বরদাসুন্দরী কহিলেন, “আবার কতবার করে সম্মত করতে হবে? তুমি তো অবাক করলে! এত সাধাসাধিই বা কেন? পানুবাবুর মতো পাত্র উনি পাবেন কোথায় তাই জিজ্ঞাসা করি। তুমি রাগ কর আর যাই কর সত্যি কথা বলতে কি, সুচরিতা পানুবাবুর যোগ্য মেয়ে নয়।”
পরেশবাবু কহিলেন, “পানুবাবুর প্রতি সুচরিতার মনের ভাব যে কী তা আমি স্পষ্ট করে বুঝতে পারি নি। অতএব তারা নিজেদের মধ্যে যতক্ষণ কথাটা পরিষ্কার করে না নেবে ততক্ষণ আমি এ বিষয়ে কোনোপ্রকার হস্তক্ষেপ করতে পারব না।”
বরদাসুন্দরী কহিলেন, “বুঝতে পার নি! এত দিন পরে স্বীকার করলে! ঐ মেয়েটিকে বোঝা বড়ো সহজ নয়। ও বাইরে একরকম– ভিতরে একরকম!”
বরদাসুন্দরী হারানবাবুকে ডাকিয়া পাঠাইলেন।
সেদিন কাগজে ব্রাহ্মসমাজের বর্তমান দুর্গতির আলোচনা ছিল। তাহার মধ্যে পরেশবাবুর পরিবারের প্রতি এমনভাবে লক্ষ করা ছিল যে, কোনো নাম না থাকা সত্ত্বেও আক্রমণের বিষয় যে কে তাহা সকলের কাছেই বেশ স্পষ্ট হইয়াছিল; এবং লেখক যে কে তাহাও লেখার ভঙ্গিতে অনুমান করা কঠিন হয় নাই। কাগজখানায় কোনোমতে চোখ বুলাইয়াই সুচরিতা তাহা কুটিকুটি করিয়া ছিঁড়িতেছিল। ছিঁড়িতে ছিঁড়িতে কাগজের অংশগুলিকে যেন পরমাণুতে পরিণত করিবার জন্য তাহার রোখ চড়িয়া যাইতেছিল।
এমন সময় হারানবাবু ঘরে প্রবেশ করিয়া সুচরিতার পাশে একটা চৌকি টানিয়া বসিলেন। সুচরিতা একবার মুখ তুলিয়াও চাহিল না, সে যেমন কাগজ ছিঁড়িতেছিল তেমনি ছিঁড়িতেই লাগিল।
হারানবাবু কহিলেন, “সুচরিতা, আজ একটা গুরুতর কথা আছে। আমার কথায় একটু মন দিতে হবে।”
সুচরিতা কাগজ ছিঁড়িতেই লাগিল। নখে ছেঁড়া যখন অসম্ভব হইল তখন থলে হইতে কাঁচি বাহির করিয়া কাঁচিটা দিয়া কাটিতে লাগিল। ঠিক এই মুহূর্তে ললিতা ঘরে প্রবেশ করিল।
হারানবাবু কহিলেন, “ললিতা, সুচরিতার সঙ্গে আমার একটু কথা আছে।”
ললিতা ঘর হইতে চলিয়া যাইবার উপক্রম করিতেই সুচরিতা তাহার আঁচল চাপিয়া ধরিল। ললিতা কহিল, “তোমার সঙ্গে পানুবাবুর যে কথা আছে!”
সুচরিতা তাহার কোনো উত্তর না করিয়া ললিতার আঁচল চাপিয়াই রহিল– তখন ললিতা সুচরিতার আসনের এক পাশে বসিয়া পড়িল।
হারানবাবু কোনো বাধাতেই দমিবার পাত্র নহেন। তিনি আর ভূমিকামাত্র না করিয়া একেবারে কথাটা পাড়িয়া বসিলেন। কহিলেন, “আমাদের বিবাহে আর বিলম্ব হওয়া উচিত মনে করি নে। পরেশবাবুকে জানিয়েছিলাম; তিনি বললেন, তোমার সম্মতি পেলেই আর কোনো বাধা থাকবে না। আমি স্থির করেছি, আগামী রবিবারের পরের রবিবারেই”–
সুচরিতা কথা শেষ করিতে না দিয়াই কহিল, “না।”
সুচরিতার মুখে এই অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত সুস্পষ্ট এবং উদ্ধত “না” শুনিয়া হারানবাবু থমকিয়া গেলেন। সুচরিতাকে তিনি অত্যন্ত বাধ্য বলিয়া জানিতেন। সে যে একমাত্র “না” বাণের দ্বারা তাঁহার প্রস্তাবটিকে এক মুহূর্তে অর্ধপথে ছেদন করিয়া ফেলিবে, ইহা তিনিও মনে করেন নাই। তিনি বিরক্ত হইয়া কহিলেন, “না! না মানে কী? তুমি আরো দেরি করতে চাও?”
