রাধানাথ বললেন, জনাব, আমি আপনাকে সাবধান করতে এসেছি। আপনার সামনে মহাবিপদ।
হাত না-দেখেই আপনি আমার মহাবিপদে টের পেয়ে গেলেন? ভালো কথা, আপনি কি কোনোভাবে ইন্ডিয়ান অ্যাম্বাসির সঙ্গে যুক্ত?
জি-না জনাব। তবে ইন্ডিয়া বিশাল দেশ। এই দেশ শুধু যে অ্যাম্বাসির মাধ্যমে কাজ করে তা না। তার আরও প্রক্রিয়া আছে।
আপনি কি প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত?
হ্যাঁ। আপনাকে আমার সাবধান করার কথা। আমি তা করলাম। আপনার সবচেয়ে বড় ভরসা বাংলাদেশের মানুষ। আপনার মহাবিপদে তারা কিন্তু আপনাকে ত্যাগ করবে। আপনার পাশে থাকবে না।
বঙ্গবন্ধু বিরক্ত ও তিক্ত গলায় বললেন, ইন্ডিয়ান কারও পক্ষে বাংলাদেশের মানুষ চেনার কথা না। আমি আমার মানুষ চিনি।
জনাব। কিন্তু আমি বাংলাদেশের মানুষ। আমার বাড়ি কিশোরগঞ্জ।
আপনার কথা কি শেষ হয়েছে?
অপ্রয়োজনীয় কথা শেষ হয়েছে। প্রয়োজনীয় কথাটা বাকি আছে।
প্রয়োজনীয় কথা বলে চলে যান। আমি অসম্ভব ব্যস্ত। ভালো কথা, কই মাছ খাওয়ার নিমন্ত্রণ। কই মাছ ভাজা হচ্ছে। এক পিস খেয়ে যাবেন। এখন বলুন আপনার প্রয়োজনীয় কথা।
খন্দকার মোশতাক বিষয়ে আপনাকে সাবধান করতে এসেছি। ইনি চেষ্টায় আছেন আপনাকে সরিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে ফেডারেশন জাতীয় কিছু করার।
বঙ্গবন্ধু বিরক্ত গলায় বললেন, খন্দকার মোশতাককে আপনি চেনেন না। আমি চিনি। আমি যদি তাকে বলি, এক মাস ঘাস খেতে হবে, সে দু’মাস ঘাস খাবে।
রাধানাথ বাবু দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বললেন, আমরা সবাই ঘাস খাওয়া শিখলে দেশের খাদ্যসমস্যা সমাধান হয়ে যেত।
বঙ্গবন্ধু উঠে দাঁড়ালেন। এই আধাপাগলকে সময় দেওয়াই ভুল হয়েছে।
বঙ্গবন্ধু মন খারাপ করে ৩২ নম্বর বাড়ির উঠানে এসে দাঁড়ালেন। সঙ্গে সঙ্গে তার মন ভালো হয়ে গেল। উঠানভর্তি মানুষ। ভুখা মিছিলের মানুষ না। সাধারণ মানুষ, যারা বঙ্গবন্ধুকে একনজর দেখতে এসেছে।
স্লোগান শুরু হলো, জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু’। বঙ্গবন্ধু হাসিমুখে তাদের দিকে তাকিয়ে হাত নাড়লেন।
ধবধবে সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবি পরা অতি সুপুরুষ এক যুবক দামি ক্যামেরায় মিছিলের ছবি তুলছে। যুবক একপর্যায়ে ইশারায় বঙ্গবন্ধুর ছবি তোলার অনুমতি প্রার্থনা করল। বঙ্গবন্ধু উচ্চস্বরে বললেন, ছবি তুলতে চাইলে তুলবি। অনুমতির ধার ধারবি না।
যুবককে বঙ্গবন্ধুর পরিচিত মনে হচ্ছে। তবে তিনি তার নাম মনে করতে পারছেন না। হঠাৎ হঠাৎ তার এ রকম হয়, নাম মনে আসে না।
যুবক এসে বঙ্গবন্ধুকে কদমবুসি করল। বঙ্গবন্ধু বললেন, কই মাছ খেয়ে যাবি। কই মাছ ভাজা হচ্ছে।
যুবকের নাম ফারুক। সে এসেছে রেকি করতে। মূল আক্রমণের সময় কোন গানার কোথায় থাকবে তা জানা থাকা দরকার।
