ফেরার পথে তিনি খামারের চার কেজি দুধ, লাউ, লাউ শাক, পুকুরের সরপুটি, এক ঝুড়ি কাঁচা বাদাম নিয়ে ফিরলেন। ছেলে এই প্রথমবার চিনাবাদামের চাষ করেছে। ভালো ফলন হয়েছে।
মতিয়ুর রহমান ছেলের দুটা ছবিও নিয়ে এসেছেন। আনিকাকে দেখাবেন।
পাত্রের ছবি হিসেবে দুটা ছবির কোনোটাই চলে না। একটা ছবিতে ছেলে অস্ট্রেলিয়ান গরুর পিঠে হাত দিয়ে হাসি-হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছে। আরেকটায় সে মালকোচা মেরে পুকুরে দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে চার কেজি ওজনের এক রুই মাছ।
রাতের খাবারের পর মতিয়ুর রহমান আনিকা এবং তার মাকে ডেকে পাঠালেন।
তাঁর দীর্ঘ বক্তৃতা দিয়ে মূল প্রসঙ্গে যাবার শখ ছিল। আনিকা তা হতে দিল। গম্ভীরমুখে বলল, যা বলার তাড়াতাড়ি বলল। আমি শুয়ে পড়ব, আমার মাথা ধরেছে।
মতিয়ুর রহমান বললেন, তোর বিখ্যাত মাথা কি সবসময় ধরা অবস্থায় থাকে?
আনিকা বলল, সবসময় থাকে না। এখন মাথা ধরেছে। কী বলবে বলো।
কিছুক্ষণের জন্যে হলেও শান্ত হয়ে বস, তারপর বলি।
আনিকা বসল। মতিয়ুর রহমান সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললেন, তুই কী ঠিক করেছিস? বিয়ে করবি নাকি করবি না?
বিয়ে করব না এমন কথা তো কখনো বলি নি।
ছেলে কি তোর বোনের মতো তুই ঠিক করবি? নাকি আমাদের হাতে ছেড়ে দিবি?
আমার পছন্দের একজন আছে, তাকে বিয়ে করব।
সেই একজনটা কে?
এখন কিছু বলতে চাচ্ছি না বাবা, যখন সব ঠিকঠাক হবে তখন বলব।
সব ঠিকঠাক হবে মানে কী? কোন জিনিসটা বেঠিক?
সবই বেঠিক। ঠিক করার চেষ্টা করছি।
মতিয়ুর রহমান বললেন, যে ছেলেকে বিয়ের কথা ভাবছিস, তাকে কি আমরা চিনি?
হ্যাঁ চেন।
শওকত না তো?
আনিকা কিছু বলল না। মতিয়ুর রহমান বললেন, এই বিষয় আমি আগেই সন্দেহ করেছি। আমি তো ফিডার দিয়ে দুধ খাই না। জগতের হিসাব জানি। আধবুড়া এক ছেলে, তাকে বিয়ে করবি কোন দুঃখে? টাকা নাই পয়সা নাই, আয়-রোজগার নাই। ভ্যাগাবন্ড।
আনিকা বলল, আমি কিছু কথা বলব। আমার কথাগুলি মন দিয়ে শোন। তুমি তো টিভির সিনেমার কথাবার্তা ছাড়া অন্য কোনো কথা মন দিয়ে শোন না।
মতিয়ুর রহমান বললেন, তুই কী বাণী দিবি যে মন দিয়ে মহামানবীর বাণী শুনতে হবে?
আনিকা বলল, হ্যাঁ আমি বাণীই দেব। যে বুড়োর কথা তুমি বলছ, আমি যদি সেই বুড়োকে বিয়ে করি, তাহলে তোমাদের না খেয়ে থাকতে হবে না। অন্য কাউকে বিয়ে করলে আমাকে তার সংসারে উঠতে হবে। আমার চাকরির একটা পয়সা তোমরা পাবে না। ওরা দিতে দিবে না। কোনো জামাই শ্বশুরশাশুড়িকে তার বাড়িতে পুষবে না। আমার ভবিষ্যৎ চিন্তা করার আগে তোমরা তোমাদের ভবিষ্যৎ চিন্তা কর।
মতিয়ুর রহমান হতভম্ব হয়ে বললেন, মেয়ে হয়ে তুই আমাকে ভাতের খোটা দিলি?
