এসো রিকশা করে দি। এখানে রিকশা পাওয়া মুশকিল।
লিলি ভেবেছিল তার কথা উনি বিশ্বাস করবেন না। নানান প্রশ্ন-ট্রশ্ন করবেন। সে-রকম কিছু হলো না। হাসনাত লিলির সঙ্গে সঙ্গে হাঁটছে। লিলির বলতে ইচ্ছে করছে, আপনি চলে যান আপনাকে রিকশা ঠিক করে দিতে হবে না। আমি ঠিক করে নেব।
এতগুলো কথা বলার মতো শক্তি এখন তার নেই। মানুষটা যে রিকশার জন্য তার সঙ্গে সঙ্গে আসছে এটা একদিক দিয়ে ভালোই। তিনিও চিন্তা করার সময় পাচ্ছেন। তাকে ফিরে গিয়ে বন্ধুদের ব্যাপারটা বলতে হবে। কি বলবে এটা ভাবার জন্যও সময় দরকার।
রিকশা না, বেবিট্যাক্সি পাওয়া গেল। হাসনাত দরদাম করে ভাড়া ঠিক করল। মগবাজার থেকে রাজিয়া সুলতানা রোড। কুড়ি টাকা। লিলির একটু আশ্চর্য লাগছে এ-রকম অবস্থায় কেউ বেবি ট্যাক্সিওয়ালার সঙ্গে দরদাম করতে পারে। বেবিট্যাক্সি ভাড়াও হাসনাত ট্যাক্সিওয়ালার হাতে দিয়ে দিলো দুটো চকচকে দশ টাকার নোট। মনে হয় বিয়ে উপলক্ষে কিছু চকচকে নতুন নোট ভদ্রলোক যোগাড় করেছেন।
বিদায় নেবার আগেই বেবিট্যাক্সিওয়ালা হুস করে বের হয়ে গেল।
হাসনাতের হাতের সিগারেট নিভে গেছে। সে পান-সিগারেটের দোকান থেকে দেশলাই কিনে সিগারেট ধরাল। সে কাজী অফিসের দিকে যাচ্ছে।
.
লিলির নিজেদের বাসায় ফিরে যেতে ইচ্ছা করছে না। নতুন কোনো জায়গায় যেতে ইচ্ছে করছে। শান্ত নিরিবিলি ধরনের কোনো জায়গা। হইচই চেঁচামেচি নেই, ছায়া ছায়া ধরনের কোনো জায়গা। যেখানে প্রচুর গাছপালা। গাছপালার ভিতর ছোট্ট একটা বাড়ি। বাড়ির খুব কাছেই নদী। নদীতে নৌকা-টৌকা কিছু নেই। শুধুই নদী। কিংবা পুকুরও থাকতে পারে। বড় পুকুর, যার পানি কাচের মতো এত সুন্দর সেই পানি যে, দেখলেই গায়ে-মাথায় মাখতে ইচ্ছা করে। নদীর ঘাটটা থাকবে মারবেল পাথরে বাঁধানো।
সে তার স্বপ্নের বাড়ি নিয়ে আরও কিছুক্ষণ ভাবত কিন্তু তার আগেই বাসার কাছে চলে এল। তার মনটা গেল খারাপ হয়ে। কী বিশ্রী একটা বাড়ি! সদর দরজাটা খোলা। যার ইচ্ছা ভেতরে ঢুকছে। যার ইচ্ছা বেরুচ্ছে।
একবার এক ভিক্ষুক ভিক্ষা চাইতে একেবারে বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল। আজও দুজন ফকিরণীকে দেখা গেল বারান্দায় বসে জমিয়ে গল্প করছে। দুজন দুজনের মাথার উকুন বাছছে। লিলিকে দেখে তারা এমনভাবে তাকাল যেন লিলি বাইরের একটা মেয়ে বিনা অনুমতিতে তাদের ঘরে ঢুকে যাচ্ছে।
একতলার বারান্দায় লিলি খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। বাড়ির পরিস্থিতি বোঝার জন্য এটা দরকার। কাজের বুয়া এক গাদা কাচের বাসন নিয়ে কলঘরের দিকে যাচ্ছে। এক্ষুনি সে একটা-কিছু ঝনঝন করে ভাঙবে। বাসন ভাঙা তার হবি। রোজই ভাঙে। লিলি বলল, বুয়া, মা কোথায়?
