একা মানে?
একা মানে একা। অল বাই মাইসেলফ। বাবা আর আমি আমাদের দুজনের যাবার কথা ছিল। এখন ঠিক হয়েছে বাবা যাবেন না। আমি একা যাব। একটা স্লিপিং বার্থ রিজার্ভ করা আছে।
তিথি!
বল।
আমি কি যেতে পারি তোমার সঙ্গে? প্রথমত একা একা তুমি রাতের ট্রেনে যাবে ভাবতেই আমার খারাপ লাগছে। দ্বিতীয়ত সারারাত গল্প করতে করতে যাওয়ার আলাদা আনন্দ আছে।
সারারাত গল্প করার আনন্দতো অনেক পাবে।
তা পাব, তবে সেটা হবে বিয়ের পরে। বিয়ের আগে সারারাত গুলি করার আনন্দ অন্য রকম।
তুমি জানলে কি ভাবে?
অনুমান করছি। কল্পনায় বুঝতে পারছি। প্রকৃতি আমাকে কল্পনা করার অসাধারণ ক্ষমতা দিয়েছেন। তোমার ট্রেন কটায়?
রাতে সাড়ে দশটায়।
আমি ঠিক দশটার সময় কমলাপুর রেল স্টেশনে উপস্থিত থাকব।
আরে না না। অসম্ভব।
শোন তিথি, নেপোলীয়ান যখন তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে আল্পস পর্বতমালার সামনে এসে দাড়ালেন এবং ঠিক করলেন তিনি তার সৈন্যবাহিনী নিয়ে পর্বতমালা অতিক্রম করবেন তখন তার সেনাপতিরা বলল, এটা অসম্ভব। তাঁর উত্তরে তিনি বললেন, অসম্ভব হচ্ছে এমন একটি শব্দ যা শুধু বোকাদের অভিধানেই পাওয়া যায়।
নেপোলীয়ানের পক্ষে যে কথা বলা সম্ভব তা-কি তোমার পক্ষে বলা সম্ভব? তুমিতো নেপোলীয়ান না।
কে বলল আমি নেপোলীয়ান না। আমি অবশ্যই নেপোলীয়ান। আমি ঠিক দশটায় ট্রেনে চেপে বসব। সারারাত গল্প করব। তুমি মনে করে ফ্লাস্ক ভর্তি করে চা নেবে।
মারুফ শোন, দয়া করে এই কাজটা করবেন। প্লীজ। প্লীজ।
স্টেশনে দেখা হবে।
মারুফ টেলিফোন নামিয়ে রাখল। আজ তার মনটা খুব ভাল। আজিজ সাহেবের কাছ থেকে দশ হাজার টাকা নেয়া হয়েছে। নীলা পাথর কেনার টাকা। বিয়েতে কাজে লাগবে। পরে সুন্দর কোন গল্প বলে আজিজ সাহেবকে ঠাণ্ডা করলেই হবে।
জাফর সাহেব মেয়েকে ট্রেনে তুলে দিতে এসেছেন
জাফর সাহেব মেয়েকে ট্রেনে তুলে দিতে এসেছেন। তিথি অস্বস্তিতে মরে যাচ্ছে যদি মারুফের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। বাবাকে তাহলে সে কি বলবে? বাবাই বা কি মনে করবেন? তিথি ভয়ে ভয়ে চারদিক দেখছে–মারুফকে দেখা যাচ্ছে না। এত মানুষের মাঝে চট করে দেখা পাওয়াও মুশকিল। কোথাও নিশ্চয়ই আছে। দু নম্বর প্ল্যাটফরম থেকে ট্রেন ছাড়বে। সে নিশ্চয়ই দু নম্বর প্ল্যাটফরমে ঘোরাঘুরি করছে। তিথিকে দেখতে পেয়ে হাসি মুখে এগিয়ে আসবে। তখন তিথি তার বাবাকে কি বলবে?
