তুমি কি সত্যি বাবলুর বিয়ে দিতে চাও?
বুঝতে পারছি না।
সত্যি সত্যি যদি চাও তাহলে পান্নাভাবীকে বলতে পারি। বিয়ে-টিয়ের ব্যাপারে তাঁর দারুণ উৎসাহ। দেখবে, এক সপ্তাহের মধ্যে বিয়ে ঠিকঠাক হয়ে যাবে। বলব উনাকে?
না থাক। মেয়েটার জীবন নষ্ট করে দেবে। দরকার কি?
আমি মনে মনে হাসলাম। জীবন নষ্ট হবার হলে নষ্ট হবেই। কোন হিসাব নিকাশ কাজে লাগবে না। মামুন ছেলে হিসেবে কি চমৎকার ছিল না? সুন্দর, সুপুরুষ। কি প্রচণ্ড প্রাণশক্তি! সে কথা বলতে শুরু করলে মুগ্ধ হয়ে শুনতে হবে। সে যখন যা বলবে তখন মনে হবে এটাই সত্যি। টুকুনকে সে আমার সঙ্গে দেখা করতে দিচ্ছে না। ভয়ংকর একটা অন্যায় সে করছে কিন্তু কেন করছে সেই যুক্তি যখন সে দেয় তখন মনে হয় সে যা করছে ভালই করছে। ব্যাপারটা এরকমই হওয়া উচিত।
দক্ষিণের বারান্দা থেকে পান্নাভাবী ডাকলেন –রাত্রি, এই রাত্রি।
আমি তাকালাম। পান্নাভাবী বললেন, তাড়াতাড়ি একটু আস তো। তাঁর গলার স্বরে মনে হওয়া স্বাভাবিক যে ভয়ংকর কিছু ঘটে যাচ্ছে। যদিও কিছুই ঘটছে না। পান্নাভাবীর গলার স্বরে থাকে সার্বক্ষণিক উদ্বেগ। এই উদ্বেগের কোন ভিত্তি নেই। আমি দোতলার দিকে রওনা হলাম।
পান্নাভাবীর বসার ঘরে নাজমুল ভাই। তিনি চাদর গায়ে সোফায় বসে আছেন। তার হাতে বই বা প্যাড এবং কলম থাকার কথা, এখন কিছুই নেই। তাঁকে দেখে মনে হচ্ছে সুন্দর এই সকালে তিনি ভয়ংকর কোন দুঃস্বপ্ন নিয়ে বসে আছেন। আমি বললাম, কেমন আছেন নাজমুল ভাই?
তিনি কোন শব্দ করলেন না। তাঁর দৃষ্টি মেঝেতে নিবদ্ধ। পান্নাভাবী বললেন, তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করেছে আর তুমি পাথরের মূর্তি হয়ে গেছ। ব্যাপার। কি? কিছু একটা বল।
নাজমুল ভাই কিছু বললেন না, আরো একটু গুটিয়ে গেলেন। পান্নাভাবী বললেন, রাত্রির সঙ্গে দিনের আলোয় কথা বলতে তোমার এত লজ্জা কেন? বেচারীর নাম রাত্রি বলে যে তার সাথে শুধুই রাত্রে কথা বলতে হবে তা তো না। তোমার অস্বাভাবিক আচরণ সহ্য করা আমার পক্ষে অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। তুমি রাত্রির দিকে তাকিয়ে একটু হাস তো।
নাজমুল ভাই ছোট্ট করে নিঃশ্বাস ফেললেন। আমি বললাম, আমাকে কি জন্যে ডেকেছেন ভাবী?
শোবার ঘরে আস। বলছি।
জরুরী কিছু?
জরুরী তো বটেই। খুবই জরুরী।
পান্নাভাবী আমার হাত ধরে আমাকে তাঁর শোবার ঘরে নিয়ে এসে দরজা বন্ধ করে দিলেন। আমি বললাম, আপনার জরুরী কথার আগে আগে আমি একটা জরুরী কথা বলে নেই। পরে ভুলে যাব –ভাবী, আপনার সন্ধানে কি ভাল কোন মেয়ে আছে? মিষ্টি স্বভাবের হাসি-খুশি মেয়ে।
কেন?