সারাজীবন তুমি আমাকে নানান বিষয়ে নানান খোঁটা দিয়েছ। আমি একটা দিলাম।
আজ থেকে যদি আমি তোর ভাতের দানা একটা মুখে দেই, তাহলে আমি মানুষের বাচ্চা না। আমি নেড়িকুত্তার বাচ্চা।
আনিকা উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, আমি ঘুমুতে যাচ্ছি। ব্যথায় আমার মাথা ছিঁড়ে পড়ে যাচ্ছে।
মেয়ের সঙ্গে সঙ্গে মনোয়ারাও উঠে গেলেন।
মতিয়ুর রহমান পান মুখে দিলেন। সিগারেট ধরালেন। তিনি খুবই দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। মেয়ের চাকরির টাকায় ভাত খেতে হবে— এই দুশ্চিন্তা না। তিনি খামারের ছেলেটাকে আগামীকাল সন্ধ্যায় বাসায় চা খেতে ডেকেছেন। উদ্দেশ্য চা খেতে খেতে আনিকার সঙ্গে দুএকটা কথা বলবে।
এই সমস্যার সমাধান কী? সন্ধ্যায় চায়ের ব্যাপারটা বাদ দেয়া যায় কীভাবে? বিয়ে না হলে না হবে। ভদ্রভাবে আনিকা ছেলেটার সঙ্গে টুকটাক কিছু কথা তো বলবে?
মতিয়ুর রহমান টিভি ছাড়লেন। HBO-তে প্রায়ই ভূতের ছবি দেখায়। মতিয়ুর রহমান ইংরেজি মোটেই বুঝেন না। ভূতের ছবির সুবিধা হলো, ইংরেজি না বুঝলেও ছবি বুঝতে কষ্ট হয় না। রাতদুপুরে ভূত-প্রেতের ছবি দেখতে তার ভালোই লাগে। জীবনের শেষপ্রান্তে যে চলে এসেছে, তার কাছে ভালো লাগাটা জরুরি।
আনিকা বাতি নিভিয়ে শুয়ে আছে। মনোয়ারা মেয়ের মাথায় তেল দিয়ে দিচ্ছেন। মাথায় সিঁথি করে আঙুলের ডগায় তেল নিয়ে সেই তেল ঘসা। মনোয়ারা এই কাজটা খুব ভালো পারেন। নারিকেল তেল তিনি আগে গরম করে নেন। পাশে ঠাণ্ডা পানির একটা বাটি থাকে। গরম তেল মাথায় ঘষার পরপর তিনি তাঁর আঙুল ঠাণ্ডা পানিতে ড়ুবিয়ে ম্যাসেজ শুরু করেন। এই অংশটা খুব আরামদায়ক।
মনোয়ারা দ্রুত আঙুল চালাতে চালাতে বললেন, ভাতের খোটা দেয়া ভালো না রে মা।
আনিকা জড়ানো গলায় বলল, আমার মেজাজ ঠিক ছিল না।
মনোয়ারা বললেন, তোর বাবা মুখে কিছু না বললেও মেয়ের উপর ভর করে বেঁচে আছে— এটা ভেবে সবসময় ছোট হয়ে থাকেন। কেউ কিছু না বুঝলেও আমি বুঝি। ছেলেমেয়ের কাছে ছোট হয়ে থাকা বড় কষ্টের।
আনিকা কিছু বলল না। তার ঘুম পাচ্ছে। কথা বললেই ঘুম কেটে যাবে। আরামের ঘুম কাটাতে ইচ্ছা করছে না।
মনোয়ারা বললেন, আনিকা ঘুমিয়ে পড়েছিস?
আনিকা বলল, না।
তাহলে একটা কথা বলি, মন দিয়ে শোন। আমার মেজোভাই তোর মিজু মামা, একসময় সস্তা জমি পাওয়া যাচ্ছে দেখে বান্দরবানে অনেক জমি কিনেছিল। ঘর-দুয়ার বানিয়েছিল। পাহাড়িদের সঙ্গে সমস্যা শুরু হলে সে চিটাগাং চলে আসে। তার জমিজমা এখনো সেখানে আছে। বিক্রির চেষ্টা করছিল, বিক্রি করতে পারে নি।
আনিকা বলল, আসল কথা কী বলতে চাচ্ছ, সেটা বলো। এতক্ষণ ধরে তবলার টুকটাক শুনতে পারব না।
