বাথরুম থেকে বের হয়ে পায়জামা-পাঞ্জাবি গায়ে দিয়ে একতলায় এসে শুনলাম, রূপা রিকশা নিয়ে চলে গেছে। সে যে একা যাচ্ছে, আমাকে সঙ্গে নেবার দরকার নেই, তা-ও বলে যায়নি। আমি দিব্যি সেজেগুজে নেমে এসেছি।
এরকম অবস্থায় নিজেকে খানিকটা বোকা বোকা লাগে। আমাকেও নিশ্চয়ই লাগছে। আমি বোকা ভাবটা চেহারা থেকে ঝেড়ে ফেলার জন্য সিগারেট ধরালাম। সিগারেট নিয়ে মুখের ভাবভঙ্গি অনেকখানি বদলে ফেলা যায়। মেয়েরা এই খবরটা
জানে না। জানলে পুরুষের তিনগুণ সিগারেট খেত।
সিগারেটে সবে তিনটা টান দিয়েছি, মুনিয়া এসে বলল, তোকে বাবা ডাকছেন।
এক্ষুণি যেতে বললেন। এক্ষুণি।
আমি দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে সিগারেট ফেলে দিলাম। এগিয়ে যাচ্ছি বাবার ঘরের দিকে, মুনিয়া তীক্ষ্ণ গলায় বলল, তোর তো খুবই বিশ্রী স্বভাব, জ্বলন্ত সিগারেটের টুকরো ফেলে চলে যাচ্ছিস! নিভিয়ে যাবি না? ঐদিন লাবণ্য পা পুড়ে ফেলেছে।
খালি পায় হাঁটাহাঁটি করে কেন? ওকে না করতে পারিস না খালি পায়ে যেন হাঁটাহাঁটি না করে।
এই বলে আমি বাবার ঘরে ঢুকে গেলাম।
বাবা অবেলায় বিছানায় শুয়ে আছেন। বুকে ব্যথা সম্ভবত শুরু হয়েছে। চোখমুখ দেখে কিছু অবশ্যি বোঝা যাচ্ছে না। শারীরিক যন্ত্রণা সহ্যের ক্ষমতা তাঁর অসাধারণ।
বাবা ডেকেছ?
হুঁ, বৌমা কোথায় গেল?
ঠিক প্রত্যাশিত প্রশ্ন নয়। রূপা কোথায় গেছে তা নিয়ে বাবাকে উদ্বিগ্ন হওয়া মানায় না। মুনিয়া যদি বলত, ভাবী কোথায়? সেটা মানিয়ে যেত কিংবা মা যদি বলতেন, অসময়ে বৌমা কোথায় গেল তাও মানাত—কিন্তু বাবা জিজ্ঞেস করবেন কেন?
আমি বললাম, সেগুনবাগিচার দিকে গেছে।
ঐখানে কি?
জানি না।
জিজ্ঞেস করিসনি?
না। আচ্ছা ঠিক আছে, যা।
বাবার ঘর থেকে বের হয়ে এসে মনে হল সামান্য ভুল করা হয়েছে। আমার বলা উচিত ছিল, কি জন্যে জানতে চাচ্ছ? রূপাকে নিয়ে তুমি কি চিন্তিত? রূপা এমন কিছু কি করেছে যার জন্যে চিন্তিত বোধ করছ?
সমস্যা হচ্ছে বাবার সঙ্গে আমার সম্পর্ক এমন যে প্রয়োজনীয় কথা ছাড়া কোনো কথাই হয় না। সেই কথাবার্তাও সাধারণত খুব সংক্ষিপ্ত ধরনের। রূপা অবশ্যি হড়বড় করে তার সঙ্গে অনেক কথাবার্তা বলে। জেদী গলায় তর্ক করে। রূপার তর্ক করার ভঙ্গিটি খুব মজার, কিন্তু শুরুটা সে করে ভয়ঙ্করভাবে। তার ভঙ্গি দেখে মনে হয় প্রতিপক্ষকে সে ছিড়ে খুঁড়ে ফেলবে। প্রতিপক্ষ যখন পুরোপুরি ঘায়েল, তখন সে হঠাৎ গা এলিয়ে বলবে–অবশ্যি আপনার কথা ঠিক। প্রতিপক্ষ তখন হতচকিত। পুরোপুরি আনন্দিতও হতে পারছে না, কারণ সে জানে তর্কে জিততে পারেনি, আবার দুঃখিতও হতে পারছে না।
আমি চায়ের খোঁজে রান্নাঘরের দিকে যাচ্ছি, বারান্দায় মার সঙ্গে দেখা। মা বললেন, বৌমা কোথায় গেছে রে? আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, আমাকে জিজ্ঞেস করছ কেন? তুমি তোমার বৌমাকে জিজ্ঞেস করলে না কেন?
