সে উঠে দাঁড়াল। মাথা নিচু করে বলল, Yes sir.
আমি বললাম, তুমি আমাকে স্যার বলছ কেন? তুমি আমার বন্ধু।
সে বলল, Now you are my respected teacher.
তার কাছে শুনলাম অনেকদিন মস্তিষ্কবিকৃতি রোগে ভুগে এখন সে সুস্থ হয়েছে। আবার পড়াশোনা শুরু করেছে।
আমি তাকে বাবর রোডের বাসায় নিয়ে গেলাম। তার জন্যে আমি অত্যন্ত ব্যথিত বোধ করছিলাম। তাকে বললাম, পড়াশোনায় সবরকম সাহায্য আমি করব। আমাকে স্যার ডেকে সে যেন লজ্জা না দেয়। আগে যেভাবে হুমায়ূন ডাকত এখনো তা-ই ডাকবে।
তিন থেকে চার মাস ক্লাস করার পর আবার সে পাগল হয়ে গেল। একদিন হতভম্ব হয়ে দেখি, সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় সে ইউনিভার্সিটিতে এসেছে। রসায়ন বিভাগের প্রতিটি রুমেই সে ঢুকে ব্যাকুল হয়ে বলছে, হুমায়ূন কোথায়? হুমায়ূন? My friend and my respected teacher হুমায়ূন?
সে শুধু রসায়ন বিভাগে না, বাবর রোডে আমার বাসাতেও হানা দিতে শুরু করল। সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিন সে আসবেই। একটি যুবক ছেলে সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে বসার ঘরে সারা দিন বসে আছে। ভয়ঙ্কর দৃশ্য।
শুধু একজন বিষয়টাকে স্বাভাবিকভাবে নিতেন, তিনি কাইয়ুম ভাই। জাব্বা জোব্বা পরা মাওলানা, পাশে নগ্ন ইংলিশম্যান। কাইয়ুম ভাইয়ের ভাবভঙ্গি থেকে মনে হতো বিষয়টা স্বাভাবিক।
১৪ আগস্ট বৃহস্পতিবার। ইউনিভার্সিটিতে কোনো ক্লাস ছিল না। হেঁটে হেঁটে বাবর রোডের বাসায় এসেছি। অর্থ সাশ্রয়ের চেষ্টা। আমি রোগাভোগা হওয়ার কারণে বাসে ঠেলাঠেলি করে কখনো উঠতে পারি না। রিকশা নেওয়ার প্রশ্নই আসে না। বাসায় ঢুকে দেখি, কাইয়ুম ভাই এবং ইংলিশম্যান পাশাপাশি বসা। ইংলিশম্যান যথারীতি নগ্ন। কাইয়ুম ভাই বললেন, হুমায়ূন, তোমরা তরকারিতে বেশি ঝাল দাও। আমি এত ঝাল খেতে পারি না। তোমার মাকে আমার জন্যে কম ঝালের তরকারি রাঁধতে বলবে।
আমি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললাম। একবার ভাবলাম বলি, অনেক যন্ত্রণা করেছেন। এখন আমাদের মুক্তি দিন। বলতে পারলাম না। যৌবনের শুরুতে আমি অনেক ভদ্র, অনেক বিনয়ী ছিলাম।
ইংলিশম্যান আমাকে দেখেই উঠে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। মনে হয় শিক্ষকের প্রতি সম্মান দেখিয়ে দাঁড়ানো। কাইয়ুম ভাইয়ের কথা শেষ হওয়ামাত্র সে গলা নামিয়ে বলল, হুমায়ূন, আমাকে একটা প্যান্ট দাও। কিছুক্ষণ আগে তোমার ছোটবোন শিখু উঁকি দিয়েছিল। তাকে দেখার পর থেকে লজ্জা লাগছে। একটা প্যান্ট দাও। প্যান্ট পরে চলে যাব।
