ভিসিডির প্রিন্ট খারাপ। ছবি ঝিঝিড় করছে। আটকে আটকে যাচ্ছে।
অন্য কোনো ছবি দেখ।
ভূতের ছবি দেখার মুড নিয়ে বসেছি, এখন অন্য ছবি কীভাবে দেখব?
তাও ঠিক।
তুমি মাঝে-মাঝে এত বোকার মতো কথা বল।
সরি।
সরি-ফরি বলতে হবে না। শুয়ে পর, রাত অনেক হয়েছে। ও আচ্ছা বলতে ভুলে গেছি, তোমার সেন্টাটা রবিন ভাই খুব পছন্দ করেছেন। রবিন অই বলেছেন সেন্টটার গন্ধের সঙ্গে এলিজাবেথ আর্ডেনের গন্ধের খুব মিল আছে। এলিজাবেথ আর্ডেনের নাম শুনেছ?
না।
পৃথিবীর সেরা সেন্ট। আচ্ছা রাখি তুমি শুয়ে পড়। ডরমিকাম খাবার আধ ঘণ্টার মধ্যে শুয়ে পড়তে হয়, নয় তো পরে মাথা ধরে। বাতি নিভিয়ে শুয়ে পড়। ঘুম তাড়াতাড়ি আসবে।
হেদায়েত টেলিফোন রেখে শুয়ে পড়ল। আজকে রাতটা ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা। গায়ের উপর চাদর রাখলে গরম লাগে। চাদর ফেলে দিলে আবার ঠাণ্ডা লাগে।
বাতি নেভানোর পর ঘর কবরের মতো অন্ধকার হয়ে গেছে। ভোরবেলায় জানালা দিয়ে আলো আসে বলে সেতুর ঘুম ভেঙ্গে যায়। এই কারণেই প্রতিটি জানালার সে ভারী পর্দা দিয়েছে। এতেও লাভ হয়নি দেখে জানালার কাচে কালো রঙ দিয়ে দিয়েছে। কোনো দিন থেকে ঘরে আলো আসার ব্যবস্থা নেই। এমন অন্ধকার ঘরে ঘুমানো যায় না। সাউন্ড অফ করে টিভি ছেড়ে দিলে ঘর সামান্য আলো হবে। টিভির রিমোট টেবিলে রাখা। রিমোটের জন্যে হাত বাড়াতেই আগের রাতের মতো নরম একটা হাতের উপর হাত পড়ল। হেদায়েত আগের রাতের মতো চেঁচিয়ে উঠল না। ভয়ে তার শরীর জমে গেছে। তার পরেও সে হাত সরাল না। ব্যাপারটা বুঝতে হবে। সে যদি শক্ত করে হাতটা ধরে তার কাছে আনে তাহলে কি হাতটা আসবে? শুধু হাতটা আসবে না হাতের মানুষটাও আসবে? চিন্তা করতে করতেই হেদায়েত উরমিকামের প্রভাবে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল।
গাঢ় ঘুম হলো না। সারারাতই আজে-বাজে স্বপ্ন। একটা স্বপ্নে বড় হলঘরে পুতুলের মতো চেহারার একটা লম্বা মেয়ে মেঝেতে বসে আছে। মেয়েটার হাত দুটি অসম্ভব লম্বা। দুটি হাতই মেঝেতে পরে আছে সাপের মতো। মেয়েটার আঙ্গুলগুলি অস্বাভাবিক লম্বা। প্রতিটি আঙ্গুলে আংটি। আংটি থেকে আলো বেরিয়ে আসছে। স্বপ্নে হেদায়েত মেয়েটাকে চেনে। মেয়েটার নাম এলিজাবেথ আর্ডেন। তার গা থেকে সুন্দর গন্ধ আসছে।
স্বপ্ন শেষ হয়ে গেল। আরেকটা স্বপ্ন প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হলো। সেই স্বপ্নে আগের হলঘরটাই আছে, তবে এলিজাবেথ আর্ডেন নেই। হলঘর ভর্তি পুরানো আমলের টেলিফোন। এখানেও একটা মেয়ে আছে। মেয়েটার মুখ গোল। মাথাভর্তি কোঁকড়ানো চুল। মেয়েটি বলছে, আমি টেলিফোন অপারেটর। আমার নাম নীতু। রোল নাম্বার টেন। আপনার কাকে দরকার বলুন। আমি এক্ষুনি লাইন করে দিচ্ছি।
হেদায়েত বলল, সেতুর সঙ্গে একটু কথা বলা দরকার। সে তার মায়ের বাড়িতে আছে।
মায়ের বাড়িতে কেন?
