পনেরই আগস্ট রাত ন’টার দিকে সরফরাজ খানের বাড়ির সামনের রাস্তায় এক যুবককে চিৎকার করতে করতে সড়কের এক মাথা থেকে আরেক মাথা পর্যন্ত যেতে দেখা গেল। সে চিৎকার করে বলছিল–মুজিব হত্যার বিচার চাই। যুবকের পেছনে পেছনে যাচ্ছিল ভয়ঙ্করদর্শন একটি কালো কুকুর।
সেই রাতে অনেকেই রাস্তার দুপাশের ঘরবাড়ির জানালা খুলে যুবককে আগ্রহ নিয়ে দেখছিল। সঙ্গে সঙ্গে জানালা বন্ধও করে ফেলছিল।
আচমকা এক আর্মির গাড়ি যুবকের সামনে এসে ব্রেক কষল। গাড়ির ভেতর থেকে কেউ-একজন যুবকের মুখে টর্চ ফেলল। টর্চ সঙ্গে সঙ্গে নিভিয়ে ইংরেজিতে বলল, Young man, go home. Try to have some sleep.
শফিককে এই উপদেশ যিনি দিলেন, তিনি ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ।
যান যান বাসায় যান।
শফিক বলল, জি স্যার। যাচ্ছি।
খালেদ মোশাররফ বললেন, আমি আপনাকে চিনি। অবন্তিদের বাসায় দেখেছি। আপনি অবন্তির গৃহশিক্ষক।
জি।
গাড়িতে উঠুন। আপনি কোথায় থাকেন বলুন। আপনাকে পৌঁছে দিচ্ছি।
আমি হেঁটে যেতে পারব। তা ছাড়া আমার সঙ্গে এই কুকুরটা আছে। কুকুর নিয়ে আপনার গাড়িতে উঠব না।
শফিক চলে যাচ্ছে। জিপ দাঁড়িয়ে আছে। খালেদ মোশাররফ সিগারেট ধরিয়ে অবন্তির গৃহশিক্ষকের দিকে তাকিয়ে আছেন।
শফিক বলল, স্যার যাই? স্লামালিকুম।
খালেদ মোশাররফ বললেন, আপনি একজন সাহসী যুবক। আসুন আমার সঙ্গে হাত মেলান। সাহসী মানুষদের হাতের চামড়া থাকে মোলায়েম। আপনার হাতের চামড়া দেখি?
খালেদ মোশাররফ অনেকক্ষণ শফিকের হাত ধরে রইলেন। শফিকের হাতের চামড়া মোলায়েম না, কঠিন।
রাত বারোটার কিছু পরে চাদরে নাকমুখ ঢেকে ছানু ভাই উপস্থিত হলেন পীর হাফেজ জাহাঙ্গীরের হুজরাখানায়।
হাফেজ জাহাঙ্গীরের রাতের ইবাদত শেষ হয়েছে। তিনি ঘুমুতে যাচ্ছিলেন। ছানু ভাইকে দেখে এগিয়ে এলেন।
ছানু বললেন, পীর ভাই। রাতে থাকার জায়গা দেওয়া লাগে। বিপদে আছি।
কী বিপদ?
বঙ্গবন্ধু নাই। আমরা যারা তাঁর অতি ঘনিষ্ঠ তারাও নাই। বাংলাদেশের পাবলিক হলো, ব্রেইন ডিফেক্ট পাবলিক। যে-কোনো একজন যদি বলে—ধরো, ছানুরে ধরো। পাবলিক দৌড় দিয়া আমারে ধরবে।
আপনার থাকার ব্যবস্থা করছি। রাতের খনা কি খেয়েছেন?
রাতের খানা কখন খাব বলেন! দৌড়ের উপর আছি। খানার ব্যবস্থা করলে ভালো হয়। আরেকটা কথা—সরফরাজ খান সাহেব কি আছেন।
আছেন।
ভালো হয়েছে, উনাকে তার বিষয়সম্পত্তি বুঝিয়ে দিব। খান সাহেবকে আমি বড়ভাইয়ের মতো দেখি, শ্রদ্ধা করি।
সাংবাদিক এন্থনি মাসকারেনহাসের বিখ্যাত গ্রন্থ লিগেসি অব ব্লাড-এ উল্লেখ করা হয়েছে, শেখ মুজিবর রহমানের মৃত্যুসংবাদ প্রচারিত হওয়ার পরপর টুঙ্গিপাড়ায় তার পৈতৃক বাড়িতে স্থানীয় জনগণ হামলা করে এবং বাড়ির সব জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে যায়।(১)
হায়রে বাংলাদেশ!
