কাছাকাছি বঙ্গানুবাদ—
আরব থেকে তোমার জন্যে সুগন্ধি আনা হয়েছে। তোমার ঘ্রাণ ত্রুটিহীন করে ঈশ্বরের ঘ্রাণের সঙ্গে যুক্ত করার উদ্দেশ্যে,..
তথা : Mysteries and Secrets of Magic, C.G.S, Thomson. প্রথম প্রকাশ ১৯২৭, বর্তমান মুদ্রণ ১৯৯৫, প্রকাশক Random House, UK.
আমার প্রশ্ন হচ্ছে, আরব থেকে যে সুগন্ধি আনা হয়েছে তা কি জয়তুন বৃক্ষের তেল থেকে তৈরি? ম্যাজিক মুনশির আতরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত?
রাতে ঘুমুতে গেছি, শাওন বলল, তোমার গা থেকে চা-পাতার কড়া গন্ধ আসছে। তুমি কি আবার আমার সেন্ট মেখেছ?
আমি বললাম, হুঁ।
শাওন বলল, তুমি দয়া করে মাথা থেকে ম্যাজিক মুনশি দূর করো। তুমি আধুনিক মানুষ, তোমার চিন্তাভাবনা হবে আধুনিক।
আমি বললাম, আমার চিন্তাভাবনা যথেষ্টই আধুনিক।
শাওন বলল, মোটেই না। তোমার মাথার কাছে টেলিভর্তি ব্ল্যাক ম্যাজিকের বই। প্রায়ই দেখছি তুমি বিড়বিড় করে কী যেন পড়ছ। কী পড়ছ?
আমি বললাম, মন্ত্র।
কিসের মন্ত্র?
বনসি নামানোর মন্ত্র।
বনলি কী?
এক ধরনের মহিলা ভূত। মন্ত্রটা শুনবে?
না।
আরে শোনো না,
It was the Banshees lonely wailing,
well I knew the voice of death,
In the night wind slowly sailing
over the bleak and gloomy heath.
শীওন বলল, তোমার এই মহিলা ভূতের চেহারা কেমন?
আমি বললাম, সে অতি রূপবতী। আমার উপন্যাসের নায়িকাদের চেয়েও তার রূপ বেশি।
মন্ত্র পাঠ করলে সে এখানে উদয় হবে?
হুঁ। শুধু যে উদয় হবে তা-না। পারিবারিকভাবেও সে আমাদের সঙ্গে যুক্ত হবে।
তার মানে?
আইরিশরা বিশ্বাস করে, তাদের প্রতিটি পরিবারের সঙ্গে একজন বনসি ভূত নারী যুক্ত। সে বিপদে আপদে দেখা দিয়ে সবাইকে সতর্ক করে।
শাওন বলল, তার মাঝে মাঝে উদয় হওয়ার দরকার কী? সে সারাক্ষণই উদয় হয়ে থাকুক। তুমি তাকে বিয়ে করে ফেল। তোমার একজন ভূতপত্নী থাকুক।
আমি বললাম, ওকে গ্রান্টেড।
শাওন বলল, আমার ঘরে দয়া করে বিড়বিড় করবে না। অন্য ঘরে যাও। ভূতনি দর্শন দিলে আমার কাছে নিয়ে এসো। আর দয়া করে মাথার কাছ থেকে ভূতপ্রেতের বই সরাও।
আমি বললাম, ম্যাজিক মুনশি ঢাকায় পৌছানোর আগ পর্যন্ত আমি বইগুলি পড়ব। সে এসে পৌছালেই পড়া শেষ।
পাঠকদের জ্ঞাতার্থে জানাচ্ছি, বনসি ভূত নামানোর যে মন্ত্র আমি লিখেছি তা মন্ত্র না। বনসিদের নিয়ে লেখা প্রাচীন আইরিশ Ballad. এই ব্যালাড় মন্ত্রের মতো পড়লে কোনো কাজ হওয়ার কথা না।
