বেশ উত্তেজিত হয়ে কথা বলে যাচ্ছিল ছোকরা চাষীটি। সাদইদ আর চিন্তা করতে পারছিল না। তবু সে তার হৃদয়কে সংযত করে মুখে হাসি টেনে এনে বলল–তোমরা এত ভোরে এখানে কেন এসেছিলে!
একটু তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বয়স্ক চাষী বলল–ওই একটু যুদ্ধ দেখা, কসরত দেখা!
ছোকরা হঠাৎ ধমক দিয়ে বয়স্ককে থামিয়ে দেয়–কী দেখি, না দেখি, অত বিবরণের কী আছে। তামাশা আর নাইবা করলে, চলো, উনি রাগ করবেন–হাজার হোক, তেনারই সব শিক্ষা! গত রেতে লোটার ঘোড়া চলে গিয়েছে, তাঁবুতে সবার মুখ পানসে হয়ে রয়েছে–দিনার আজ খেলতেই নামল না! বাসীমুখে মদ খাচ্ছে বেদম–কী যে হয়েছে! চলল, চলো!
ওরা হনহন করে চলে গেল। সাদইদ চাইল তারবেড়ার ওপারে। দেখল, দিনার এক তাঁবু থেকে অন্য তাঁবুর দিকে এগিয়ে চলেছে টলতে টলতে। পা নড়াতে পারছে না। তার দিকে চাইছে পাগলের মত। ভয়ানক সেই চাহনি। হঠাৎ মনে হল, এই দিনারই কালো ঘোড়ার ঘাতক! মূর্তিও কি এই দিনারই ভেঙে দিয়েছে?
এই দিনার, যার জন্ম হয়েছিল উঠের পিঠে–ভাবা যায় না, ছেলেটা কী ভয়ংকর জোয়ান হয়েছে! চেয়ে দেখতে দেখতে হঠাৎ সদইদের মনে করুণার উদ্রেক হয়। এই সেই দিনার যে কিনা উঠের পিঠে মসীহর লাঠির মত এতটুকু পুঁচকে, মাথাটা যেন পুঁটুলি–দাঁড়িয়ে থাকত দিনমান। কাঁদত, চেল্লাত। কেউ ওকে নামিয়ে নিত না। কাঁদতে কাঁদতে এক সময় মিইয়ে গিয়ে থামত। সবাই। ওর মুখের দিকে দূর থেকে চেয়ে থেকে মজা পেত। ও নাকি গুনতে শিখেছে। উট গোনে। মেষ গোনে, ছাগ-ছাগী গোনে। মানুষ গোনে। তার নিজস্ব ভাষায়, যা সবার কাছে দুর্বোধ্য। শিশুদের ভাষা আসলে দুর্বোধ্যই হয়। সেই দুর্বোধ্য ভাষায় দিনার গুনতে পারত এক দুই।
দিনার গুনত মৃত্যু। একটি লাশ এল। দুটি লাশ এল। এভাবে উটের পিঠে মসীহর লাঠির মত দাঁড়িয়ে থাকা শিশুটি মৃত্যুর সংখ্যা নাকি গুনত। মানুষের এইরকম ধারণার . কোন হেতু পাওয়া যায় না। যুদ্ধের মানুষ শিশু সম্বন্ধে যে এধারা অদ্ভুত একটা গল্প চাল করে দেয় অথবা সেটা তারা সত্য মনে। করে–কেন করে তার কোন অর্থ বোঝা যায় না। তবে তাই যদি সত্যিকার ঘটনা হয়, তবে এই দিনারের মধ্যে কী একটা ভয়ংকর বস্তু নিশ্চয় গোপন আছে। যার ফলে সাদইদ তাকে ঘাতক মনে করছে–এইরকম মনে করাও হেতুহীন। অন্যায়। সে হয়ত জানেই না, লোটার ঘোড়া কখন কীভাবে মরুভূমিতে চলে গেছে।
তবে বিস্ময় অন্যত্র রয়েছে। চাষীরা তাঁবুপাড়ায় কালবেলা অনেকে কসরত দেখতে আসে। জালের আড়ালে আটকে থাকা ভাড়াটে সেনারা কী করছে এই তাদের কৌতূহল। ভয় করে। আবার ঘৃণা ও করুণাও করে মনে মনে। এভাবে মরুভূমি শেষ হয় না। মরুর জীবন ফুরায় না। মাটিতে মেশে না জীবন। মাটি আলাদা থাকতে চায়। একটা কুটির আর একটা তাঁবু আলাদাই থেকে যায়। মাটি ভয় করে। করুণা করে। বিদ্বিষ্ট হয়। অথচ দূর থেকে দেখে। একটি বৃক্ষ ছায়ানিবিড় চোখে যেন মরুপ্রান্তরের ঊষর বিকটদর্শন উটের মুখের ফেনার দিকে অপলক চেয়ে রয়েছে। ঠিক যেভাবে রিবিকার চোখ চেয়ে থাকে।
হঠাৎ সাদইদের মনে হল, রিবিকা কখনও তাকে ভালবাসেনি। লোটাকে সে বিয়ে করেছিল, সেটাই হয়ত রিবিকার শেষ স্বপ্ন। তাহলে কি স্বর্গ কখনও তৈরি হবে না! লোটা চিরকাল অদৃশ্য ঈশ্বরের মত মরুভূমিতে বিরাজ করবে? কখনও সে স্বর্গ এই মাটির উপর তৈরি হতে দেবে না?