———–
১. এন্থনি মাসকারেনহাস তার গ্রন্থে সত্যের মতো করে অনেক মিথ্যাও ঢুকিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর পৈতৃক বাড়ি লুট হওয়ার ঘটনা আমার কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না।
সপরিবারে বঙ্গবন্ধুর নিহত হওয়ার দিন
সপরিবারে বঙ্গবন্ধুর নিহত হওয়ার দিন থেকে পনের দিন—
১৫ আগস্ট – বঙ্গবন্ধু সপরিবারে নিহত। খন্দকার মোশতাক আহমেদের রাষ্ট্রপতির দায়িত্বগ্রহণ। দেশে সামরিক আইন জারি। বিগত সরকারের ভাইস প্রেসিডেন্ট, ১০ জন মন্ত্রী ও ৬ জন প্রতিমন্ত্রী পুনর্বহাল। বাংলাদেশের নতুন সরকারের প্রতি পাকিস্তানের সমর্থন। (মনে হয় পাকিস্তান তৈরি হয়েই ছিল। সঙ্গে সঙ্গে স্বীকৃতি।)
১৬ আগস্ট – বাংলাদেশের নতুন সরকারকে সৌদি আরবের স্বীকৃতি। (সৌদি সরকারও তৈরি, কত তাড়াতাড়ি স্বীকৃতি দেওয়া যায়। টুঙ্গিপাড়ায় শেখ মুজিবুর রহমানের দাফন সম্পন্ন। (পুরো একদিন বঙ্গবন্ধুর মৃতদেহ পড়ে রইল। কেউ জানে না, মৃতদেহ কী করা হবে।)
২৩ আগস্ট – সামরিক আইনের অধীনে সৈয়দ নজরুল ইসলাম, এম. মনসুর আলি, তাজউদ্দিন আহমদসহ ২০ জন গ্রেফতার।
২৪ আগস্ট – মেজর জেনারেল শফিউল্লার জায়গায় মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান নতুন সামরিক বাহিনী প্রধান।
২৭ আগস্ট – ভারতের নতুন সরকারকে স্বীকৃতি দান। (ভারতের ওপর অনেক ভরসা ছিল। বাংলাদেশ তাদের সঙ্গে পঁচিশ বছরের মৈত্রীচুক্তিতে আবদ্ধ। তারাও যেন পাগল হয়ে গেল কত দ্রুত স্বীকৃতি দেওয়া যায়।)
৩১ আগস্ট – মহাচীনের নতুন সরকারকে স্বীকৃতি প্রদান। (স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিতে গণচীনের অনেক দিন লেগেছিল। এইবার আর লাগল না।)
সেলুকাস। কী বিচিত্র এই দেশ! এমন এক হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করার কেউ নেই।
ভুল বললাম, শফিকের মতো অনেকেই ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রতিবাদ করেছে। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী দেশ ছেড়ে ভারতে চলে গেলেন। মুজিববিহীন বাংলাদেশে তিনি বাস করবেন না। ভারতে তিনি কাদেরিয়া বাহিনী তৈরি করে সীমান্তে বাংলাদেশের থানা আক্রমণ করে নিরীহ পুলিশ মারতে লাগলেন। পুলিশ বেচারারা কোনো অর্থেই বঙ্গবন্ধুর হত্যার সঙ্গে জড়িত না, বরং সবার আগে বঙ্গবন্ধুকে রক্ষা করার জন্যে তারা প্রাণ দিয়েছে।
শেখ হাসিনার গৃহশিক্ষক অভিনেতা আবুল খায়ের দেশ ছেড়ে আমেরিকা চলে গেলেন।
কবি নির্মলেন্দু গুণের মাথা খারাপ হয়ে গেল। তিনি বারহাট্টায় নিজ গ্রামের বাড়িতে চলে গেলেন। তখন তার মনে হতো বঙ্গবন্ধুর আত্মা তার ভেতর ঢুকে গেছে। এই খবর সবাই পেয়ে গেছে। সবাই হন্যে হয়ে কবিকে হত্যা করার জন্যে খুঁজছে। কবিকে হত্যা করলেই বঙ্গবন্ধুর আত্মা কব্জা করা যাবে।