বাড়ি আক্রান্ত হলে পালাবার পথগুলো কী কী তাও জানা থাকা দরকার। ধানমন্ত্রি পুরনো বাড়িগুলোতে মেথর প্যাসেজ বলে এক কাঠার মতো ফাঁকা জায়গা থাকে। এ বাড়িতেও নিশ্চয়ই আছে। মেথর প্যাসেজ দিয়ে কেউ যেন পালাতে না পারে।
একটি বিশেষ গুজব
একটি বিশেষ গুজবের কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে আনন্দময় চাপা উত্তেজনা। স্বাধীন বাংলাদেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সমাবর্তন উৎসব হতে যাচ্ছে। উৎসবের প্রধান অতিথি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। শোনা যাচ্ছে সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ঘোষণা করা হবে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা আলাদা মর্যাদা পাবেন। তাদের বেতন বৃদ্ধি ঘটবে। সবার বাসস্থানের ব্যবস্থা করা হবে। যারা বাসা পাবেন না, তাদের এমনভাবে বাড়িভাড়া দেওয়া হবে যেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশেই বাড়ি ভাড়া করে থাকতে পারেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা হবেন অতিরিক্ত মর্যাদার শিক্ষক।
এখানেই শেষ না, আরও আছে—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই প্রস্তাব করা হবে যেন বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের আজীবন প্রেসিডেন্ট হন। বঙ্গবন্ধু এই প্রস্তাব বিনয়ের সঙ্গে মেনে নেবেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা এত কিছু পাচ্ছেন, তার বিনিময়ে কিছু তাঁদের দিতে হবে। এটাই দ্রতা এবং শিষ্টতা। শিক্ষকেরা সবাই এদিন বঙ্গবন্ধুর ‘বাকশাল’-এ যোগদান করবেন। সব শিক্ষকের বাকশালে যোগদানের অঙ্গীকারনামা একটি রুপার নৌকার খোলের ভেতর ভরে সমাবর্তন অনুষ্ঠানেই বঙ্গবন্ধুর হাতে তুলে দেওয়া হবে।
শিক্ষকদের বাকশালে যোগদানের অঙ্গীকারনামায় দস্তখত সংগ্রহ এর মধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। তাদের মধ্যে আগ্রহের কোনো কমতি দেখা গেল না। ক্ষমতার সুনজরে থাকা ভাগ্যের ব্যাপার। হাতেগোনা কিছু শিক্ষক অবশ্যি বাকশালে যোগদানে রাজি হলেন না। তারা ভীত এবং চিন্তিতমুখে সময় কাটাতে লাগলেন। এদের একজন আমি, রসায়ন বিভাগের সামান্য লেকচারার। আমি কেন উল্টা গীত গাইলাম তা নিজেও জানি না। বহুদলীয় গণতন্ত্র, একদলীয় গণতন্ত্র বিষয়গুলি নিয়ে কখনো চিন্তা করি নি। আমার প্রধান এবং একমাত্র চিন্তা লেখালেখি। তিনটি উপন্যাস বের হয়ে গেছে। চতুর্থ উপন্যাস ‘অচিনপুর’ রাত জেগে লিখছি। আমাকে ডেকে পাঠালেন অধ্যাপক আলী নওয়াব। ছাত্রাবস্থায় তাকে যমের মতো ভয় পেতাম। শিক্ষক হয়ে সেই ভয় কাটে নি, বরং বেড়েছে। ছাত্রাবস্থায় অনেকের ভিড়ে লুকিয়ে থাকা যেত। এখন তা সম্ভব না। তার সঙ্গেই ফিজিক্যাল কেমিস্ট্রি প্রাকটিক্যাল ক্লাস নেই। আমাকে সারাক্ষণ তার নজরদারিতে থাকতে হয়।
