এই কথাও তুমি আমাকে অসংখ্যবার বলেছ। আমি কখনো কথা শুনে রেগে যাইনি। এখনো যাচ্ছি না। যাই বাবা, ঘুম পাচ্ছে।
বাবা হঠাৎ গলার স্বর বেশ কঠিন করে বললেন, আমি চাই না তুই তোর বৌ নিয়ে এই বাড়িতে বাস করিস। তুই অন্য কোথাও উঠে যা।
আমি বললাম, আচ্ছা।
কথার কথা আমি বলছি না। আমি সত্যি সত্যি তাই চাচ্ছি।
শিগগিরই সব সমস্যার সমধান করে ফেলব বাবা। এখন যাই।
আমি উঠে চলে এলাম। ফ্রীজ থেকে ঠাণ্ডা পানির বোতল নিয়ে এসেছি। কিন্তু রূপা ঘুমুচ্ছে … আহ, কি সুন্দর তাকে লাগছে!
বাবার ঘরে ডাক পড়েছে
বাবার ঘরে ডাক পড়েছে।
জজীয়তীয়ের অভ্যাস তিনি এখনো ছাড়তে পারেননি। কিছু দিন পর পর তিনি জাজ সাহেবের ভূমিকায় নামেন। অভিযোগ আমার বিরুদ্ধে হলেও পুরো বিষয়টির নেপথ্যে যে রূপা আছে তা বুঝতে পারছি। তবে কোন্ কোন্ বিষয় আলোচনা হবে তা বুঝতে পারছি না। এ জাতীয় বিচার সভা এর আগেও হয়েছে। শুরুটা হয় আন্তরিক ভঙ্গিতে। টি পটে চা থাকে, চা খাওয়া হয়। টুক টাক কথা হয়। শীতকালে বলা হয়–বেশ শীত পড়েছে। গরমকালে অত্যধিক গরম নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ হয়। চা শেষ হবার পর বাবা তাঁর ইজিচেয়ারে আধশোয়া হয়ে বসেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বারান্দার ইজিচেয়ার এই উপলক্ষ্যে বাবার ঘরে নেয়া হয়। খানিকক্ষণ তাঁর পা নাচে। এক সময় পা নাচা বন্ধ হয়। তিনি চোখ বন্ধ করে বলেন–রঞ্জু, তোমাকে আমার দুএকটা কথা বলার আছে। দেখা যায় দুএকটা না, তাঁর অসংখ্য কথাই বলার আছে। বাবার স্মৃতিশক্তি খুব একটা ভাল বলে আমার কখনো মনে হয়নি। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার, আমার বিষয়ে তাঁর স্মৃতিশক্তি অসম্ভব তীক্ষ্ণ। চার বছর বয়স থেকে আমি কি কি অপরাধ করেছি তা এক এক করে বলা হয়। মোটামুটি চরিত্র বিশ্লেষণ যাকে বলে। সব অপরাধ নিয়ে কথা বলা শেষ হবার পর সেদিনের আলোচ্যসূচি আসে। ঘণ্টা দুই সময় তাতে লাগে। এই দু ঘণ্টা সময় বাবা খুব উপভোগ করেন বলেই আমার ধারণা।
আজ বাবার বিখ্যাত বিচার সভা বসল রাত দশটায়। এই জাতীয় সভায় পরিবারের সকল সদস্যের উপস্থিতি বাঞ্ছনীয়। কিন্তু বাবু সভা শুরুর আগেই বলল, আমি থাকতে পারব না। পড়া ফেলে এসেছি। বাবা বললেন, দশ পনেরো মিনিটে তোমার পড়া মাথায় উঠবে না। বোস।
বাবু গম্ভীর গলায় বলল, আমার পড়াশোনার ব্যাপারটা আমি দেখব। এই বিষয়ে কেউ কিছু বললে আমার ভাল লাগে না। আমি ঠিক ঘড়ি দেখে কুড়ি মিনিট থাকব। এর মধ্যে যার যা বলার বলে শেষ করতে হবে।
বলেই বাবু হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সময় দেখে নিল। বাবুর এই সব কাণ্ডকারখানা সভার চরিত্র খানিকটা বদলে দিল। সভা পুরানো রুটিন মত অগ্রসর হল না। আমি অতীতে কি করেছি না করেছি তা আলোচনা করার সুযোগ বাবা পেলেন না। সরাসরি মূল বিষয়ে চলে গেলেন–আমি সবাইকে এখানে ডেকেছি বৌমা সম্পর্কে দুএকটা কথা বলার জন্য।
বাবু বলল, ভাবীর প্রসঙ্গে কথা বলবেন–ভাবী কোথায়?
