.
২. বঙ্গ
রাজ্য শশাঙ্কের সাম্রাজ্যভুক্ত ছিল কি না নিশ্চিত বলা যায় না। কিন্তু শশাঙ্কের মৃত্যুর পরই যে এখানে সমতট নামে স্বাধীন রাজ্য ছিল হুয়েন সাংয়ের বিবরণ হইতেই তাহা জানা যায়। হুয়েন সাং আরও বলেন যে সমতটে এক ব্রাহ্মণবংশ রাজত্ব করিতেন, এবং এই বংশীয় শীলভদ্র তাঁহার সময়ে নালন্দার অধ্যক্ষ ছিলেন।
অতঃপর খড়গবংশের অভ্যুদয় হয়। খড়েগাদ্যম, তৎপুত্র জাতখড়গ ও তৎপুত্র দেবখড়গ এই তিনজন রাজা সম্ভবত সপ্তম শতাব্দীর শেষার্ধে রাজত্ব করেন। দেখড়েগর পুত্র রাজরাজ অথবা রাজরাজভটও সম্ভবত তাঁহার পরে রাজত্ব করেন। এই রাজগণ সকলেই বৌদ্ধধর্ম্মাবলম্বী ছিলেন। তাঁহাদের রাজ্য দক্ষিণ ও পূর্ব্ববঙ্গে বিস্তৃত ছিল। কেহ কেহ অনুমান করেন যে তাঁহাদের রাজধানীর নাম ছিল কৰ্ম্মান্ত এবং ইহাই বর্ত্তমানে কুমিল্লার নিকটবর্ত্তী বড়কামতা নামে পরিচিত। কিন্তু এই মত নিঃসংশয়ে গ্রহণ করা যায় না।
চীনদেশীয় পরিব্রাজক সেংচি সপ্তম শতাব্দীর শেষে এদেশে আসেন। তিনি সমতটের রাজা রাজভটের বৌদ্ধধর্ম্মে বিশেষ অনুরাগের কথা লিখিয়াছেন। সম্ভবত এই রাজভট ও খড়গবংশীয় রাজরাজ অভিন্ন। দেখগের রাণী প্রভাবতী কর্ত্তৃক একটি ধাতুময়ী সৰ্ব্বাণী (দুর্গা) মূৰ্তি কুমিল্লার ১৪ মাইল দক্ষিণে দেউলবাড়ী গ্রামে আবিষ্কৃত হইয়াছে।
কেহ কেহ মনে করেন যে খড়গবংশীয়েরা অষ্টম অথবা নবম শতাব্দীতে রাজত্ব করেন। খড়গবংশীয়ের উৎপত্তি সম্বন্ধেও সঠিক কিছু জানা যায় না। নেপালে খড়ুক অথবা খর্ক নামে এক বংশ ছিল। তাহাদের রাজা ক্ষত্রিয় বলিয়া দাবী করিতেন। ষোড়শ শতাব্দীতে এই বংশের রাজা দ্রব্য সাহ গুখা জিলা দখল করেন এবং বর্ত্তমান গুর্খা রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন। প্রাচীন খড়গ বংশের সহিত এই বংশের কোনো সম্বন্ধ থাকা অসম্ভব নহে। তবে এ সম্বন্ধে নিশ্চিত কিছু বলা যায় না।
কনৌজের রাজা যশোবৰ্ম্মা গৌড়রাজকে বধ করার পর বঙ্গ জয় করেন। বাকপতির বর্ণনা হইতে অনুমিত হয় যে বঙ্গরাজ বেশ শক্তিশালী ছিলেন এবং তাঁহার বহু রণহস্তী ছিল। গৌড়বহো কাব্যে উক্ত হইয়াছে যে যশোবর্ম্মার নিকট বশ্যতা স্বীকারের সময় বঙ্গবাসীদের মুখ পাণ্ডুর বর্ণ ধারণ করিয়াছিল, কারণ তাহারা এরূপ কাৰ্য্যে অভ্যস্ত নহে। বিদেশী কবি কর্ত্তৃক বঙ্গের বীরত্ব ও স্বাধীনতা প্রীতির উল্লেখ সম্ভবত তাঁহার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ফল। যশোবর্ম্মার অধিকার খুব বেশী দিন স্থায়ী হয় নাই। গৌড়ের অপর দুই বহিঃশত্রু ললিতাদিত্য ও হর্ষের সহিত বঙ্গের কোনো সম্বন্ধ ছিল না।