সাদইদের ঘোড়া ছটফট করে উঠল। সে ছুটতে থাকল দিগ্বিদিক। কী আশ্চর্য! আবার ঘোড়াটি ভুল করে ভাঙা মূর্তিটার কাছে, বিধ্বস্ত লোটার কাছে চলে আসে। ঘোড়ার এমনধারা অবশ পাগলামি থাকে। পথ ভুলে যায় । যেখানে যেতে চায় সেখানে যায় না। সাদইদের রাগ হল, কেন ঘোড়া ভাঙা মূর্তির কাছে টেনে আনল তাকে? মাথা খারাপ হয়ে গেল! ঘোড়ার না তার–সাদইদ বুঝতে পারল না! হঠাৎ-ই সাদইদ অযথা সাদা অশ্বকে প্রহার করতে লাগল। প্রহার করতে করতে দেখল, ঘোড়া মাটির উপর শুয়ে গেছে। সাদইদ ক্রোধে আর প্রবল শূন্যতায় দিশে হারিয়ে ডুকরে উঠল। হঠাৎ মনে হল, এই অবস্থায় কেউ যদি দেখে, কী ভাববে! ঘোড়াকে কখনও সে মারে না।
হঠাৎ-ই চাবুক-ধরা হাতটা, যে চাবুক সে কোমরে বাঁটসুদ্ধ জড়িয়ে রাখে, ব্যবহার করে না, সেইসব, হাত এবং বাঁট সজোরে চেপে ধরল কেউ। অবাক হয়ে সাদইদ দেখল, হেরা একটি গাধার পিঠে চড়ে এসেছে এই ভোরে।
সাদইদ ভেঙে পড়ে বলল–দেখো হেরা! লোটার কী হয়েছে! তুমি ভাল করে দেখো, তোমার কষ্টের মূর্তিটা কেমন করে ভেঙে দিয়ে গেছে।
হেরা বলল–আরে, ওটা তো আমার বুকের মধ্যে আছে! যতবার ভাঙবে ততবার আমি ওটাকে বুকের ভিতর থেকে বাইরে টেনে আনব! তুমি ভেবো না। কিন্তু এই ঘোড়াটা মরে গেলে আমাদের খুবই ক্ষতি হবে! ওকে ছেড়ে দাও। সবচেয়ে দ্রুতগতির এই জীবটি তোমাকে আগলে রেখেছে সাদইদ! দাও, ছেড়ে দাও। পাগলামি করো না, দেখো, ও কীভাবে অসহায়ের মত শুয়ে গিয়েছে!
সাদইদ স্তব্ধ হয়ে গেল। তারপর কিছুক্ষণ কথাই বলতে পারল না। এবং মনে হল, কালো ঘোড়াটির কথা কীভাবে সে হেরার সামনে পেশ করবে!
গাধাটির দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল সাদইদ। হেরা তার দৃষ্টি অনুসরণ করে বলল–কালো ঘোড়াটা শেষে পাগল হয়ে মরুভূমিতে পালিয়ে গিয়েছে। ঘোড়া এভাবে হারিয়ে যেতে পারে। ফের একদিন ফিরে আসবে দেখে নিও!