মা বললেন, তার এখানে থাকার প্রয়োজন নেই।
যার প্রসঙ্গে কথা সে এখানে থাকবে না, তা কি করে হয়?
বাবা বললেন, তুই খুব বিরক্ত করছিস–তার এখানে থাকার প্রয়োজন কেন নেই তা কিছুক্ষণের মধ্যেই বুঝতে পারবি। একটা সিনেমা পত্রিকায় তার একটা ছবি ছাপা হয়েছে। সেটা নিয়েই দুএকটা কথা বলতে চাই।
বাবু বিস্মিত গলায় বলল, ভাবী ছবি করছে, কাজেই সিনেমা পত্রিকায় তার ছবি ছাপা হবেই। খেলাধুলা করলে স্পাের্টস পত্রিকায় ছবি ছাপা হত।
বাবা বললেন, তুই বেশি বকবক করছিস। যা তুই, তোর ঘরে গিয়ে পড়াশোনা কর।
চলে যা।
বাবু ঘড়ি দেখে বলল, কুড়ি মিনিট এখনো হয় নি। কুড়ি মিনিট হোক, তারপর চলে যাব।
মা বললেন, যে রকম ছবি ছাপা হয়েছে কোন ভদ্রঘরের মেয়ের সে রকম ছবি ছাপা হয় না। পুকুর থেকে উঠে আসছে সারা শরীর ভেজা। শাড়ি গায়ে লেপ্টে আছে। ব্লাউজ নেই–আমার বলতেও ঘেন্না লাগছে। এই পরিবারের একটা সম্মান আছে। দশজনের সঙ্গে মিলে মিশে আমাদের থাকতে হয়। আমার বা তোর বাবার বংশে এ জাতীয় ঘটনা ঘটে নি।
বাবু বলল, তোমাদের বংশে কোন অভিনেত্রী ছিল না বলে এজাতীয় ঘটনা ঘটে নি। অভিনেত্রী থাকলে ঘটত।
বাবু, তুই উঠে যা। তোর মাথা গরম হয়ে আছে।
বাবু ঘড়ি দেখে বলল, এখনো দশ মিনিট আছে। দশ মিনিট পার হোক, তারপর যাব।
দশ মিনিট কেউ কোন কথা বলল না। চারদিক নিস্তব্ধ। দশ মিনিটকে মনে হল অনন্ত কাল। বাবু উঠে যাবার পর মা বললেন, আমি এই বিষয় নিয়ে বোমার সঙ্গে কথা বলেছি। বৌমা বলল, সে নাকি ছবি ছাপানোয় সম্মানহানির কিছু দেখতে পায় নি। আমি তাকে বললাম, এ বাড়িতে থেকে এসব জিনিস করা যাবে না। সে বলল, এ বাড়িতে আমি বেশিদিন থাকব না। অল্প কটা দিন। এই কথার মানে কি তাই আমি জানতে চাই। রঞ্জু, সে এই কথা কেন বলল?
আমি বললাম, জানি না।
সত্যি জানিস না?
না।
এখন তো জানলি। এখন কি করবি?
আমার করার কিছু নেই। ও কি করবে না করবে সেটা ওর ব্যাপার।
তুই তাকে কিছুই বলবি না?
না।
ও যে তোকে যাদু করে রেখেছে তা তুই বুঝতে পারছিস না?
না।
বাবা বললেন, আমার এই বাড়িতে বাস করে তুমি যে উদ্ধত ভঙ্গিতে কথা বলছ তা আমার কাছে অত্যন্ত বিস্ময়কর বলে মনে হচ্ছে। তুমি কি করবে না করবে তা তোমার ব্যাপার। তবে আমি তোমার জায়গায় হলে কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা করতাম।
আমি বললাম, কি রকম শাস্তি? খুন করার কথা বলছেন?
