আমি মার সঙ্গে কফি খেলাম। দুজন খানিকক্ষণ বারান্দায় হাঁটলাম। মা আমাকে উপদেশ দিতে শুরু করলেন। ঘণ্টাখানিক উপদেশ দিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়লেন। তখন মার স্বাস্থ্য খুব খারাপ ছিল। কোনো পরিশ্রম করতে পারেন না। সিঁড়ি ভাঙতে পারেন না। তাঁকে ধরে ধরে দোতলায় তুলতে হয়।
পরদিন ভোরবেলা শুনলাম ঘুমের মধ্যে মা মারা গেছেন। হার্ট ছিল দুর্বল, অতিরিক্ত ঘুমের অষুধ খেয়েছিলেন। শরীর সহ্য করতে পারেনি।
যদিও আমার ধারণা এটা আত্মহত্যা, নয়তো আমাকে রাত দুটায় ঘুম থেকে তুলে উপদেশ দিতেন না। তোমার কি মনে হয় আমার অনুমান ঠিক আছে? খবরের কাগজ হাতে আমি রূপার দিকে তাকিয়ে আছি। কোনো রকম দ্বিধা ছাড়া সে এই গল্প কি করে করল! লাবণ্যও পাশে বসে হাঁ করে কথা শুনছে।
আমি কিছু বলার আগেই মুনিয়া চা নিয়ে ঢুকল এবং গম্ভীর গলায় বলল, ভাবী, লাবণ্যকে তুমি কিন্তু চা দেবে না। ও আজেবাজে সব অভ্যেস করছে। আর শোন দাদা তুই একটু নিচে যা।
আমি বললাম, কেন?
সফিক ভাই এসেছে। তোকে চাচ্ছে।
বলে দে বাসায় নেই।
একটু আগে বলেছি, তুই বাসায় আছিস।
এখন বলে দে—আমি বাসায় নেই।
মিথ্যা আমি বলতে পারব না দাদ তুই নিজে গিয়ে বলে আয় যে তুই বাসায় নেই।
মুনিয়া শুকনো মুখে চলে গেল। রূপা বলল, আমি বলে আসি। উনি আসলে আমাকে দেখতেই এসেছেন। প্রতি দশ থেকে বারো দিন পরপর উনি আমাকে দেখতে আসেন। এই চক্রটা আমি হিসেব করে বের করেছি। তাঁর সঙ্গে আমার শেষ দেখা হয়েছে এগারো দিন আগে।
রূপা নিচে নেমে গেল। আমি খবরের কাগজ হাতে নিয়ে বসে রইলাম। লাবণ্য বলল, মামী লুডু খেলবে?
আমি বললাম, না।
একটু খেল মামা। তুমি কালো আমি লাল।
না।
খেল মামা, খেল। খেলতেই হবে।
আমি ইজিচেয়ার থেকে উঠে গিয়ে বেশ জোরেই তার গালে একটা চড় বসালাম। মেয়েটা মুহূর্তৈ বাড়ি মাথায় তুলে ফেলল। মুনিয়া ছুটে এসে বলল, কি হয়েছে?
আমি হাই তুলতে তুলতে বললাম, তেমন কিছু হয়নি। চড় মেরেছি। বড় বিরক্ত করছিল।
মুনিয়া হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল। আমি বললাম, এইভাবে তাকিয়ে থাকিস মুনিয়া। তোকে কালো টিকটিকির মতো দেখাচ্ছে। মনে হচ্ছে তোর চোখ ঠিকরে বের হয়ে আসবে।
ঠিক করে আমাকে বল তো দাদা, কেন মারলি?
আমাকে লুডু খেলতে বলছিল। খেলব না বলছি, তারপরেও জোর করছে। চড় মারার ফলে ভবিষ্যতে আর কখনো জোর খাটাতে আসবে না। একই সঙ্গে বুঝতে পারবে পৃথিবী জোর খাটানোর জায়গা নয়।
তোর মাথা খারাপ। তোর চিকিৎসা হওয়া দরকার।
আমি আবার খবরের কাগজ চোখের সামনে মেলে ধরলাম। মুনিয়া হিসহিস করতে করতে বলল, আমাকে কালো টিকটিকি কেন বললে, গায়ের রঙ কালো বলে?