আমার তখন দুটামাত্র প্যান্ট। একটা দিয়ে দেওয়া মানে সর্বনাশ। তারপরেও প্যান্ট এনে তাকে পরালাম। সে ইংরেজিতে বলল, তুমি আমার একমাত্র বন্ধু। আমার আর কেউ নেই। এইজন্যে তোমাকে একটা খবর দিতে এসেছি। গোপন খবর। কেউ জানে না, শুধু আমি জানি। পুরোপুরি পাগল হলে গোপন খবর পাওয়া যায়। খবরটা হচ্ছে, আগামীকাল থেকে রক্তের নদী—River full of fresh blood. Blood blood and blood. কার রক্ত দিয়ে শুরু হবে তা জানতে চাও? জানতে চাইলে তোমাকে বলব, আর কাউকে বলব না। মাছিকেও বলা যাবে না।
আমি বললাম, জানতে চাই না।
পাগল প্রলাপ বলবে তা-ই স্বাভাবিক। পাগলের কথার কোনো গুরুত্ব দেওয়ার প্রশ্ন ওঠে না।
ইংলিশম্যান গলা নিচু করে বলল, হুমায়ূন, সাবধানে থাকবে।
আচ্ছা থাকব।
দরজা জানালা বন্ধ করে খাটের নিচে শুয়ে থাকবে।
আমি বললাম, আচ্ছা থাকব।
ইংলিশম্যান প্যান্ট পরে ঘর থকে বের হলো। আমাদের বাসা পার হওয়ার পর পর প্যান্ট খুলে ছুড়ে ফেলে নগ্ন হয়ে আবার হাঁটতে শুরু করল। তার পিছু নিল কয়েকটা কুকুর। তারা ঘেউ ঘেউ করছে, ইংলিশম্যানকে কামড়ানোর ভঙ্গি করছে। ইংলিশম্যান ফিরেও তাকাচ্ছে না। পাগলরা কুকুর ভয় পায় না—তা জানতাম না। প্রথম জানলাম।
১৫ আগস্ট, শুক্রবার
১৫ আগস্ট। শুক্রবার। মেজর ফারুকের জন্মবার। তার জন্মের পরপরই ফজরের আজান হয়েছিল। কাজেই এই দিনটি তার জন্যে শুভ। তারচেয়ে বড় কথা, আন্ধা হাফেজ সিগন্যাল পাঠিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, মাহেন্দ্রক্ষণ এসেছে। এখন ফারুক ইচ্ছা করলে তার কার্য সমাধা করতে পারেন। আন্ধা হাফেজ তাঁর মঙ্গলের জন্যে একটি তাবিজও পাঠিয়েছেন, তাবিজ ফারুকের কাছে পৌঁছানো যায় নি। আল্লাহপাকের একটি বিশেষ নামও তিনি ফারুককে জানিয়েছেন। সারাক্ষণ এই নাম জপলে ফারুক থাকবে বিপদমুক্ত। নামটা হলো—ইয়া মুয়াখখরু। এর অর্থ-হে পরিবর্তনকারী’।
ফারুকের স্ত্রী ফরিদা কোরানশরিফ নিয়ে জায়নামাজে বসেছেন। শুভ সংবাদ (?) না-পাওয়া পর্যন্ত তিনি কোরান পাঠ করেই যাবেন।
ফজরের আজান হচ্ছে। মেজর ফারুকের ট্যাংকবহর বের হয়েছে।
হরিদাসের চুল কাটার দোকান
হরিদাসের চুল কাটার দোকান সোবাহানবাগে। তার দোকানের একটু সামনেই ধানমণ্ডি বত্রিশ নম্বর রোডের মাথা। সঙ্গতকারণেই হরিদাস তার সেলুনে সাইনবোর্ড টানিয়ে রেখেছে–
শেখের বাড়ি যেই পথে
আমার সেলুন সেই পথে।
সাইনবোর্ডের লেখা পথচারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, তবে হরিদাস পথচারীদের জন্যে এই সাইনবোের্ড টানায় নি। তার মনে ক্ষীণ আশা, কোনো একদিন এই সাইনবোের্ড বঙ্গবন্ধুর নজরে আসবে। তিনি গাড়ি থেকে নেমে এগিয়ে আসবেন। গম্ভীর গলায় বলবেন, সেলুনের সাইনবোর্ডে কী সব ছাতা-মাথা লিখেছিস! নাম কী তোর? দে আমার চুল কেটে দে। চুল কাটার পর মাথা মালিশ।
