রানু ভাবতেও পারেনি। অপলা সত্যি সত্যি টগরকে নিয়ে রওনা হবে। এ জীবনে আমরা অনেক কিছুই করতে চাই কিন্তু শেষ পর্যন্ত করা হয়ে ওঠে না। কল্পনাকে কাজে লাগানো কঠিন। রানু কলেজে উঠে একবার ঠিক করেছিল একা একা শোনাবো। কিন্তু রানু চুপচাপ। সে কোনো রকম আগ্রহ দেখাচ্ছে না। অপলা যখন বলল, টগরের জন্যে কী গরম কাপড় নেব। আপা? রানু হেসে বলল, এই গরমে গরম কাপড় কেন?
তাহলে থাক। নেবার দরকার নেই। তোমাকে ছেড়ে থাকতে পারবে কিনা কে জানে? হয়ত রাতে উঠে কাঁদতে শুরু করবে।
কাঁদবে না।
আমারও মনে হয় কাঁদবে না। আমার কী মনে হয় জান আপা? আমার মনে হয়। বাবাকে ছেড়ে आअgङछ्रे bाङ्ग्रेहद न्ा।
আসতে না চাইলে রেখে আসিস।–
অপলা ঘাড় ঝাঁকিয়ে বলল, তাহলে কিন্তু আমি সত্যি সত্যি রেখে আসব। রানু গম্ভীর হয়ে বলল, বললাম তো রেখে আসিস।
কিন্তু তুমি মুখ কালো করে বলছি। এটা রাগের বলা। এই কথাটি তুমি কী হাসি মুখে বলতে পারবে? দেখি হাসতে হাসতে বল তো?
রানু কিছু বলেনি। বিরক্ত হয়েছে। ইদানীং অপলা তাকে বেশ বিরক্ত করছে। যা সে পছন্দ করে না তা করতে চেষ্টা করছে। ইচ্ছা করেই করছে বোধ হয় কেন সবাই এমন বৈরী হয়ে উঠছে?
অপলা যাবে সকাল সাড়ে এগারোটায়। রানু অফিসে গেল না। খুব ঘন ঘন অফিস কামাই হচ্ছে। এখন পর্যন্ত এ নিয়ে কেউ তাকে কিছু বলছে না। কিন্তু এক সময় হয়ত বলবে। সিদ্দিক সাহেব মিষ্টি মিষ্টি গলায় খুব কড়া কড়া কিছু কথা শুনিয়ে দেবেন। এই লোকটিও এখন তার পছন্দ হচ্ছে না। পছন্দ না হবার কোনো কারণ নেই। সিদ্দিক সাহেব মানুষটি ভদ্র, কাজ বোঝেন এবং প্রচুর কাজ করেন। সমস্যাটি কোথায় তাহলে? এ রকম হচ্ছে কেন রানুর?
টগর সকাল থেকেই বেশ গম্ভীর। বারবার তার নিজের ছোট্ট সুটকেস নিয়ে নাড়াচাড়া করছে। রানু ভেবেছিল শেষ মুহূর্তে টগর মত বদলাবে। মাকে ছেড়ে যেতে চাইবে না। কিন্তু টগরের ভাবভঙ্গি সেরকম নয়। সে মাকে কিছুটা এড়িয়ে চলছে। সম্ভবত তার ধারণা হয়েছে মা হঠাৎ বলবে, তোমার যাবার দরকার নেই, টগার। তুমি চলে গেলে আমি একলা হয়ে যাব। রাতে ভয় লাগবে। তুমি থেকে যাও।
টগর অপলার পাশে পাশে ঘুরছে। মাঝে মাঝে আড়চোখে দেখছে মাকে। চোখে চোখ পড়ামাত্র মাথা ঘুরিয়ে নিচ্ছে। যেন সে মাকে চিনতে পারছে না। ওরা রওনা হবার আগে আগে রানু টগরকে নিয়ে বারান্দায় চলে গেল।
টগর খুব সাবধানে থাকবে কেমন? একা একা পুকুরে যাবে না। আচ্ছা?
টগর মাথা নাড়ল। সে যাবে না।
ঠিকমত খাওয়া দাওয়া করবে।
করব।
বাবার জন্যে কি নিয়ে যাচ্ছি টগর?