কৃষ্ণশক্তির সাধনা ভারতবর্ষের সাধনার একটি ধারা। এই সাধনা যারা করেন তাদের বেশির ভাগ কালী সাধক। তাদের আরেক নাম তান্ত্রিক। তন্ত্রের (মন্ত্রের সাহায্যে সাধনী। এই সাধনায় সাধকরা কারণ বারি (দেশি মদ পান করেন। ভাংজাতীয় নেশার দ্রব্য গ্রহণ করেন। সিদ্ধিলাভের জন্যে একটা পর্যায়ে তাদেরকে শব সাধনা করতে হয়। শব সাধনা হচ্ছে নগ্ন মৃতদেহের বুকের উপর বসে (অল্পবয়েসী তরুণীর মৃতদেহ হতে হবে। মন্ত্র পাঠ। একটি পর্যায়ে মৃতদেহের মুখ থেকে নানান উপদেশ আসতে থাকবে। উপদেশমতো কাজ করতে হবে।
তান্ত্রিকরা কঠিন সাধনা করে শরীরের ভেতরে সুপ্ত সাত শক্তিচক্রকে উজ্জীবিত করেন। তাদের প্রধান চেষ্টা থাকে কুণ্ডলিনি জাগ্রত করা। কুণ্ডলিনি সাপের মতো। শরীরের সর্বনিম্ন চক্রে তার অবস্থান। কুণ্ডুলিনি জাগ্রত করার অর্থ হলো পৃথিবীর সর্বশক্তির কর্তৃত্ব নেওয়া।
বলতে ভুলে গেছি, সাধনার এক পর্যায়ে মৃত তরুণীর সঙ্গে যৌনাচারে লিপ্ত হতে হয়। নরবলি (শিশু) এই ধরনের সাধনার অংশ।
মহান ঔপন্যাসিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের তারানাথ তান্ত্রিনে তে এই সাধনার বিশদ বর্ণনা আছে।
আমি S.S.C পাস করি বগুড়া জেলা স্কুল থেকে (১৯৬৫)। সেই সময় চক্রের সাহায্যে প্রেত নামানোর একটা বই বাবার লাইব্রেরিতে খুঁজে পাই। বইয়ে পরকালের মানুষ এবং জীবজন্তুর সাক্ষাৎ পাওয়ার বেশ কিছু পদ্ধতি লেখা।
একটি পদ্ধতিতে বিজোড়সংখ্যক নারী-পুরুষকে হাতে হাত রেখে চক্র বানিয়ে কোনো এক নির্জন স্থানে বসতে হয়। একমনে পরকাল এবং সেখানকার অধিবাসীদের বিষয়ে চিন্তা করতে হয়। মাঝে মাঝে জিকিরের মতো (chanting) বলতে হয়, আয়রে! আয়রে!
পঠিত বিদ্যা কাজে লাগানোর জন্যে আমরা কয়েক বন্ধু মিলে ঠিক করি চক্রে বসা হবে। করতোয়া নদীর পাশে শ্মশানঘাট। শ্মশানঘাটে শ্মশানবন্ধুদের জন্যে বানানো একটা পাকা ঘর আছে। আমরা এক সন্ধ্যায় শশানঘাটে উপস্থিত হয়ে চক্রে বসি। আমার বন্ধুদের মধ্যে দুজনের নাম মনে আছে। একজন খালেকুজ্জামান ইলিয়াস। বর্তমানে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রধান। খালেকুজ্জামান নন্দিত কথাশিল্পী আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ছোট ভাই।
আমার আরেক বন্ধুর নাম চিশতি হেলালুর রহমান। সে ছিল ছাত্রলীগের নিবেদিত কর্মী। ১৯৭১ সালে পাকবাহিনী তাকে ইকবাল হলে হত্যা করে।
মূল ঘটনায় ফিরে যাই। আমাদের চক্র ছিল অসম্পূর্ণ। চক্রে মেয়েদের উপস্থিতি অতি আবশ্যকীয়। সুগন্ধি লাগবে। আমাদের মধ্যে দুটাই ছিল অনুপস্থিত। আসলে আমরা একত্রিত হয়েছিলাম ভূত ভূত খেলা করে মজা পাওয়ার জন্যে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘটনা অন্যরকম হয়ে গেল। চিশতির মুখ থেকে জন্তুর শব্দ বের হতে লাগল। শ্মশানঘর তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধে ভরে গেল (এখন মনে হচ্ছে Ammonia-র গন্ধ)। চিশতির শরীর কাঁপছে এবং সে কিছুক্ষণ পরপর বলছে, আমার সামনে এটা কী? আমার সামনে এটা কী?