দু নম্বর প্লাটফরমেও মারুফকে দেখা গেল না। তবু তিথির অস্বস্তি দূর হল না। যে কোন মুহুর্তে সে উদয় হতে পারে। জাফর সাহেব যখন মেয়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন তখনই শুধু তিথি খানিকটা স্বস্তি বোধ করল। মারুফ এখন এসে উপস্থিত হলে তেমন অসুবিধা হবে না। নুরুজ্জামানকে সামলানো যাবে। সরল ধরনের মানুষ, এদের কে যা বলা হয় তাই তারা বিশ্বাস করে। সে সাড়ে নটায় বাসায় ফিরেছে তাকে বলা হয়েছে সিলেট যেতে হবে, সে সঙ্গে সঙ্গে ব্যাগ গুছিয়ে প্রস্তুত। একবার জিজ্ঞেসও করে নি–কেন যেতে হবে? কদিন থাকতে হবে? হলুদ রঙের একটা কোট তার গায়ে। কোর্টের বোতামগুলি মেরুন রঙের। কোন সুস্থ মাথার মানুষ এ রকম একটা কোট গায়ে দিতে পারে? সে আবার সুযোগ পেলেই তিথিকে কোটি সম্পর্কে জ্ঞান দিচ্ছে।
রাস্তার সাইডে বিক্রি করছিল। হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে রেখেছে। একটা দুইটা না শত শত কোট। আমি শুধু শুধু জিজ্ঞেস করলাম–দাম কত? বলল দুশ টাকা। আমি চলে আসছি, দোকানদার বলল, চলে যাচ্ছেন কেন, একটা দাম বলেন তারপর চলে যান। যদি দরে বনে দিয়ে দিব। না বনলে নাই। আমি বললাম, পঞ্চাশ টাকা। কেনার ইচ্ছা নাই এই জন্য বললাম, পঞ্চাশ। আগে একবার স্যান্ডেল কিনে ঠক খেয়েছিলাম। তাই বুদ্ধি করে এমন কম দাম বললাম। সে সাথে সাথে পলিথিনের ব্যাগের ভেতর ঢুকায়ে কোট দিয়ে দিল। পরলাম এমন বিপদে না কিনেও পারি না। নিজের মুখে দাম বলেছি। জিনিসটা কেমন হয়েছে?
ভাল।
ঠিক বলেছেন–ভাল। খুব গরম। গরমের চোটে ঘাম ছুটেছে।
তিথি অনেক কষ্টে হাসি থামিয়ে বলল, গরমের মধ্যে কোট গায়ে দিয়েছেন ঘামতো ছুটবেই।
এখন গরম তবে সিলেট শীতের জায়গা। তখন দরকার লাগবে। তাছাড়া ট্রেন ছাড়লেও শীত লাগবে।
তিথির বলতে ইচ্ছা করছে–নুরুজ্জামান সাহেব তাকিয়ে দেখুন একমাত্র আপনিই কোট পরে আছেন।
মারুফ যে শেষ পর্যন্ত আসবে না এটা তিথি ভাবতে পারে নি। ট্রেন ছাড়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত সে আশা করে রইল সে দেখবে মারুফ ছুটতে ছুটতে আসছে। পরনে। সুন্দর একটা হাওয়াই সার্ট। মাথার চুল এলোমেলো। সে বোধহয় কখনোই চুল আঁচড়ায় না। বিয়ের পর একটা কাজ তিথি অবশ্যই করবে। মারুফের চুল আঁচড়ে দেবে।
ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে। জানালার কাছে তিথি একা বসে আছে। কামরার দরজাটা খেলা। দরজা বন্ধ করলেই সে একা হয়ে যাবে। তিথি এখনো দরজা বন্ধ করছে না। এখনো সে আশা করে আছে দেখা যাবে হুট করে দরজা দিয়ে মারুফ ঢুকছে। এরকমতো হতেই পারে।
কামরার দরজা তিথি ইচ্ছা করেই খোলা রেখেছে। তার মন বলছে মারুফ ট্রেনে উঠেছে তাকে খুঁজে পাচ্ছে না। ফাস্টক্লাস কামরাগুলিতে সে খুঁজবে। দরজা খোলা না রাখলে সে বুঝবে কি করে তিথি এই খানেই আছে।
ট্রেনের এটেনডেন্ট উঁকি দিল। হাতে কম্বল এবং বালিশ। দুটিই বেশ পরিস্কার। সাধারণত ট্রেনের এটেনডেন্টদের চেহারা এবং আচার আচরণ রুক্ষ ধরনের হয়ে থাকে। এর তেমন না। এর বয়স অল্প। সুন্দর চেহারা। কথা বলছে ভদ্র ও বিনীত ভঙ্গিতে।