উপরে।
কী করছে?
বুয়া নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল, ছোট দুই আফারে দরজা বন্ধ কইরা মারতাছে।
আশ্চর্য কাণ্ড! বড় বড় দুটো মেয়েকে দরজা বন্ধ করে মারা হচ্ছে–এটা যেন খুব স্বাভাবিক একটা ঘটনা।
আফনেরে আইজ সুন্দর-মুন্দর লাগতাছে।
তুমি তোমার কাজে যাও বুয়া।
লিলি সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠছে। মার হাত থেকে রুমু ঝুমুকে উদ্ধার করবে কি বুঝতে পারছে না। আর ভালো লাগে না। দরকার কি উদ্ধার করার। যা ইচ্ছা হোক। লিলি নিজের ঘরের দিকে যাচ্ছে–ফরিদা তখন বের হয়ে এলেন। মেয়েদের শাস্তি দিয়ে তিনি খানিকটা ক্লান্ত। হাঁপাচ্ছেন। লিলিকে স্বাভাবিক গলায় বললেন, ঐ মেয়েটা বার-বার টেলিফোন করছে।
কোন মেয়েটা?
ঐ যে শ্যামলা মতো–কি যেন নাম। তোর কাছে প্রায়ই আসে।
স্বাতী?
হুঁ। বলেছে খুব জরুরি।
তুমি কি আবার রুমু ঝুমুকে মারছিলে?
না মেরে করব কী?
ফরিদা নিচে নেমে গেলন। কাউকে ফার্মেসিতে পাঠিয়ে তুলা স্যাভলন আনাতে হবে। মার খেয়ে ঝুমুর ঠোঁট কেটে গেছে। রক্ত পড়ছে।
টেলিফোন বাবার ঘরে। তিনি ঘরে নেই কাজেই ঘরে ঢুকে টেলিফোন করা যায়। বাবা থাকলে টেলিফোনের দশ গজের ভেতর যাওয়া যায় না। লিলি টেলিফোন করবে কি করবে না বুঝতে পারছে না। স্বাতীর সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছা করছে না। কথা না বলেও উপায় নেই। স্বাতী কিছুক্ষণ পর-পর টেলিফোন করে যাবে। তারচেয়ে কথা বলে ঝামেলা চুকিয়ে দেয়াই ভালো।
স্বাতী মনে হয় টেলিফোন সেট কোলে নিয়েই বসে ছিল রিং হওয়া মাত্র স্বাতী বলল, কেমন আছিসরে লিলি? সে ধরেই নিয়েছে লিলির টেলিফোন। লিলি শুকনো গলায় বলল, ভালো।
গিয়েছিলি?
কোথায় যাব?
কাজী অফিসে।
কাজী অফিসে আমার তো যাবার কথা না।
তারপরেও তো গিয়েছিলি। তাই না?
হ্যাঁ।
আমার ব্যাপারটা গুছিয়ে বলেছিস তো?”
গুছিয়ে বলার কি আছে? তুই আসবি না–সেটা বললাম।
কীভাবে বললি?
সাধারণভাবে বলেছি। আমি তো আর তোর মতো নাটক করতে পারি না।
সাধারণভাবে মানে কী? এ্যাকজাক্ট ডায়ালগ কী?
আমার মনে নেই।
আমি যাব না এটা শোনার পর সে কী করল?
কিছু করে নি।
আচ্ছা, তুই ভালোমতো ব্যাপারটা বল না–এ-রকম করছিস কেন?
ভালোমতো বলার কিছু নেই। আমি যা বলার বললাম, বেবিট্যাক্সি নিয়ে চলে এলাম।
তার রিএ্যাকশান কী ছিল?
কোনো রিএ্যাকশান ছিল না।
তুই ঠিকমতো বলতে পারছিস না। ওর গায়ে কী ছিল?
এত খেয়াল করি নি।
শার্ট ছিল, না–পায়জামা-পাঞ্জাবি ছিল?
পায়জামা-পাঞ্জাবি।
ক্রিম কালারের পাঞ্জাবি।
ক্রিম কালারের পাঞ্জাবি? গলার কাছে হাতের কাজ?