যশোবর্ম্মা যে সময় বঙ্গ জয় করেন, সে সময়েও খড়গবংশীয়েরা রাজত্ব করিতেছিলেন কি না বলা কঠিন। কারণ ইহার কিছু পূৰ্ব্বে রাত উপাধিধারী এক রাজবংশ কুমিল্লা অঞ্চলে রাজত্ব করিতেন। এই বংশীয় জীবধারণ রাত ও তাঁহার পুত্র শ্রীধারণ রাত এই দুই রাজার সমতটেশ্বর উপাধি ছিল এবং শ্রীধারণের তাম্রশাসনে উক্ত হইয়াছে যে সমতটাদি অনেক দেশ তাঁহার রাজ্যভুক্ত ছিল। শ্রীধারণের সামন্তসূচক উপাধি হইতে অনুমিত হয় যে আদিতে এই বংশের রাজগণ কোনো রাজার অধীন ছিলেন কিন্তু শেষে প্রকৃতপক্ষে স্বাধীন রাজার ন্যায় রাজত্ব করিতেন। কেহ কেহ অনুমান করেন যে রাতবংশ খড়গবংশের সামন্ত ছিল। কিন্তু এই দুই বংশ মোটামুটি সমসাময়িক হইলেও এই সিদ্ধান্ত নিশ্চিতরূপে গ্রহণ করা যায় না। শ্রীধারণের তাম্রশাসন হইতে জানা যায় যে ক্ষীরোদা নদী পরিবেষ্টিত দেবপৰ্বত এই বংশের রাজধানী ছিল। দেবপর্বত খুব সম্ভবত কুমিল্লা নগরীর পশ্চিমে লালমাই-ময়নামতী পাহাড়ের দক্ষিণভাগে অবস্থিত ছিল। কেহ কেহ অনুমান করেন যে ময়নামতী টিলার প্রায় সাড়ে তিন মাইল দক্ষিণে পাহাড়ের পূর্ব্ব উপকণ্ঠে “আনন্দ রাজার বাড়ী” নামে বর্ত্তমানকালে পরিচিত স্থানই ঐ দেবপৰ্ব্বতের ধ্বংসাবশেষ-কারণ ইহার নিকটবর্ত্তী খাতটি এখনো স্থানীয় লোকের নিকট ক্ষীর নদী বলিয়া পরিচিত।
এই সময়কার একখানি তাম্রশাসনে সামন্তরাজ লোকনাথের ও তাঁহার পূৰ্বপুরুষগণের পরিচয় পাওয়া যায়। তাঁহারা ত্রিপুরা অঞ্চলে রাজত্ব করিতেন। লোকনাথ ও জীবধারণ রাত সমসাময়িক ছিলেন কিন্তু উভয়ের মধ্যে কী সম্বন্ধ ছিল, সঠিক নির্ণয় করা যায় না। কাহারও কাহারও মতে লোকনাথ জীবধারণের সামন্ত ছিলেন, কিন্তু প্রথমে উভয়ের মধ্যে যুদ্ধ উপস্থিত হইয়াছিল। জীবধারণ বহু সৈন্য ক্ষয় করিয়াও লোকনাথকে পরজিত করিতে পারেন নাই। কিন্তু পরে অন্য এক যুদ্ধে লোকনাথ তাঁহাকে সাহায্য করায় সন্তুষ্ট হইয়া তিনি লোকনাথকে বিস্তৃত ভূখণ্ডসহ শ্রীপট্ট দান করেন। এই মতটি নিশ্চিত সিদ্ধান্তরূপে গ্রহণ করা যায় না।
উল্লিখিত বর্ণনা হইতে অনুমিত হয় যে শশাঙ্ক-হর্ষবর্দ্ধন-ভাস্করবর্ম্মার তিরোধানের পরে খৃষ্টীয় সপ্তম শতাব্দীর শেষভাগে পূৰ্ব্ববঙ্গে অনেকগুলি স্বাধীন রাজ্যের উদ্ভব হইয়াছিল। তিব্বতীয় লামা তারনাথ সপ্তদশ শতাব্দীতে ভারতীয় বৌদ্ধধৰ্ম্মের যে ইতিহাস রচনা করেন, তাহাতে এই যুগের বাংলা দেশের অনেক কাহিনী লিপিবদ্ধ হইয়াছে। এই সমুদয় কাহিনী একেবারে অমূলক না হইলেও অন্যবিধ প্রমাণ ব্যতিরেকে সত্য বলিয়া গ্রহণ করা যায় না। তিনি চন্দ্রবংশীয় অনেক রাজার উল্লেখ করিয়াছেন। এই বংশের শেষ দুই রাজা গোবিচন্দ্র ও ললিতচন্দ্র। এই দুই রাজার অস্তিত্ব স্বীকার করিলে বলিতে হয় যে এই চন্দ্রবংশীয় রাজারাই খড়গ অথবা রাতবংশীয়দের নিকট হইতে বঙ্গ জয় করেন এবং সম্ভবত ললিতচন্দ্রই যশোবর্ম্মার হস্তে পরাজিত হইয়াছিলেন। রাজা গোপীচন্দ্র ও তাঁহার মাতা ময়নামতী সম্বন্ধে বঙ্গদেশে বহু প্রবাদ, কাহিনী ও গীতিকাব্য প্রচলিত আছে। ইহার মর্ম এই যে গোপীচন্দ্র অদুনা ও পদুনা নামক দুই রাণীকে পরিত্যাগ করিয়া যৌবনে মাতার আদেশে সন্ন্যাস অবলম্বন করেন এবং হাড়ি সিদ্ধা অথবা হাড়িপার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। অনেকে মনে করেন যে তারনাথ কথিত গোবিচন্দ্র ও এই গোপীচন্দ্র অভিন্ন। কিন্তু এ সম্বন্ধে সন্দেহ করিবার যথেষ্ট কারণ আছে।
০৬. পালসাম্রাজ্য
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ –পালসাম্রাজ্য
