তুমি আসল কথা বল। রসিকতা ভাল লাগছে না।
ও আচ্ছা। আসল কথা। আসল কথা হল–আমার যাবার কথা পাঁচটায়। আমি ঠিক সাড়ে চারটার সময় বললাম, বদরুল, দোস্ত আমি উঠি। মেয়েকে ডাক্তারের কাছে নিতে হবে।
বদরুল বলল, কোন্ ডাক্তার?
আমি বললাম, চাইল্ড স্পেশালিস্ট ডাক্তার রহমান। বদরুল বলল, টেলিফোন করে যা। নয়ত দু তিন ঘণ্টা বসে থাকতে হবে। ব্যাটার কাছে রোজ দু তিনশ রুগী যায়। আমি টেলিফোন করলাম। ডাক্তারের অ্যাসিসটেন্ট বলল, আজ ডাক্তার সাহেব আসবেন না। তাঁর কি যেন জরুরী কাজ পড়েছে মেডিকেল এসোসিয়েশনে। কাজেই আমি নুহাশকে নিয়ে যাই নি। তারপরেও অবশ্যি দেরি করে আসার জন্যে তুমি আমার উপর রাগ করতে পার। এখন দয়া করে আমাকে ভাত দাও। খিদেয় প্রাণ যাচ্ছে।
রেবেকা উঠে চলে গেল। মিনহাজ ঢুকল নুহাশের ঘরে। পাঞ্জাবী খুলতে খুলতে বলল, নুহাশ, মা মণি, তুমি যে ঘুমের ভান করে পড়ে আছ তা আমি বুঝতে পারছি। দয়া করে চোখ মেলে তাকাও এবং ছোট্ট একটা হাসি দাও।
নুহাশ বাবার দিকে তাকিয়ে হাসল।
মিনহাজ গলার স্বর নিচু করে বলল, সমূহ বিপদ থেকে বাঁচার জন্যে তোমার মার কাছে মিথ্যে কথা বলেছি।
তুমি টেলিফোন কর নি বাবা?
টেলিফোন কোত্থেকে করব? আমি কি ঐ ব্যাটার টেলিফোন নাম্বার জানি নাকি? ডাক্তারের ব্যাপারটা পুরোপুরি ভুলে গিয়েছিলাম। এখন কেন জানি আমার আশংকা হচ্ছে মিথ্যাটা ধরা পড়ে যাবে। কাল যদি তোর মা ডাক্তারের কাছে যেতে চায় তাহলে সমস্যা হবে।
তুমি আমাকে নিয়ে যাও।
আমিই তো নিয়ে যাব। তোর মাকে কোন মতেই ডাক্তারের কাছে। যেতে দেয়া যাবে না।
.
মিনহাজ ভাত খেতে খেতে বলল, ডাক্তার সাহেবের কাছে আমি অ্যাপয়েন্টমেন্ট করে রেখেছি। কাল ছটার সময় আমি নুহাশকে নিয়ে যাব। এই ব্যাপারে তোমাকে আর চিন্তা করতে হবে না। আমার উপর ছেড়ে দাও।
রেবেকা বলল, আমি তোমার সঙ্গে ঝগড়া করতে চাই না। ঝগড়া করতে করতে আমি ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। ডাক্তার রহমানের সঙ্গে তুমি টেলিফোনে কোন কথা বল নি। আমি বলেছিলাম। নুহাশের কি হয়েছে জানার জন্যে টেলিফোন করেছিলাম। উনি বললেন, তুমি নুহাশকে নিয়ে যাও নি।
মিনহাজ অন্যদিকে তাকিয়ে কাঁচামরিচে কামড় দিল।
রেবেকা বলর, কোথায় গিয়েছিলে?
জোছনা দেখতে গিয়েছিলাম।
জোছনা দেখতে?
হু। বদরুল বলল, আজ পূর্ণিমা আছে- চল শালবনে গিয়ে পূর্ণিমা দেখে আসি। ও একটা জীপও জোগাড় করেছিল।
পূর্ণিমা দেখেছ?
হু।
ভাল লেগেছে?
হু।
খুব ভাল লাগল?
