লাইনে দাঁড়ানো অবস্থায় সেলিমের হাতে এবং পেটে দুইটি গুলির জখম দেখলাম। এর পর দেখলাম কালো পোশাক পরিহিত আর্মিরা আমাদের বাসার সব জিনিসপত্র লুট করে নিয়ে যাচ্ছে। তখন ডিএসপি নূরুল ইসলাম এবং পিএ/রিসিপশনিস্ট মহিতুল ইসলামকে আহত দেখি। এর পরে আমাদের বাসার সামনে একটা ট্যাংক আসে। ট্যাংক হতে কয়েকজন আর্মি নেমে ভিতরের আর্মিদের লক্ষ্য করে জিজ্ঞাসা করে ভিতরে কে আছে, উত্তরে ভিতরের আর্মিরা বলে, All are finished.’ অনুমান বেলা ১২টার দিকে আমাকে ছেড়ে দিবার পর আমি প্রাণভয়ে আমার গ্রামের বাড়ি টুঙ্গিপাড়া চলে যাই।
স্বাক্ষর
আবদুর রহমান শেখ (রমা)
মন্ত্রী সেরনিয়াবত (বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি) এবং শেখ মণি-র (বঙ্গবন্ধুর ভাগ্নে) বাড়িও একই সঙ্গে আক্রান্ত হলো। সেখানেও রক্তগঙ্গা। শেখ মণি মারা গেলেন তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীর সঙ্গে। পিতামাতার মৃত্যুদৃশ্য শিশু তাপস দেখল খাটের নিচে বসে। এই শিশুটি তখন কী ভাবছিল? কেবিনেট মন্ত্রী সেরনিয়াবত মারা গেলেন তার দশ-পনের বছরের দুই কন্যা, এগার বছর বয়সী এক পুত্র এবং মাত্র পাঁচ বছর। বয়সী এক নাতির সঙ্গে।
কাদের মোল্লা রোজ ফজরের নামাজ আদায় করে তার চায়ের দোকান খোলে। আজও তা-ই করেছে। কেরোসিনের চুলা ধরিয়ে চায়ের কেতলি বসিয়েছে, তখনই সামরিক পোশাক পরা একজন দৌড়ে এসে কাদের মোল্লার দোকানের সামনে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেলেন। রক্তে তাঁর পোশাক ভেজা। তিনি পেটের কাছে কী যেন ধরে আছেন।
হতভম্ব কাদের মোল্লা ভীত গলায় বলল, আপনি কে?
সেনা কর্মকর্তা ক্ষীণ গলায় বললেন, আমার স্ত্রীকে এই জিনিসটা পৌঁছে দিতে পারবে? তোমাকে তার জন্যে দুই হাজার টাকা দিব। আমার মানিব্যাগে দুই হাজার টাকা আছে।
কাদের মোল্লা বলল, অবশ্যই পারব। জিনিসটা কী?
সেনা কর্মকর্তা তার উত্তর দিতে পারলেন না। তার মুখ থেকে সাঁ সাঁ আওয়াজ বের হতে লাগল। এই সেনা কর্মকর্তা আমাদের পরিচিত। তিনি মেজর ফারুকের ঘনিষ্ঠজন, সুবেদার মেজর ইশতিয়াক। তিনি পেটের কাছে যে জিনিসটা ধরে আছেন তা হলো—বঙ্গবন্ধুর বাড়ি থেকে চুরি করে আনা চল্লিশ ভরি সোনার নৌকা। নিচে লেখা—‘আদমজি শ্রমিক লীগের উপহার।
কাদের মোল্লা সোনার নৌকা ও মানিব্যাগ নিয়ে সেই দিনই দেশের পথে রওনা হলো।
আনন্দ ও উত্তেজনায় তার শরীর কাঁপছে। বাইরে থেকে দেখে অবশ্যি মনে হচ্ছে তার শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। মুখ হা করা। সে মুখ দিয়ে বড় বড় শ্বাস নিচ্ছে। তার হাতে চটের ব্যাগ। এই ব্যাগে সোনার নৌকা ও মানিব্যাগ। চটের ব্যাগ কোথাও রেখে কাদের মোল্লা শান্তি পাচ্ছে না। একবার কোলে রাখছে, একবার বুকের কাছে জড়িয়ে ধরে আছে।
বাসে কাদেরের ডানপাশে বসা যাত্রী বলল, আপনার ব্যাগে কী?
