সাদা পােশাকের ভদ্রলোক গম্ভীর গলায় বললেন, আমরা ঠিক বলছি না ভুল বলছি তার বিবেচনায় আপনাকে যেতে হবে না। আমরা যে খবর পেয়েছি সেই হিসাবে কাজ করছি। আপনাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গুরুতর। একজনের বিবাহিতা স্ত্রীকে ভাগিয়ে নিয়ে চলে এসেছেন।
খবরটা সত্য না স্যার। বিয়ে হয় নি।
আপনাদের খবরের উপর আমরা নির্ভর করি না। আমরা খবর পেয়েছি অনেক উপরের লেভেল থেকে।
ও, আচ্ছা।
মিসেস মনিরুজ্জামান কি আপনাদের সঙ্গে আছেন?
জি স্যার।
মিসেস মনিরুজ্জামান যে আপনাদের সঙ্গে আছেন তা তো আপনারা একবাক্যেই স্বীকার করলেন। তার পরেও বলছেন ভুল বলছি?
স্যার, আপনারা এখানে দাঁড়ান, আমি জরীকে নিয়ে আসছি।
শুধু তাকে আনলে হবে না। আপনাদের সবাইকে আমাদের সঙ্গে যেতে হবে। আপনারা যে কত বড় যন্ত্রণায় পড়েছেন সে সম্পর্কে আপনাদের কোনো ধারণা নেই। আপনার সিগারেট নেভা। আপনি নেভা সিগারেট টানছেন।
রানা বলল, স্যার, সিগারেট খাবেন?
না, সিগারেট খাব না।
আকাশ ফর্সা হতে শুরু করেছে। ট্রেনের লোক সবাই প্ৰায় নেমে এসেছে। রানা কাপা পায়ে কামরায় উঠল। আনুশকার সঙ্গে কথা বলা দরকার। তারও আগে বাথরুমে যাওয়া দরকার। কথা নেই বার্তা নেই হঠাৎ বাথরুম পেয়ে গেছে। একেই বলে শিকারের সময় কুত্তার ল্যাট্রিন।
আনুশকা, একটু নিচে নেমে আসো। খুব জরুরি কথা আছে। এক্সট্রিম ইমার্জেন্সি।
নইমাকে এখনো পাওয়া যায় নি?
নইমা-টাইমা বাদ। অন্য ব্যাপার। সর্বনাশ হয়ে গেছে।
অল্পতে অস্থির হয়ো না তো রানা। তোমার কি ব্লাডপ্রেশারের কোনো সমস্যা আছে? হাত কাঁপছে কেন?
কঠিন কিছু কথা রানার মুখে এসেছিল। নিজেকে সামলে নিয়ে সে সহজ ভঙ্গিতেই ব্যাপারটা আনুশকাকে বলল। নিচু গলায় বলল, অন্যদের শোনার এখন কিছু নেই। আনুশকার কোনো ভাবান্তর হলো না। সে সহজ ভঙ্গিতেই এগিয়ে গেল। সাদা পোশাকের পুলিশ বলল, আপনি কি মিসেস মনিরুজ্জামান?
আমার নাম আনুশকা। মিসেস মনিরুজ্জামানকে আমি চিনি না।
আপনাদের আমার সঙ্গে থানায় যেতে হবে।
কোনো ওয়ারেন্ট আছে?
পুলিশ যদি থানায় যেতে বলে তাহলে যেতে হয়। পুলিশের কাজে বাধা দিলে অ্যারেক্ট করা কোনো ব্যাপার না।
আনুশকা সহজ গলায় বলল, আপনাদের পেছনে কি কোনো বড় কর্তাব্যক্তি আছে?
হ্যাঁ, আছে?
আপনার হাতে কি ওয়াকিটকি?
হ্যাঁ।
আমার পরিচয় কি আপনি জানেন?
অকারণ কথা বলে আপনি আমাদের সময় নষ্ট করছেন।
আমার পরিচয় জানতে পারলে আপনার হাত থেকে ওয়াকিটকি মাটিতে পড়ে যাবে। কাজেই আমি অকারণ কথা বলছি না। বাঘের উপর যে থাকে তার নাম টাগ। তিমির উপর তিমিঙ্গল। আপনি কিছু জানেন না বলেই এমন কড়া গলায় আমার সঙ্গে কথা বলার দুঃসাহস দেখাচ্ছেন।
পুলিশ অফিসার হকচাকিয়ে গেল। সমস্যা এদিক দিয়ে আসবে ভাবা যায় নি। এ দেখি আরেক যন্ত্রণায় পড়া গেল! আনুশকা বলল, আপনি কি অতি দ্রুত ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন?
