আসল কথা হলো, আমি মেজোভাইকে চিঠি লিখেছিলাম। উনার জায়গাজমি আমি আর তোর বাবা দেখাশোনা করব, সেখানে গিয়ে থাকব। ভাইজান চিঠি পেয়ে খুবই খুশি হয়েছেন। আমাদের যেতে বলেছেন।
এই বিষয় কি বাবা জানে? বাবাকে কিছু বলেছ?
না। তোর বিয়ে ঠিক হয়ে গেলেই তোর বাবাকে বলব। সে খুশি হয়েই রাজি হবে।
কানের কাছে আর ঘ্যানঘ্যান করবে না, আমার ঘুম পাচ্ছে।
মনোয়ারা ক্ষীণ স্বরে বললেন, তোর যাকে খুশি তাকে বিয়ে কর। বিয়ে করে সুখী হ। আমাদের কথা ভাববি না। আমরা আমাদের ব্যবস্থা করব।
আচ্ছা ঠিক আছে।
মা, আরেকটা কথা বলি?
আনিকা বিরক্ত গলায় বলল, সব কথা কি তোমার আজই বলতে হবে?
থাক আরেকদিন বলব। না বললেও চলে, এমন কোনো জরুরি কথা না। জরুরি কথাটা আগে বলে ফেলেছি।
আনিকা বলল, কী বলতে চাচ্ছ বলো। যে ভণিতা দিয়ে কথা শুরু করেছ, এখন বাকিটা না শুনলে রাতে ঘুম হবে না।
মনোয়ারা বললেন, কথাটা মনজু সম্পর্কে।
ভাইয়াকে নিয়ে কথা? তার নাম উচ্চারণ করাই তো নিষিদ্ধ। বলো কী কথা তার বিষয়ে।
তার মৃত্যুর জন্যে তুই মনে মনে আমাকেও দায়ী করিস। তোর ধারণা আমার এবং তোর বাবার— এই দুইজনের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে সে ঘুমের ওষুধ খেয়েছে।
মা, কথাটা কি ভুল?
আমার বিষয়ে কথাটা ভুল। আমার অপরাধ একটাই— তোর বাবা যখন তার উপর রাগ করত, গালাগালি করত, আমি চুপ করে থাকতাম। কিছু বলতাম না। মা শোন, চুপ করে থাকা আমার স্বভাব। তার বাবা যখন রেগে গিয়ে হৈচৈ করে, তখন আমি চুপ করে থাকি। তোর উপর যখন রেগে যায়, তখনো কিন্তু চুপ করেই থাকি। যখন বুঝি তুই মনে কষ্ট পেয়েছিস, তখন মাথায় তেল মাখিয়ে দেই। তোর মাথায় যেমন আমি বিলি কেটে দেই, মনজুর মাথায়ও দিতাম।
আনিকা বিছানা থেকে উঠে বসল। মার দিকে তাকাল।
মনোয়ারা বললেন, মনজু ঘুমের ওষুধ খাবার আগে দুটা চিঠি লিখেছিল। একটা তোর বাবাকে, একটা আমাকে। আমার চিঠিটা তুই একদিন পড়ে দেখিস। চিঠিটা কাউকে পড়াতে আমার লজ্জা লাগে বলেই লুকিয়ে রাখি।
চিঠি তুমি সঙ্গে করেই নিয়ে এসেছ, তাই না মা?
হ্যাঁ।
চিঠিটা রাখ। রেখে চলে যাও।
আমার সামনেই পড়।
না।
মনোয়ারা তেলের বাটি নিয়ে উঠে গেলেন।
দামি রেডিও বন্ড কাগজে গুটি গুটি করে লেখা চিঠি। মুক্তার মতো হাতের লেখা। যেন সাদা কাগজে অক্ষর সাজিয়ে ছবি আঁকা হয়েছে।
মাগো,
আমি খুব বড় একটা ভুল করতে যাচ্ছি। মা, তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিও। একটা কষ্ট নিয়ে আমি পৃথিবী থেকে যাচ্ছি। কষ্টটা হচ্ছে, তোমার স্নেহের ঋণ আমি শোধ করতে পারলাম না।
প্রায়ই খুব কষ্ট পেয়ে আমি রাতে শুয়ে শুয়ে কাঁদতাম। আমার ঘুম আসত না। তুমি গভীর রাতে তেলের বাটি নিয়ে আসতে। একটা কথাও বলতে না। আমার মাথা তোমার কোলে তুলে নিয়ে চুলে বিলি কাটতে। কেন কিছু কিছু মানুষ তোমার মতো ভালো হয়? মা শোন, আমরা সবচে কষ্ট পাই কিন্তু ভালো মানুষদের জন্যে। তুমি এত ভালো কেন হলে?
