থ্যাংকস।
সব কিছু তোমাকে বলে বলে দিতে হয়। নিজ থেকে তুমি কিছুই কর না। কি যে অদ্ভুত মানুষ! তোমার বন্ধুকে কাল সকালেই কিন্তু দাওয়াত করে আসবে। পারবে না?
পারব।
তাকে জন্মদিনের কথা বলার দরকার নেই। জন্মদিন শুনলেই একগাদা উপহার কিনে হুলস্থূল করবে। তোমার বন্ধুর যা খরুচে স্বভাব। আমার অবশি খরুচে স্বভাবের মানুষই ভাল লাগে। টাকা তো খরচের জন্যে, জমা করে রাখার জন্যে না। তোমার যদি টাকা হয় তাহলে তোমার স্বভাব কেমন হবে? তুমিও কি খরুচে স্বভাবের হবে?
নায়লা গড় গড় করে কথা বলে যাচ্ছে। জামান শুনছে। মন দিয়েই শুনছে, উত্তর দিচ্ছে না। যে ভয়াবহ ঘটনা তার জীবনে ঘটে গেল সেটা নায়লাকে তার বলা দরকার, কিন্তু বলতে পারছে না। ছেলের জন্মদিন নিয়ে খুশিমনে কত পরিকল্পনা করছে সব ভেস্তে যাবে। তাছাড়া নায়লা ছোটখাট দুর্ঘটনাতেই ঘাবড়ে যায়। বড় কিছু ঘটলে কি হবে কে জানে! নায়লাকে যা বলার ধীরে সুস্থে বলতে হবে।
তুমি আমার কথা কিছুই শুনছ না।
শুনছি তো।
না শুনছ না। তুমি অন্য কিছু ভাবছ। কি ভাবছ?
কিছু ভাবছি না।
আচ্ছা শোন, তুমি কি এই মাসে আমাকে বাড়তি কিছু টাকা দিতে পারবে? আমি সংসারের টাকা জমিয়ে জমিয়ে তোমার টাকা ফেরত দেব। পারবে?
কত টাকা?
এক হাজার টাকা।
জামান মনে মনে বড় একটা নিঃশ্বাস ফেলল। এক হাজার টাকা সে দিতে পারবে। তাকে তিন মাসের বেতন দেয়া হবে। প্রভিডেন্ট ফাণ্ডের জমা কিছু টাকাও পাবে। খুব বেশি না —- গত বৎসর বাবুর অসুখের সময় বেশ কিছু টাকা তুলতে হল।
নায়লা আগ্রহের সঙ্গে বলল, কথা বলছ না কেন? দিতে পারবে?
পারব।
কাল সকালে দিতে পারবে?
হ্যাঁ পারব। আমার কাছে এখনই টাকাটা আছে–তুমি নিয়ে নিও।
আসলে টাকাটা আমার কি জন্যে দরকার তেমাকে বলি–নুরু এসেছিল। ওর এক বন্ধু এসেছে দুবাই থেকে। সাতটা ফ্রেঞ্চ শিফন নিয়ে এসেছে। শাড়িগুলির তিন হাজার টাকা করে দাম। সে নুরুকে বলেছে–নুরু যদি শাড়িগুলি বিক্রি করে দিতে পারে তাহলে নুরুকে সে এক হাজার টাকায় একটা শাড়ি বিক্রি করবে। নুরু হালকা গোলাপী একটা শাড়ি নিয়ে এসেছিল। কি যে সুন্দর!
শাড়িটা কি তুমি রেখে দিয়েছ?
না। কোন্ ভরসায় রাখব? শেষে টাকা জোগাড় না হল? কাল সকালে নুরুকে টাকাটা দিয়ে আসব। এত দাম দিয়ে আমার শাড়ি কেনা ঠিক না। কিন্তু এত সুন্দর শাড়ি দেখে লোভ লেগে গেল।
জামানের বলতে ইচ্ছা করছে–নুরুকে টাকা দিলে তুমি শাড়ি পাবে না। জামান বলতে পারল না। নিজের ভাই সম্পর্কে এমন কঠিন কথা নায়লা সহ্য করতে পারবে না।
তোমার কি ঘুম পাচ্ছে? শুয়ে পড়বে?
