অপলা ফিরল কাক ভিজা হয়ে। কাগজ কিনতে গিয়েছিল। কিন্তু সঙ্গে কোনো কাগজপত্র দেখা গেল না। সে গুন গুন করতে করতে বাথরুমে কাপড় বদলাতে গেল। বাথরুম থেকেই বলল, ক্যাটস এন্ড ডগস বৃষ্টি নেমে গেছে তাই না। আপা? আমি আজ অবশ্যি ইচ্ছা করেই ভিজলাম। যখন খুব তেজে বৃষ্টি নামল তখন রিকশার হুঁড ফেলে দিলাম। রাস্তায় যারা ছিল সবাই তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিল আমাকে পাগল ভেবেছে বোধ হয়।
রানু তার কথার কোনো জবাব দিল না। মেয়েটি দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এটা ঠিক সহজভাবে গ্রহণ করা মুশকিল। তাকে বললে কেমন হয়–অপলা তুই এরকম হয়ে যাচ্ছিস কেন?
অপলা মোমবাতি খুঁজে বের করল। যেন কিছুই হয়নি। এমন ভঙ্গিতে পড়তে বসল। পড়া আগালো না। এক জায়গায় বসে সে পড়তে পারে না। ঘুরে ঘুরে পড়তে হয়। বই বন্ধ করে সে টগরের সঙ্গে গল্প করতে বসল। পাশেই রানু আছে। সে দিকে সে কিছুমাত্র লক্ষ্য করছে না। যেন এ ঘরে মানুষ নামের কেউ নেই।
ভূতের গল্প শুনবি টগর?
হুঁ।
হুঁ কি? ভাল করে বল। বল, হ্যাঁ, শুনব।
হ্যাঁ শুনব।
ভয় পেয়ে কাঁদবি না তো?
না। কাঁদব না।
সত্যি ভূতের গল্প শুনবি না মিথ্যা ভূতের গল্প?
সত্যি ভূতের গল্প।
অপলা হারিকেনের আলো আরো খানিকটা কমিয়ে দিল। রানু লক্ষ্য করল টগর অপলার কোমর জড়িয়ে কোলে মাথা গুজে শুয়ে আছে। অপলা টগরের মাথায় বিলি কাটতে কাটতে গল্প করছে। রানু কি ঈর্ষা বোধ করছে? করছে বোধ হয়। তার ইচ্ছা করছে টগরকে উঠিয়ে নিয়ে যেতে। এই সন্ধ্যাবেল কিসের ভূতের গল্প।
বৃষ্টি কমে এসেছিল। রাত দশটার দিকে আবার প্রবল বেগে বর্ষণ শুরু হল। বাতাস বইতে লাগল। প্রচণ্ড শব্দে। ঝড় শুরু হল নাকি? দূর থেকেই হৈচৈ চিৎকারের শব্দ আসছে। বস্তীর কাঁচা ঘরবাড়ি কিছু উড়ে গেছে নিশ্চয়ই। অপলা বলল, কেমন ভয় ভয় লাগছে আপা। পুরুষ কেউ নেই।
পুরুষ মানুষ থাকলে কি করত? ঝড় থামিয়ে দিত?
তা দিত না, তবে সাহস পাওয়া যেত। ঘরে কোনো পুরুষ মানুষ না থাকলে কেমন একা একা লাগে।
এরকম মেয়েলি ধরনের কথা বলিস না তো, গা-জ্বালা করে।
মেয়ে মানুষ মেয়েলি ধরনের কথাই তো বলব? তোমার নিজেরও কিন্তু আপা ভয় ভয় করছে, শুধু মুখে স্বীকার করছ না।
রানু ঘুমুতে গিয়ে দেখল টগর বিছানায় নেই। আবার অপলার কাছে চলে গিয়েছে। মশারি ফেলতে গিয়ে এমন এক পলকের জন্যে মনে হল ঝড়-বৃষ্টির রাতে একজন কেউ পাশে থাকলে ভালই হয়।
আপা।
কি?
তোমার তো একা এক ভয় লাগবে। সবাই মিলে আজ একসঙ্গে ঘুমুলে কেমন হয়?
