনে উক্ত হইয়াছে যে চন্দ্রের বংশে জাত অনেক রাজপুত্র রাঢ়দেশের অলঙ্কারস্বরূপ ছিলেন এবং তাঁহাদের বংশে সামন্তসেন জন্মগ্রহণ করেন। এখানে স্পষ্ট বলা হইয়াছে যে, সামন্তসেনের পূর্ব্বপুরুষগণ রাঢ়দেশে প্রতিষ্ঠা লাভ করিয়াছিলেন। এই দুইটি উক্তির সামঞ্জস্য সাধন করিতে হইলে বলিতে হয় যে কর্ণাটের এক সেনবংশ বহুদিন যাবৎ রাঢ়দেশে বাস করিতেছিলেন, কিন্তু তাঁহারা কর্ণাট দেশের সহিতও সম্বন্ধ রক্ষা করিয়া আসিতেছিলেন। এই বংশের সামন্তসেন যৌবনে কর্ণাট দেশে বহু যুদ্ধে নিজের শৌর্যবীর্যের পরিচয় দিয়া এই বংশের উন্নতির সূত্রপাত করেন এবং সম্ভবত ইহার ফলেই তাঁহার পুত্র হেমন্তসেন রাঢ়দেশে একটি স্বাধীন রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন।
কী উপায়ে বিদেশীয় সেনগণ সুদূর কর্ণাট দেশ হইতে আসিয়া বাংলায় রাজ্য প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন তাহা অদ্যাবধি সঠিক নির্ণীত হয় নাই। কেহ কেহ অনুমান করেন যে তাঁহারা প্রথমে পালরাজগণের অধীনে সৈন্যাধ্যক্ষ অথবা অন্য কোনো উচ্চ রাজকার্যে নিযুক্ত ছিলেন। পরে পালরাজগণের দুর্বলতার সুযোগে রাজ্য প্রতিষ্ঠা করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন। এই অনুমানের সপক্ষে বলা যাইতে পারে যে পালরাজগণের তাম্রশাসনগুলিতে যে কর্ম্মচারীর তালিকা আছে তাঁহার মধ্যে নিয়মিতভাব ‘গৌড়-মালব-খশ-হূণ-কুলিক-কর্ণাট-লাট-চাট-ভাট’ এই পদের উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায়। সুতরাং সম্ভবত পালরাজগণ খশ হূণ প্রভৃতির ন্যায় কর্ণাটগণকেও সৈন্যদলে নিযুক্ত করিতেন এবং সেনবংশীয় তাহাদের নায়ক কোনো সুযোগে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষুদ্র এক রাজ্যের অধিপতি হইয়াছিলেন।
কেহ কেহ বলেন যে, কর্ণাটদেশীয় সেনরাজগণের পূর্ব্বপুরুষ কোনো আক্রমণকারী রাজার সহিত দাক্ষিণাত্য হইতে বঙ্গদেশে আসিয়া প্রথমে শাসনকর্ত্তা বা সামন্তরাজরূপে প্রতিষ্ঠিত হন এবং অষ্টাদশ শতাব্দীতে সিন্ধিয়া হোলকার প্রভৃতি মহারাষ্ট্র নায়কগণের ন্যায় ক্রমে পশ্চিমবঙ্গে এক স্বাধীন রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন। কর্ণাটের চালুক্যরাজগণ যে একাধিকবার বঙ্গদেশ আক্রমণ করেন তাহা পূর্ব্বেই। বলা হইয়াছে। যুবরাজ বিক্রমাদিত্য আ ১০৬৮ অব্দে গৌড় ও কামরূপ আক্রমণ করিয়া জয়লাভ করিয়াছিলেন। ইহার পূর্ব্বে ও পরে এইরূপ আরও বিজয়াভিযানের কথা চালুক্যগণের শিলালিপিতে উল্লিখিত হইয়াছে। একখানি লিপি হইতে জানা যায় যে একাদশ শতাব্দীর শেষ অথবা দ্বাদশ শতাব্দীর প্রথমভাগে আচ নামক • চালুক্যরাজ বিক্রমাদিত্যের একজন সামন্ত বঙ্গ ও কলিঙ্গ রাজ্যে স্বীয় প্রভুর আধিপত্য স্থাপন করিয়াছিলেন। ১১২১ ও ১১২৪ অব্দে উৎকীর্ণ লিপিতে বিক্রমাদিত্য কর্ত্তৃক অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, গৌড়, মগধ ও নেপাল জয়ের উল্লেখ আছে। সুতরাং ইহা অসম্ভব নহে যে, এই সমস্ত অভিযানের ফলেই কর্ণাটবংশীয় সেনগণ বঙ্গদেশে এবং নান্যদেব মিথিলায় প্রভুত্ব স্থাপনের সুযোগ পাইয়াছিলেন।