সুচরিতা কহিল, “না।”
হারানবাবু বিস্মিত হইয়া কহিলেন, “তবে?”
সুচরিতা মাথা নত করিয়া কহিল, “বিবাহে আমার মত নেই।”
হারানবাবু হতবুদ্ধির ন্যায় জিজ্ঞাসা করিলেন, “মত নেই? তার মানে?”
ললিতা ঠোকর দিয়া কহিল, “পানুবাবু, আপনি আজ বাংলা ভাষা ভুলে গেলেন নাকি?”
হারানবাবু কঠোর দৃষ্টির দ্বারা ললিতাকে আঘাত করিয়া কহিলেন, “বরঞ্চ মাতৃভাষা ভুলে গেছি এ কথা স্বীকার করা সহজ, কিন্তু যে মানুষের কথায় বরাবর শ্রদ্ধা করে এসেছি তাকে ভুল বুঝেছি এ কথা স্বীকার করা সহজ নয়।”
ললিতা কহিল, “মানুষকে বুঝতে সময় লাগে, আপনার সম্বন্ধেও হয়তো সে কথা খাটে।”
হারানবাবু কহিলেন, “প্রথম থেকে আজ পর্যন্ত আমার কথার বা মতের বা ব্যবহারের কোনো ব্যত্যয় ঘটে নি– আমি আমাকে ভুল বোঝবার কোনো উপলক্ষ কাউকে দিই নি এ কথা আমি জোরের সঙ্গে বলতে পারি– সুচরিতাই বলুন আমি ঠিক বলছি কি না।”
ললিতা আবার কী একটা উত্তর দিতে যাইতেছিল– সুচরিতা তাহাকে থামাইয়া দিয়া কহিল, “আপনি ঠিক বলেছেন। আপনাকে আমি কোনো দোষ দিতে চাই নে।”
হারানবাবু কহিলেন, “দোষ যদি না দেবে তবে আমার প্রতি অন্যায়ই বা করবে কেন?”
সুচরিতা দৃঢ়স্বরে কহিল, “যদি একে অন্যায় বলেন তবে আমি অন্যায়ই করব– কিন্তু–”
বাহির হইতে ডাক আসিল, “দিদি, ঘরে আছেন?”
সুচরিতা উৎফুল্ল হইয়া উঠিয়া তাড়াতাড়ি কহিল, “আসুন, বিনয়বাবু, আসুন।”
“ভুল করছেন দিদি, বিনয়বাবু আসেন নি, আমি বিনয় মাত্র, আমাকে সমাদর করে লজ্জা দেবেন না”– বলিয়া বিনয় ঘরে প্রবেশ করিয়াই হারানবাবুকে দেখিতে পাইল। হারানবাবুর মুখের অপ্রসন্নতা লক্ষ্য করিয়া কহিল, “অনেক দিন আসি নি বলে রাগ করেছেন বুঝি!”
হারানবাবু পরিহাসে যোগ দিবার চেষ্টা করিয়া কহিলেন, “রাগ করবারই কথা বটে। কিন্তু আজ আপনি একটু অসময়ে এসেছেন– সুচরিতার সঙ্গে আমার একটা বিশেষ কথা হচ্ছিল।”
বিনয় শশব্যস্ত হইয়া উঠিল; কহিল, “ঐ দেখুন, আমি কখন এলে যে অসময়ে আসা হয় না তা আমি আজ পর্যন্ত বুঝতেই পারলুম না! এইজন্যই আসতে সাহসই হয় না।”
বলিয়া বিনয় বাহির হইয়া যাইবার উপক্রম করিল।
সুচরিতা কহিল, “বিনয়বাবু, যাবেন না। আমাদের যা কথা ছিল শেষ হয়ে গেছে। আপনি বসুন।”