তোমার ছেলে
মনজু
আজ ইমনের জন্মদিন
আজ ইমনের জন্মদিন। জন্মদিনের ছোট্ট মানুষটা খালি গায়ে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে। ঘুমাবার সময় তার গায়ে লাল রঙের একটা টি-সার্ট ছিল। কখন খুলেছে কে জানে! নিশ্চয়ই গরম লাগছিল। গরম লাগার কথা। সিলিং ফ্যানে কোনো একটা সমস্যা আছে। প্রচণ্ড শব্দে ঘোরে, সেই তুলনায় বাতাস হয় না। শওকত ছেলের দিকে তাকিয়ে আছে। খুব মায়া লাগছে। বেচারা যে আগ্রহ নিয়ে বাবার কাছে এসেছিল, সেই আগ্রহের ফল কি সে পেয়েছে? মনে হয় না। ছেলেকে আনন্দে অভিভূত করার মতো কিছু করতে পারে নি। গল্প করেছে। এই পর্যন্তই। গল্প করে কাউকে মুগ্ধ করার ক্ষমতা তার নেই।
ছেলেটাকে নিয়ে ঢাকার বাইরে কোথাও যেতে পারলে হতো। যাওয়া হয় নি। কেন জানি ইচ্ছা করে নি। মানুষের বয়স যত বাড়তে থাকে, তার ইচ্ছাগুলিও ছোট হতে থাকে। তার এখন দিন-রাত ঘরে বসে থাকতেই ভালো লাগে। সমস্ত ইচ্ছা ছোট্ট একটা ঘরে বন্দি হয়ে গেছে।
শওকত বিছানা থেকে নামল। সে এখন মগভর্তি করে এক মগ চা বানাবে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে দিনের প্রথম সিগারেটটা ধরাবে। প্রথম সিগারেট শেষ হবার পর দ্বিতীয় সিগারেট। মানুষ খুব সহজে রুটিনে আটকা পড়ে যায়। সে রুটিনে আটকা পড়ে গেছে। সকালে মগভর্তি চা তার রুটিনের অংশ।
আকাশে মেঘ করেছে। ঝুম বৃষ্টি হবে— এরকম মেঘ না। এই কদিনে একবারও ঝুম বৃষ্টি হয় নি যে ছেলেকে নিয়ে সে বৃষ্টিতে ভিজবে। আনন্দময় কোনো স্মৃতি কি এই ছেলে নিয়ে যেতে পারবে?
আজ ইমনের জন্মদিন। আজ সে থাকবে। আগামীকালও থাকবে। পরশু তাকে তার মায়ের কাছে দিয়ে আসতে হবে। যেখান থেকে সে এসেছিল, সেখানে ফিরে যাবে। মিস্টার অ্যান্ডারসন নামের একজন মানুষের হাত ধরে সে লেকে মাছ ধরতে যাবে। বাড়ির পেছনের পোর্চে মিস্টার অ্যান্ডারসন বারবিকিউ করবেন। ইমন তাকে সাহায্য করবে। এখন যেমন সে তার বাবাকে সাহায্য করে সেরকম। চা বানানোর একটা বিদ্যা সে তার বাবার কাছ থেকে শিখেছে। এই বিদ্যা নিশ্চয় সে মিস্টার অ্যান্ডারসনকে দেখাবে।
শওকত চায়ের মগ নিয়ে মেঝেতে বসল। এই বাসা তাকে ছেড়ে দিতে হবে। এখানে অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স হবে। মাপামাপি খোড়াখুঁড়ি শুরু হবে এই মাসের শেষ থেকে। শওকতকে নতুন কোনো আস্তানা খুঁজে বের করতে হবে। গ্রামের বাড়ি-ঘর ঠিক করে কিছুদিন গ্রামে গিয়ে থাকলে হয়। ইমনকে গ্রামের বাড়ি দেখিয়ে নিয়ে এলে হতো। ঝোপ, বাঁশবন, ডোবা। বাড়ির পেছনে বিলের মতো আছে। সকালের দিকে সেই বিলে অনেক বক দেখা যায়। এইসব দৃশ্য দেখলে সে মজা পেত। তাকে কোনো কিছুই দেখানো হয় নি। মিস্টার অ্যান্ডারসনের একটা ছবি আঁকা হয় নি। আঁকা হবে এরকম মনে হচ্ছে না। ছবি বানানোর বিদ্যা তাকে ছেড়ে গেছে। মাথার কোনো এক রহস্যময় জায়গায় জট লেগে গেছে। হয়তো কোনো একদিন সেই জট খুলবে। সে আবারো ছবি আঁকতে শুরু করবে। তখন মিস্টার অ্যান্ডারসনের ছবিটা এঁকে পাঠিয়ে দিতে হবে। সঙ্গে একটা চিঠি। চিঠিটা সে বাংলায় লিখবে, তারপর ভালো ইংরেজি জানে এমন কাউকে দিয়ে অনুবাদ করিয়ে নেবে।