কাদের মোল্লা চোখ গরম করে বলল, আমার ব্যাগে কী তা দিয়া আপনার প্রয়োজন কী?
রাগেন কী জন্যে? ব্যাগ নিয়া চাপাচাপি করতেছেন এইজন্যে জিগাইলাম।
কাদের মোল্লা বলল, চুপ। ঘুষি দিয়া নাকশা ফাটাইয়া দিব।
ঘুষি দিয়া দেখেন।
কাদের মোল্লা প্রচণ্ড ঘুষি দিয়ে সহযাত্রীর নাক ফাটিয়ে ব্যাগ নিয়ে চলন্ত বাস থেকে লাফ দিয়ে নেমে পড়ল।
সকাল সাতটা।
বাংলাদেশ বেতার ঘনঘন একটি বিজ্ঞপ্তি প্রচার করছে। উল্লসিত গলায় একজন বলছে, ‘আমি ডালিম বলছি। স্বৈরাচারী মুজিব সরকারকে এক সেনাঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে উৎখাত করা হয়েছে। সারা দেশে মার্শাল ল’ জারি করা হলো।’
দেশ থমকে দাঁড়িয়েছে।
কী হচ্ছে কেউ জানে না। কী হতে যাচ্ছে, তাও কেউ জানে না।
মানুষের আত্মার মতো দেশেরও আত্মা থাকে। কিছু সময়ের জন্যে বাংলাদেশের আত্মা দেশ ছেড়ে গেল।
মেজর জেনারেল জিয়া বঙ্গবন্ধু হত্যার খবর শুনে নির্বিকার ভঙ্গিতে বললেন, প্রেসিডেন্ট নিহত, তাতে কী হয়েছে? ভাইস প্রেসিডেন্ট তো আছে। কনস্টিটিউশন যেন ঠিক থাকে।
বঙ্গবন্ধুর অতি কাছের মানুষ তাঁর রাজনৈতিক সচিব তোফায়েল আহমেদ বসে আছেন রক্ষীবাহিনীর সদরদপ্তর সাভারে। আতঙ্কে তিনি অস্থির। রক্ষীবাহিনী আত্মসমর্পণ করায় তাকে নিয়ে পড়েছে। তারা বারবার জানতে চাচ্ছে, তোফায়েল আহমেদকে নিয়ে কী করবে? বঙ্গবন্ধুকে রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত রক্ষীবাহিনী ঝিম ধরে বসে আছে। একসময়ের সাহসী তেজি ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদও ঝিম ধরে আছেন। শুরু হয়েছে ঝিম ধরার সময়।
রাস্তায় মিছিল বের হয়েছে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, সেই মিছিল আনন্দ মিছিল।
শফিক বাংলামোটর গিয়ে এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখল। সেখানে রাখা ট্যাংকের কামানে ফুলের মালা পরানো। কিছু অতি উৎসাহী ট্যাংকের ওপর উঠে নাচের ভঙ্গি করছে।
আমার বাবর রোডের বাসার কথা বলি। বেতারে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর খবর প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে একতলায় রক্ষীবাহিনীর সুবেদার পালিয়ে গেলেন। তাঁর দুই মেয়ে (একজন গর্ভবতী) ছুটে এল মা’র কাছে। তাদের আশ্রয় দিতে হবে। মা বললেন, তোমাদের আশ্রয় দিতে হবে কেন? তোমরা কী করেছ? তারা কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, খালাম্মা, এখন পাবলিক আমাদের মেরে ফেলবে।
এই ছোট্ট ঘটনা থেকে রক্ষীবাহিনীর অত্যাচার এবং তাদের প্রতি সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ও ঘৃণাও টের পাওয়া যায়।
খন্দকার মোশতাক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়লেও ফজরের নামাজটা সময়মতো পড়তে পারেন না। তিনি অনেক রাত জাগেন বলেই এত ভোরে উঠতে পারেন না। ফজরের ওয়াক্তের নামাজ নিয়ে তিনি চিন্তিতও না। নবি-এ-করিম (দঃ) একদিন ফজরের নামাজ সময়মতো পড়তে পারেন নি। এই কারণেই সবার জন্যে ফজরের নামাজের ওয়াক্ত নমনীয় করা হয়েছে। কেউ দেরি করে পড়লেও তাতে দোষ ধরা হবে না।