আমার এত ভয়-টয় নেই, তুই ঘুমুতে যা। আর শোন একটা কথা, বানিয়ে বানিয়ে টগরকে চিঠি খেলার দরকার নেই।
বেচারা তার বাবার জন্য মন খারাপ করে থাকে।
থাকতে থাকতে এক সময় অভ্যাস হবে। তখন আর খারাপ লাগবে না।
অভ্যাস হবার দরকার কি? বাবার জন্যে মন খারাপ হওয়াটা কি খারাপ?
গত তিন মাসে যে বাবার ছেলের কথা একবারের জন্যেও মনে হয়নি, তার জন্যে মন খারাপ হওয়া ঠিক না।
একবারও ছেলের কথা মনে হয়নি সেটা তুমি কিভাবে বলছি? চিঠি লিখেননি তার মানে এই নয় যে…
তোর কাছে মানে শুনতে চাই না।
শোন আপা, আমি যদি টগরকে নিয়ে দুলাভাইয়ের গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে যাই তোমার আপত্তি আছে? মেডিকেল কলেজ দু’দিন বন্ধ থাকবে। সোমবার এবং বুধবার। মঙ্গলবার মিস করলে তিন দিন ছুটি পাওয়া যায়। যাব?
রানু অনেকক্ষণ কোনো কথা বলতে পারল না। বলে কি এই মেয়ে!
কি আপা যাব? যাওয়া কোনো সমস্যা হবে না। ট্রেনে যাব তার পর.
ছুটি হয়েছে, নিজের বাড়িতে যা।
নিজের বাড়িতে আমার আছে কে বল? তা ছাড়া এক দুদিনের জন্যে গিয়ে হবেটা কি! গরমের ছুটিতে তো এমনিতেই যাব। যাব না?
অপলা রানুর পাশে বসল। সে কী আগের চেয়ে রূপবতী হয়েছে, না হারিকেনের অস্পষ্ট আলোয় তাকে সুন্দর লাগছে? এত লম্বা চুল ছিল অপলার তা আগে লক্ষ্য করা যায়নি। অপলা। হালকা গলায় বলল, তোমার সঙ্গে আমার অনেক মিল আছে আপা। তোমার কোথাও কেউ নেই, আমারো নেই। এটা এমন কোনো হাসির কথা নয়, কিন্তু অপলা হাসল। রানু বলল, অনেক অমিলও আছে।
তা আছে। স্বভাব-চরিত্র দুজনের দুরকম।
তোর স্বভাব-চরিত্র অবশ্যি দ্রুত বদলাচ্ছে।
তোমারও বদলাচ্ছে। যত দিন যাচ্ছে তুমি ততই কঠিন হচ্ছি। এটা ঠিক না। আপা। নিজের কষ্ট পাঁচছ। অন্যকেও কষ্ট দিচ্ছি।
অপলা ছোট একটি নিঃশ্বাস ফেলল। উঠে দাঁড়াল। রানু কিছুই বলল না। আপলা দরজার কাছে গিয়ে থমকে দাঁড়াল এবং শান্ত স্বরে বলল, আমি ঠিক করেছি। আমি যাব। টগরকে তুমি আমার সঙ্গে না দিতে চাও দিও না। আমি একাই যাব।
হঠাৎ তোর এত আগ্রহের কারণ কি?
আমি দুলাভাইয়ের একটি চিঠি পেয়েছি। তিনি আমাকে যাবার জন্যে লিখেছেন।
চিঠি কবে পেয়েছিস?
গতকাল।
সেখানে কী লেখা আছে টগরকে সঙ্গে নিয়ে যাবার জন্যে?
না নেই।
তুই একাই যা। ওকে নেবার দরকার নেই।
আপা, তুমি কী চিঠিটি পড়তে চাও?
না। আমি পড়তে চাই না। অন্যের চিঠি পড়ার অভ্যেস আমার নেই। ব্যক্তিগত চিঠি আমি পড়ি না।
পড়তে চাইলে পড়তে পার। তোমার টেবিলের উপর রেখে এসেছি। টগরকে আমার সঙ্গে যেতে দাও। আপা। প্লিজ!
অপলা ঘুমুতে গেল। অনেক রাত পর্যন্ত তার ঘুম এল না। সে খানিক্ষণ কাদল। কত অদ্ভুত ঃখ কষ্ট আছে মানুষের। এরকম সুন্দর একটি রাতে কেউ কাঁদে? রানু হঠাৎ ঠিক করল টগরকে সে অপলার সঙ্গে যেতে দেবে।