এসো তাহলে শুয়ে পড়ি। বাবু রাতে কিছুই খেলো না। ও সারারাত বিরক্ত করবে। বাতিস দুদু বাতিস দুদু করে আমাকে ছিবড়া বানিয়ে ফেলল! দুধ কি করে ছাড়াই বল তো? করলার রস বুকে মাখিয়ে রাখব। তুমি মনে করে করলা নিয়ে এসো তো।
বিছানায় নায়লা স্বামীর কাছে ঘনিষ্ঠ হয়ে এলো। ভারি জড়ানো গলায় ফিসফিস করে বলল, তোমার কি আর কিছু লাগবে?
জামান চমকে উঠে বলল, কি বললে?
কিছু বলিনি। আমাকে একটু আদর কর না। আজ তোমার কি হয়েছে বল দেখি? এমন হাত-পা এলিয়ে পড়ে আছি কেন?
আজ বাবুর জন্মদিন
আজ বাবুর জন্মদিন।
নায়লা এই সাতসকালে বাবুকে গরম পানিতে গোসল করিয়ে নতুন কাপড় পরিয়ে দিয়েছে। পায়জামা, পাঞ্জাবি, নাগরা জুতা। কি সুন্দর যে বাবুকে লাগছে! ঘরে কোন ক্যামেরা নেই। ক্যামেরা থাকলে ছবি তুলে রাখা যেত। একটা টুপি কেনা দরকার ছিল– টুপি পরিয়ে দিলেই একেবারে ষোল আনা মৌলানা।
এই বাবু, এই।
উঁ।
তুমি তো মৌলানা হয়ে গেছ। বল, আসসালামো আলায়কুম।
বাতিস দুদু।
উঁহু, কোন বাতিস দুদু না। আজ থেকে বাতিস দু বন্ধ। তুমি না বড় হয়েছ? তোমার দু বছর বয়স হয়ে গেছে। এত বড় যে হয়েছে সে কি ব্যতিস দুদু খায়?
মাম্মাট কোলা যাব। কোলা।
উঁহু, তুমি কোলাও যাবে না। তোমাকে কোলে নিলে আমি কাজ করব কিভাবে? আজ আমার কত কাজ। আজ না তোমার জন্মদিন? শুভ জন্মদিন বাবু সোনা। আচ্ছা বাবা বল তো–শুভ জন্মদিন।
মাম্মাট বাতিস দুদু।
নায়লা ছেলেকে বাতিস দুদু দিল না। মাটির ঘোড়ায় চড়িয়ে দিয়ে এলো। ছেলেকে দূধ ছাড়াতে হবে। একজন কারো বাবুর কাছে থাকা দরকার। ঘোড়া থেকে গড়িয়ে পড়ে হাত পা ভাঙতে পারে। জাম্মান ঘুমুচ্ছে। এত বেলা পৃর্যন্ত সে কখনো ঘুমায় না। আজ কি সে অফিসে যাবে না? শরীর ভাল আছে তো? নায়লা জামানের কপালে হাত রাখতেই জামান চোখ মেলল। নায়লা বলল, সাতটা চল্লিশ বাজে। অফিসে যেতে হবে না?
জামান জুড়ানো গলায় বলল, অফিসে যাব না।
অফিসে যাবে না কেন?
এম্নি।
নায়লা খুশি খুশি গলায় বলল, না গেলেই ভাল। কি দরকার রোজ রোজ অফিসে যাবার? তাছাড়া আজ বাবুর জন্মদিন। তুমি আজ বাবুকে দেখবে। আমি বাইরের কাজ সেরে এসে রান্না-বান্না করব। বাইরের কি কাজ?
ওমা, বাইরের কত কাজ। অরুণীকে জন্মদিনের দাওয়াত দিতে হবে। নুরুকে টাকাটা দিয়ে আসতে হবে–তুমি যদি বাইরে বেরুতে না চাও আমি তোমার বন্ধুকেও দাওয়াত দিয়ে আসতে পারি।
ওকেও দাওয়াত দিয়ে এসো।
নারে বাবা, দরকার নেই। বড়লোকী জায়গায় আমি একা একা যাব না। তুমি অদ্ভুত মানুষ তো! বাবুকে দেখে কিছু বলছ না?
কি বলব?
পায়জামা পাঞ্জাবি গায়ে মৌলানা সেজে বসে আছে। দেখ, কি সুন্দর ঘোড়ায় বসে আছে! ও তো কাউকে কোনদিন ঘোড়ায় চড়তে দেখেনি, ও ঘোড়ায় চড়া শিখল কি ভাবে? দেখে মনে হচ্ছে না খুব মজা পাচ্ছে?