হুঁ।
ফর্সা রঙ দেখে মাথা আউলা হয়ে গেছে। সারা পৃথিবীকে এখন কালো লাগছে।
সারা পৃথিবীকে লাগছে না, তোকে লাগছে।
মুনিয়া দরজা ধরে কাঁদতে লাগল। আমি যা করেছি তা ঘোরতর অন্যায়। আমার কথায় মুনিয়া যে কাঁদছে, তাতে তাকে দোষ দেয়া যায় না। যে কেউই কাঁদবে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, আমার সামান্য হলেও অনুশোচনা এবং গ্লানি বোধ করা উচিত–তা করছি না। বরং ইচ্ছা করছে এ বাড়ির প্রতিটি জীবন্ত প্রাণীকে কাঁদিয়ে দিতে।
মাকে খুঁজে বের করে তাঁর সঙ্গে খানিকক্ষণ ঝগড়া করলে কেমন হয়। না, ঝগড়া না, এই জিনিস আমি পারি না। মাকে কিছু কঠিন কথা শুনিয়ে আসা যায়। কিংবা দোতলায় উঠে বাবুকে বলে আসা যায়–বাবু শোন, তুই আসলে মহামূখ। কিছু জটিল ইকোয়েশন মুখস্থ করার বিদ্যা ছাড়া পরম কুরুণাময় ঈশ্বর তোকে আর কিছু দেননি। তোকে পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছে ফিজিক্সের একটা শুকনো বই বানিয়ে।
আমি ইজিচেয়ার ছেড়ে উঠলাম। যার সঙ্গেই প্রথম দেখা হবে, তাকে কিছু কথা। বার্তা বলব। বাবার সঙ্গে দেখা হলে বাবাকে।
দেখা হল র সঙ্গে। এই মহিলা বারান্দায় বসে আছেন। মতির মা চিরুনি দিয়ে তাঁর মাথার উকুন এনে দিচ্ছে। মনে হচ্ছে কাজটিতে দুজনই খুব আনন্দ পাচ্ছে। প্রাণীহত্যা আনন্দজনক কাজ তো বটেই। প্রাণী যত ক্ষুদ্রই হোক না কেন তাকে। হত্যায় আনন্দ আছে। উকুন এবং মশা প্রাণী হিসেবে কাছাকাছি–দুজনই রক্ত খায়। তারপরেও উকুন মারার আনন্দ বেশি, কারণ এরা শব্দ করে মারা যায়। নখ দিয়ে এদের ফুটানো হয়।
মা বললেন, রঞ্জু, বৌমা কার সঙ্গে এতক্ষণ ধরে কথা বলছে?
আমি হাই তুলতে তুলতে বললাম, সফিকের সঙ্গে।
যার তার সঙ্গে তার এত কি কথা?
আমি আবার হাই তুললাম, কোন লাইনে শাকে আক্রমন করা যায় ঠিক বুঝতে পারছি না। মার ধারণা, মানুষ হিসেবে তিনি প্রথম শ্রেণীর। দয়ামায়ায় তাঁর অন্তর পূর্ণ। নামাজ রোজা করছেন। প্রয়োজনের বেশি করছেন। শুক্রবারে ফকির এলে ভিক্ষা না নিয়ে বিদেয় হয় না। মার নির্দেশ, শুক্রবারে ভিক্ষা চাইলে ভিক্ষা দিতে হবে। তাঁর সঙ্গে একবার গাড়ি করে পল্লবীর দিকে যাচ্ছি। সোনারগা হোটেলের কাছে লাল লাইটে গাড়ি থামল। দুটা বাচ্চা ছেলে ছুটে এল ফুল বিক্রি করতে। আমি গলার স্বর যথাসম্ভব কর্কশ করে বললাম, ভাগে।
মা অবাক হয়ে বললেন, ভাগে ভাগো বলছিস কেন? গরিব মানুষ না? শীতের সময় খালিগায়ে ফুল বিক্রি করছে আহা রে! তিনি ভ্যানিটি ব্যাগ খুলে দুজনকে দুটা টাকা দিলেন। গরিবের দুঃখে কাতর এই মার অন্য একটি ছবিও আছে, সেই ছবিও সবার চেনা, কিন্তু সেই ছবি কারো চোখে পড়ে না। জাহেদা নামে আমাদের একটা কাজের মেয়ে ছিল। কোলের একটা বাচ্চা নিয়ে সে কাজ করতে এসেছিল। বাচ্চাটা বেশির ভাগ সময় কাঁদত। খিদের যন্ত্রণাতেই কাঁদত। জাহেদা মাঝে মাঝে চুরি করে দুধ নিয়ে বাচ্চাটাকে খাওয়াত। একদিন ধরা পড়ে গেল। মা রেগে আগুন। বিদায় হও। এক্ষুণি বিদায় হও। ঘরে চোর পুষছি। কি সর্বনাশের কথা! জাহেদা মার পা জড়িয়ে ধরল। দুগ্ধপোষ্য একটি শিশু নিয়ে মানুষের বাড়িতে কাজ পাওয়া তার সহজ হবে না।