সে তো বলল সেগুনবাগিচায় গেছে।
তাহলে সেখানেই গেছে। আচ্ছা মা, ব্যাপারটা কি শুনি তো?
মা খানিকক্ষণ ইতস্তত করে বললেন, বউমা নাকি সিনেমা করছে। নায়িকার বোনের কি একটা চরিত্র।
বলল কে তোমাকে?
পত্রিকায় লেখা হয়েছে, ছবি ছাপা হয়েছে। তুই জানিস না কিছু?
জানি। তোমরা যা ভাবছ তা না। বিয়ের আগে ওরা কিছু বন্ধুবান্ধব মিলে শর্ট ফিল্ম বানানো শুরু করেছিল। কাজ বন্ধ ছিল, এখন আবার শুরু হবার কথা।
বিয়ের পর আবার সিনেমা কি? বিয়ের আগে যা করেছে, করেছে।
বিয়ে করে তো পাপ করেনি যে সব ছেড়ে দিতে হবে?
পাপ-পুণ্যের কোনো ব্যাপার না। তুই তোর বৌকে দিয়ে অভিনয় করাতে চাস, করাবি। এটা তোর ব্যাপার। পত্রিকায় যেসব লেখা ছাপা হয়–পড়তে ভালো লাগে না। আত্মীয়স্বজনরা পড়ে। তারা মজা পায়। হাসাহাসি করে।
কি লেখা হয়েছে?
মা গম্ভীর গলায় বলল, মুনিয়ার কাছে কাগজটা আছে, পড়ে দেখ।
আমি মুনিয়ার কাছ থেকে কাগজটা নিয়ে এলাম। নিজের ঘরে ঢুকে পাতা খুলে রীতিমত চমৎকৃত—পুরো পাতা ভর্তি রূপার ছবি। লেখার শিরোনাম হচ্ছে তিনি নগ্ন হতে রাজি।
বেশ দীর্ঘ প্রতিবেদন, পুরো তিন কলাম ছাপা হয়েছে। নিজস্ব প্রতিবেদক জানাচ্ছেন শর্ট ফিল্ম সজনে ফুল-এর নির্মাণ কাজ শেষ পর্যায়ে। ছবির তরুণ পরিচালক মুহাম্মদ জোবায়েদ এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন যে সামান্য কিছু প্যাচওয়ার্ক ছাড়া ছবির সব কাজ শেষ হয়েছে। জুন মাস নাগাদ ছবিটি সেন্সর বোর্ডের নিকট পাঠানো হবে। ছবিতে একটি খোলামেলা দৃশ্য আছে যে কারণে সেন্সর বোর্ড ছবিটির ব্যাপারে আপত্তি তুলতে পারে বলেও তিনি আশঙ্কা করছেন। তিনি বলেন, জাতীয় সেন্সর বোর্ডে কিছু তথাকথিত নীতিবাগীশ লোক আছেন যারা পান থেকে চুন খসলেই গেল, গেল বলে হৈচৈ শুরু করেন। সহজ বাস্তবতাকে স্বীকার করে নেবার মানসিকতা তাদের নেই। আমাদের ছবিতে কিছু খোলামেলা দৃশ্য আছে, যা গল্পের প্রয়োজনে এসেছে এবং খুব শিল্পসম্মতভাবেই এসেছে। কোনো মুক্তবুদ্ধির মানুষই এই দৃশ্য নিয়ে আপত্তি তুলবেন না। মুহাম্মদ জোবায়েদ ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, বর্তমান সেন্সর বোর্ডের সদস্যদের মধ্যে মুক্তবুদ্ধির ব্যাপারটা একেবারেই নেই। তাদের সবার দৃষ্টি একচক্ষু হরিণের মতো।
সজনে ফুল ছবির খোলামেলা দৃশ্য নিয়ে অভিনেত্রী রূপা চৌধুরীর সঙ্গে কথা বলে ছবিতে অভিনয় প্রসঙ্গে তাঁর মতামত জানতে চাওয়া হলে রূপা চৌধুরী বলেন, নগ্ন হওয়াটাকে তিনি কিছু মনে করেন না। তিনি বলেন, ঈশ্বর আমাদের এই পৃথিবীতে নগ্ন করেই পাঠিয়েছিলেন, এই সত্যটি মনে রাখলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। এই প্রতিবেদক ঠাট্টাচ্ছলে রূপা চৌধুরীকে জিজ্ঞেস করেন, আপনি কি নগ্ন হয়ে রাস্তা দিয়ে হেঁটে যেতে পারবেন? রূপা চৌধুরী হাসতে হাসতে বললেন, আমি পারব তবে সেই দৃশ্য আপনারা সহ্য করতে পারবেন না।