হ্যাঁ খুব ভাল লাগল। দেখার মত দৃশ্য। অরণ্যের সঙ্গে জোছনার খুব ভাল সম্পর্ক আছে। আমাদের উচিত পূর্ণিমার রাতগুলি বনে কাটানো। এই জন্যেই রবীন্দ্রনাথ বলেছেন–আজ জোছনা রাতে সবাই গেছে বনে।
রেবেকা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বলল, পূর্ণিমা দেখতে তোমার আর অসুবিধা করব না। তুমি মনের সমস্ত মাধুরী মিশিয়ে পূর্ণিমা দেখতে পারবে। হাঁ করে সারারাত চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারবে। কারণ আমি তোমার সঙ্গে বাস করব না।
তার মানে?
তুমি থাকবে তোমার পূর্ণিমা নিয়ে, তোমার বন্ধুবান্ধব নিয়ে। আমি থাকব নুহাশকে নিয়ে।
আমি কিছু বুঝতে পারছি না।
বুঝতে না-পারার তো কিছু নেই। আমি যা বলেছি সহজ বাংলায় বলেছি। রেবেকা উঠে চলে গেল। মিনহাজ মনের ভুলে কচ করে একটা আস্ত কাঁচামরিচ চাবিয়ে ফেলল।
নুহাশকে ডাক্তারের কাছে
০২.
রেবেকা নুহাশকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে। কাপড় পরে তৈরি হচ্ছে। মিনহাজ বলল, আমি সঙ্গে যাই? রেবেকা বলল, না, তুমি না। তুমি তোমার বন্ধুদের কাছে যাও। ওদের সঙ্গে গল্প কর। পূর্ণিমার পরের রাতেও সুন্দর জোছনা হয়। যাও, শালবনে গিয়ে জোছনা দেখে আস। চেষ্টা করলে আজও নিশ্চই জীপটা জোগাড় করা যাবে।
মিনহাজ করুণ গলায় বলল, শুধু শুধু রাগ করছ।
আমি মোটেই রাগ করছি না। ঝগড়াও করছি না। অতীতে অসংখ্যবার ঝগড়া করেছি, কুৎসিত ঝগড়া করেছি। এখন ঠিক করেছি–আর না। তোমাকে আমি আর কখনও বিরক্ত করব না। আমি চাই না তুমিও আমাকে বিরক্ত কর।
আচ্ছা, আমি আর বিরক্ত করব না। আমি কি করলে তুমি বিরক্ত হও তার একটা লিস্ট করে বসার ঘরে টানিয়ে রাখ। এখন থেকে আমি লিস্ট মেনে চলব।
সস্তা রসিকতা আমার সঙ্গে করবে না। এ ধরনের সস্তা রসিকতা আগে অনেকবার করেছ। এগুলি পুরানো হয়ে গেছে।
ও আচ্ছা। নতুন কিছু কি বলব?
নতুন কিছু বলতে হবে না। বরং আমি তোমাকে নতুন কিছু বলি অফিস থেকে আমাকে একটা কোয়ার্টার দেবে। আমি নুহাশকে নিয়ে ঐ কোয়ার্টারে চলে যাব।
আমি সেখানে যেতে পারব না?
না।
কবে দিচ্ছে কোয়ার্টার?
খুব শিগগিরই দেবে। অল্প কিছুদিন আমি এই বাড়িতে আছি। সেই অল্প কিছুদিন তুমি যদি এ বাড়িতে না থাক তাহলে খুব ভাল হয়।
বাড়ি থেকে বের করে দিচ্ছ?
রেবেকা জবাব দিল না। নুহাশের কান্না পেতে লাগল। মা, বাবার সঙ্গে এরকম ঝগড়া করছে কেন? কই, বাবা তো ঝগড়া করছে না। বাবা জোছনা দেখতে গিয়েছে তো কি হয়েছে? জোছনা দেখতে ভাল লাগে, তাই দেখতে গিয়েছে। মাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যেতে নুহাশের ভাল লাগে না। মা কেমন গম্ভীর হয়ে থাকে। বাবাকে নিয়ে যাবার মধ্যে অনেক রকম মজা আছে। রিকশা দিয়ে যাবার সময় যদি দেখা যায়–একজন আমড়াওয়ালা যাচ্ছে, তখন নুহাশকে কিছু বলতে হবে না। বাবা নিজেই বলবে–আমার খুব আমড়া খেতে ইচ্ছা করছে রে নুহাশ। কি করা যায় বল তো? আমড়া কিনব?