টগর অবাক হয়ে তাকাল মার দিকে? ঠিক এই প্রশ্ন সে আশা করেনি।
বাবার জন্যে কিছু একটা নিয়ে যাওয়া উচিত না? সে নিশ্চয়ই জিজ্ঞেস করবে কি আনলে আমার জন্যে? তখন কি বলবে তুমি?
কি নেব?
তুমি ভেবে-টেবে বের কর কি নিতে চাও।
তুমি বলে দাও।
এমন কিছু নিতে হবে যাতে সে খুশি হয়। ভেবে-টেবে বের করতে হবে কি নিলে খুশি হবে। এসো আরো ভাবি। বোকা ছেলে এমন করে কেউ বুঝি ভাবে? ভাবতে হয় গালে হাত দিয়ে।
টগর সত্যি সত্যি গালে হাত দিল। রানু হেসে ফেলল। চমৎকার একটি ছবি। ছেলে গালে হাত দিয়ে ভাবছে। বাবার জন্যে কি নেয়া যায়? এর মধ্যে কোথায় যেন মন খারাপ করার মত একটা ব্যাপার আছে।
রানু বলল,
আমার জন্যে খারাপ লাগবে না?
লাগবে।
তুমি কাঁদবে না। আমার জন্যে?
হুঁ। কাঁদবি।
তাহলে একটু কাঁদ আমি দেখি।
টগর ফিক করে হেসে ফেলল। ছোট্ট ছোট্ট হাতে জড়িয়ে ধরল মাকে। রানু একটা নিঃশ্বাস ফেলল। মনে হচ্ছে দীর্ঘদিন সে এই শিশুটিকে দেখবে না। আর সে ফিরে আসবে না মার কাছে।
রানু ভেবেছিল ঘর থেকেই সে তাদের বিদেয় দেবে। কি মনে করে সে ওদের ট্রেনে উঠিয়ে দিতে গেল। ট্রেন ছাড়বার আগে অপলা বলল, তুমি একা একা ও বাড়িতে থাকতে পারবে না। আপা। তুমি খালার কাছে চলে যাও। খালার সঙ্গে থাক। রানু গভীর স্বরে বলল, আমাকে নিয়ে ভাবতে হবে না। তুই টগরকে চোখে চোখে রাখবি। পানিতে যেন না নামে।
কোনো ভয় নেই। আপা।
পৌঁছেই টেলিগ্রাম করবি।
টেলিগ্রাম পৌঁছবার আগে তো আমরাই চলে আসব।
তবু করবি।
ঠিক আছে করব।
রানু হঠাৎ লক্ষ্য করল টগর কাঁদছে। অপলা বিরক্ত হয়ে বলল, এই কাঁদছিস কেন? টগর জবাব দিল না। শাড়ির আঁচলে সে মুখ ঢেকে রেখেছে। বারবার তার ছোট্ট শরীর কেঁপে কেঁপে উঠছে। অপলা বলল, মার জন্যে খারাপ লাগছে?
হুঁ।
তাহলে যাবার দরকার নেই। তুই থেকে যা।
টগরের কান্না আরো বেড়ে গেল। গার্ড হুঁইসেল দিয়েছে। গাড়ি চলতে শুরু করবে অপলা। বিব্রত মুখে বলল, আপা, তুমিও উঠে এসো না। প্লিজ।
রানু জবাব দিল না। দাঁড়িয়ে রইল। এবং এক সময় ট্রেন ছেড়ে দিল। তার নিজের চোখেও কী পানি আসছে? আসছে বোধ হয়। সব কেমন ঝাপসা লাগছে। রানুসান গ্লাস চোখে দিল; জল-ভরা চোখ কাউকে দেখাতে ইচ্ছা করে না। ট্রেন চলে যাবার পরও সে কিছুটা সময় ঘুরে বেড়াল স্টেশনে। সিলেট মেল এসে থেমেছে। ব্যস্ত হয়ে যাত্রীরা নামছে। কত বিচিত্র ধরনের মানুষ আছে এই পৃথিবীতে। একজন মানুষের সঙ্গে অন্য জনের কোন মিল নেই। ছোট একটি বাচ্চা গর্বিত ভঙ্গিতে গট গট করে হাঁটছে। তার মা হাত ধরতে চাচ্ছে। সে কিছুতেই হাত ধরতে দেবে না। কি গম্ভীর শিশুটির চলার ভঙ্গি। টেগরের মত হয়েছে বোধ হয়। রানুর চোখ আবার ভিজে উঠছে। মন দুর্বল হয়ে গেছে। ভাল কথা নয়।