বাবলুর বিয়ে দেব।
মেয়ে তো একটা না, গণ্ডায় গণ্ডায় আছে। ভাল ভাল মেয়ে আছে। একটা মেয়ে আছে — জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটিতে ইংরেজিতে এম. এ. পড়ছে। অনার্সে ফার্স্ট ক্লাস থার্ড হয়েছিল।
আমি অবাক হয়ে বললাম, এরকম একটা মেয়ে বাবলুর মত ছাগলকে বিয়ে করবে কেন?
ছাগল বলছিস কেন? সুন্দর চেহারা। ঢাকা শহরে এতবড় বাড়ি। সংসারের দায়দায়িত্ব কিছুই নেই।
আই এ, ফেল বখা একটা ছেলে। নেশাভাং করছে।
পুরুষ মানুষ তো গাছ না –পুরুষ মানুষ একটু এদিক-ওদিক করে। বিয়ের পর নেশাভাং না করলেই হল। আর আই এ. ফেল এইটা বলার দরকার কি? কেউ তো আর সার্টিফিকেট পরীক্ষার জন্যে আসছে না? মেয়ের বাবা-মারা কখনো ছেলের পরীক্ষার সার্টিফিকেট দেখে না। তারা দেখে বাড়িঘর। তুমি এখন আমার কথা শোন।
বলুন শুনছি।
রাণীর ইউরিন টেস্ট করতে দিয়েছি। আজ রেজাল্ট দেবে। আমি আনতে যাচ্ছি।
ও আচ্ছা।
পান্নাভাবীর চোখ চকচক করতে লাগল। মহিলা কি অসুস্থ? সুস্থ কোন মেয়ে এমনভাবে কথা বলে না। পান্নাভাবী গলা নামিয়ে প্রায় ফিস ফিস করে বললেন –টেস্ট পজিটিভ হলে মজা দেখবে। আজই বিয়ে পড়িয়ে দেব। চাকরাণী নিয়ে বাসর করবে। আমি পাশেই বসে থাকব।
আমি বললাম, এইটাই কি আপনার জরুরী কথা?
হ্যাঁ, এইটাই জরুরী কথা। তোমার শোনা দরকার।
আমার শোনা দরকার কেন?
আমার আপনজন তো কেউ নেই। তোমাকে ছোটবোনের মত দেখি এই জন্যেই বলা।
পান্নাভাবী আমাকে ঘরে রেখেই কাপড় বদলাতে শুরু করলেন। এই তাঁর আর এক অদ্ভুত মানসিকতা। ব্যাপারটা এর আগেও কয়েকবার ঘটেছে। পরনে শুধু পেটিকোট রেখে তিনি আর সবকিছু খুলে ফেলেন এবং বেশ স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই কথাবার্তা বলতে থাকেন। যেন কাপড় পরার ব্যাপারটা তিনি ভুলে গেছেন। অর্ধনগ্ন অবস্থায় চুল আঁচড়াতে বসেন যেন কাপড় পরার আগে চুল আঁচড়ানোটা সেরে ফেলা দরকার। পান্নাভাবী এটা কেন করেন? তাঁর শরীরটা যে খুব সুন্দর এটা কি আমাকে দেখাতে চান? তার কি কোন প্রয়োজন আছে?
পান্নাভাবী, আমি যাই।
যাই যাই করছ কেন? বোস না, কাপড়টা পরি, তারপর একসঙ্গে বের হই।
কাপড় পরতে ভাবীর অনেক সময় লাগল। কোন শাড়িই পছন্দ হয় না। একটা পছন্দ হল, সেটা খানিকটা কুঁচকে আছে। রাণীকে ডাকলেন শাড়ি ইস্ত্রি করে দেবার জন্যে। তিনি শুধু পেটিকোট পরে আমার সঙ্গে গল্প করছেন। রাণী শাড়ি ইস্ত্রি করছে। শাড়ি ইস্ত্রি করতে করতেই সে একবার মুখ নিচু করে হাসল। পান্নাভাবী থমথমে গলায় বললেন –হাসছিস কেন? কেন হাসছিস? তুই ভেবেছিস কি নষ্টামি করে এত সহজে পার পেয়ে যাবি? এত সহজে তোকে আমি ছেড়ে দেব? কত ধানে কত চাল তোকে বুঝিয়ে ছাড়ব।