অবশ্যই পারব।
তাহলে দয়া করে আমার হয়ে একটা ইনফরমেশন ঢাকায় পাঠাবায় ব্যবস্থা করুন। পুলিশের আইজিকে খবর পাঠাতে হবে। আনুশকা নামের একটা মেয়েকে পুলিশ বিরক্ত করছে। নুরুদিন সাহেব আমার ছোট মামা?
ও, আচ্ছা?
আপনার কি বিশ্বাস হচ্ছে না?
বিশ্বাস না হবার কী আছে? মানে আপা, সমস্যাটা হলো…
কোনো সমস্যা হয় নি। বরং আমাদের একটা সমস্যা হয়েছে। আমাদের এক বান্ধবী-নইমা তার নাম। নইমাকে পাচ্ছি না। প্ল্যাটফরমেই আছে। ওকে দয়া করে একটু খুঁজে বের করে দিন।
পুলিশের দলটা খানিকক্ষণ কোনো কথা বলল না। আনুশকা বলল, রানা, এসো তো, জিনিসপত্র নামাতে হবে। চা খাবার ব্যবস্থা করতে হবে। সকালবেলা চা না খেলে আমার মাথা ধরে যায়। রানা ফিসফিস করে বলল, আইজি নুরুদ্দিন সাহেব তোমার মামা?
আনুশকা দূর। পুলিশে আমার কোনো আত্মীয়স্বজন নেই। কিছুক্ষণের জন্য ওদের পিলে চমকে দিয়েছি। এরা খোঁজখবর করবে। এই ফাঁকে আমরা কেটে পড়ব।
আমার কিন্তু মোটেই ভালো লাগছে না।
আমার লাগছে। অ্যাডভেঞ্চার-অ্যাডভেঞ্চার ভাব হচ্ছে।
আনুশকা খিলখিল করে হেসে ফেলল।
হাসছ কেন? হোয়াই লাফিং?
তুমি বড় বিরক্ত করছ রানা। পুলিশের চেয়েও বেশি বিরক্ত করছ। শান্ত হও—শান্ত।
শান্ত হব?
আনুশকা আবারো শব্দ করে হাসল। রানা চাপ নিঃশ্বাস ফেলল। পৃথিবীতে মেয়ে জাতটার সৃষ্টি কেন হলো, সে ভেবে পাচ্ছে না।
ইয়াজউদ্দিন সাহেবের ঘুম ভাঙল
ইয়াজউদ্দিন সাহেবের ঘুম ভাঙল টেলিফোনের শব্দে। টেলিফোন ধরার আগে তিনি ঘড়ি দেখলেন। ভোর ৬টা ৪০ মিনিট। এত ভোরে টেলিফোন! কোনো কি সমস্যা হয়েছে? তিনি টেলিফোন ধরলেন।
স্যার, আমি সুলেমান।
ভালো আছ সুলেমান?
জি স্যার।
বলো কী বলবে।
ছোট সাহেবের বিষয়ে কথা বলব।
বলো, আমি শুনছি।
ওনারা স্যার চিটাগাং পৌঁছেছেন।
ভালো কথা। ঢাকা থেকে যখন রওনা হয়েছে তখন চিটাগাং তো পৌঁছবেই। এ ছাড়া কোনো খবর আছে?
একটু সমস্যা হচ্ছে স্যার।
তুমি ভেঙে ভেঙে না বলে একনাগাড়ে বলে যাও। কী ব্যাপার?
পুলিশ ঝামেলা করছে। সকালবেলা একদল পুলিশ এসে উপস্থিত—উনারা নাকি কার স্ত্রীকে ভাগিয়ে নিয়ে এসেছেন। ভদ্রমহিলার স্বামী মামলা করেছেন। উনার কানেকশন ভালো। উপরের লেভেল থেকে চাপ আসছে।
আর কিছু?
জি না স্যার, আর কিছু না।
ওদের কি থানায় নিয়ে গেছে?
থানায় নিয়ে যায় নি, তবে নিয়ে যাবে বলে মনে হয়।