তার একটা ভূতের ছবি দেখার কথা। ছবির খুব ভালো প্রিন্ট পাওয়া গেছে।
স্যার উনাকে তো কোনো নাম্বারেই পাচ্ছি না।
চেষ্টা করে যাও।
মেয়েটা চেষ্টা করেই যাচ্ছে। লাভ হচ্ছে না। এক সময় সে হতাশ হয়ে বলল, স্যার টেলিফোনে পেলাম না। তবে উনার আত্মা নিয়ে আসতে পারি। আনব?
না না, এই কাজ করতে যাবে না। পরে তার সমস্যা হবে।
স্যার গুড নিউজ! উনাকে টেলিফোনে পাওয়া গেছে। নিন কথা বলুন।
হেদায়েতের ঘুম ভাঙলো টেলিফোনের শব্দে। টেলিফোন বেজেই যাচ্ছে। ঘরে ঝলমলে আলো। ঘড়িতে দশটা পাঁচ বাজে। দশটা থেকে ক্লাশ ছিল। ক্লাসটা মিস হয়েছে। কী সর্বনাশ! হেদায়েত টেলিফোন ধরে বলল, কে?
সেতু বলল, কে বলছ কেন? টেলিফোনটা ভদ্রভাবে ধরতে পার না। এতক্ষণ ধরে ঘুমাচ্ছ?
হুঁ,
ঘুমের অষুধে তাহলে ভালো কাজ করেছে।
হুঁ।
এখন থেকে অর্ধেকটা করে খাবে, পুরো ট্যাবলেট খেয়ে সারাদিন ঘুমানোর কিছু নেই।
হুঁ।
আচ্ছা শোন আমার আসতে আসতে কিন্তু বিকাল হয়ে যাবে। ছোট্ট একটা ঝামেলায় পড়ে গেছি। ঝামেলাটা কি শুনবে?
না।
এত কম কৌতূহল কেন তোমার, বল তো। একটা বোয়াল মাছের যে কৌতূহল, তোমার তাও নাই। বোয়াল মাছ পানিতে নড়া-চড়া করে। আশেপাশে কী হচ্ছে বুঝার চেষ্টা করে। তুমি তাও কর না।
সরি!
কথায় কথায় সরি বলার কিছু নেই। সরি বলে সমস্যার সমাধান হয় না। আচ্ছা শোন, কেউ কি আমার নামে কিছু তোমার কাছে লাগিয়েছে?
না তো।
উল্টা-পাল্টা কিছু কি বলেছে–যেমন আমার ইল্লিসিট রিলেশনশিপ আছে একজনের সঙ্গে।
না।
দুষ্টলোকের তো পৃথিবীতে অভাব নেই। মানুষের নামে কুৎসিত গল্প তৈরী করে এরা কী যে আনন্দ পায়। কোন একটা বদমাশ আমার নামে আজে-বাজে কথা চারদিকে ছড়াচ্ছে।
আজে-বাজে কী কথা?
আমি না-কি রাতে হোটেলে কার সঙ্গে থাকি।
হেদায়েত বলল, তুমি হোটেলে থাকবে কেন? নিজের ফ্ল্যাট আছে। মায়ের বাসা আছে। তোমার হোটেলে থাকার দরকার কী?
তুমি যত সহজে ব্যাপারটা বুঝতে পারছ, অন্যরা তা পারছে না। নাশতা খেয়েছ?
না।
হাত-মুখ ধুয়ে নাশতা খাও। কলেজে যাও। আর শোন রাতে তোমাকে নিয়ে বাইরে কোথাও যাব। টি বোন স্টেক খেতে ইচ্ছা করছে। আমি একটা রেস্টুরেন্টের খোঁজ পেয়েছি, ভালো স্টেক বানায়।
হেদায়েত বলল, আচ্ছা।
নাদুর মা চা নিয়ে এসেছে। বাসি মুখে চা খেতে দেখলে সেতু রাগ করত। সেতু নেই, আরাম করে চা-টা খাওয়া যায়।
নাদুর মা বলল, ভাইজানের শরীর কি ঠিক আছে?
হুঁ।
দশটা পর্যন্ত ঘুম, এই জন্যে চিন্তাযুক্ত ছিলাম। ভাইজান, অনেক দিন ধইরা ভাবতেছি আপনারে একটা কথা বলব। সাহসে কুলায় না। কথাটা বলি? আপামণির বিষয়ে একটা কথা। আপনেরে বলা প্রয়োজন।
