বিনয় আনন্দময়ীকে কহিল, “দেখো মা, আমি তোমাকে সত্য বলছি, যতবার আমি ঠাকুরকে প্রণাম করেছি আমার মনের ভিতরে কেমন লজ্জা বোধ হয়েছে। সে লজ্জা আমি চেপে দিয়েছি–উল্্টে আরো ঠাকুরপূজার পক্ষ নিয়ে ভালো ভালো প্রবন্ধ লিখেছি। কিন্তু সত্য তোমাকে বলছি, আমি যখন প্রণাম করেছি আমার মনের ভিতরটা তখন সায় দেয় নি।”
আনন্দময়ী কহিলেন, “তোর মন কি সহজ মন! তুই তো মোটামুটি করে কিছুই দেখতে পারিস নে। সব তাতেই একটা-কিছু সূক্ষ্ণ কথা ভাবিস। সেইজন্যেই তোর মন থেকে খুঁতখুঁত আর ঘোচে না।”
বিনয় কহিল, “ঐ কথাই তো ঠিক। অধিক সূক্ষ্ণ বুদ্ধি বলেই আমি যা বিশ্বাস না করি তাও চুল-চেরা যুক্তির দ্বারা প্রমাণ করতে পারি। সুবিধামত নিজেকে এবং অন্যকে ভোলাই। এতদিন আমি ধর্মসম্বন্ধে যে-সমস্ত তর্ক করেছি সে ধর্মের দিক থেকে করি নি, দলের দিক থেকে করেছি।”
আনন্দময়ী কহিলেন, “ধর্মের দিকে যখন সত্যকার টান না থাকে তখন ঐরকমই ঘটে। তখন ধর্মটাও বংশ মান টাকাকড়ির মতোই অহংকার করবার সামগ্রী হয়ে দাঁড়ায়।”
বিনয়। হাঁ, তখন এটা যে ধর্ম সে কথা ভাবি নে, এটা আমাদের ধর্ম এই কথা মনে নিয়েই যুদ্ধ করে বেড়াই। আমিও এতকাল তাই করেছি। তবুও আমি নিজেকে যে নিঃশেষে ভোলাতে পেরেছি তা নয়; যেখানে আমার বিশ্বাস পৌঁচচ্ছে না সেখানে আমি ভক্তির ভান করছি বলে বরাবর আমি নিজের কাছে নিজে লজ্জিত হয়েছি।
আনন্দময়ী কহিলেন, সে কি আর আমি বুঝি নে। তোরা যে সাধারণ লোকের চেয়ে ঢের বেশি বাড়াবাড়ি করিস তার থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, মনের ভিতরটাতে ফাঁক আছে বলে সেইটে বোজাতে তোদের অনেক মসলা খরচ করতে হয়। ভক্তি সহজ হলে অত দরকার করে না।”
বিনয় কহিল, “তাই তো আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করতে এসেছি যা আমি বিশ্বাস করি নে তাকে বিশ্বাস করবার ভান করা কি ভালো?”
আনন্দময়ী কহিলেন, “শোনো একবার! এমন কথাও জিজ্ঞাসা করতে হয় নাকি?”
বিনয় কহিল, “মা, আমি পরশু দিন ব্রাহ্মসমাজে দীক্ষা নেব।”
আনন্দময়ী বিস্মিত হইয়া কহিলেন, “সেকি কথা বিনয়? দীক্ষা নেবার কী এমন দরকার হয়েছে?”
বিনয় কহিল, “কী দরকার হয়েছে সেই কথাই তো এতক্ষণ বলছিলুম মা!”
আনন্দময়ী কহিলেন, “তোর যা বিশ্বাস তা নিয়ে কি তুই আমাদের সমাজে থাকতে পারিস নে?”
বিনয় কহিল, “থাকতে গেলে কপটতা করতে হয়।”
আনন্দময়ী কহিলেন, “কপটতা না করে থাকবার সাহস নেই? সমাজের লোকে কষ্ট দেবে–তা, কষ্ট সহ্য করে থাকতে পারবি নে?”
বিনয় কহিল, “মা, আমি যদি হিন্দুসমাজের মতে না চলি তা হলে–”
আনন্দময়ী কহিলেন, “হিন্দুসমাজে যদি তিন শো তেত্রিশ কোটি মত চলতে পারে তবে তোমার মতই বা চলবে না কেন?”
বিনয় কহিল, “কিন্তু, মা, আমাদের সমাজের লোক যদি বলে তুমি হিন্দু নও তা হলে আমি কি জোর করে বললেই হল আমি হিন্দু?”
আনন্দয়মী কহিলেন, “আমাকে তো আমাদের সমাজের লোকে বলে খৃস্টান–আমি তো কাজে-কর্মে তাদের সঙ্গে একত্রে বসে খাই নে। তবুও তারা আমাকে খৃস্টান বললেই সে কথা আমাকে মেনে নিতে হবে এমন তো আমি বুঝি নে। যেটাকে উচিত বলে জানি সেটার জন্যে কোথাও পালিয়ে বসে থাকা আমি অন্যায় মনে করি।”
বিনয় ইহার উত্তর দিতে যাইতেছিল। আনন্দময়ী তাহাকে কিছু বলিতে না দিয়াই কহিলেন, “বিনয়, তোকে আমি তর্ক করতে দেব না, এ তর্কের কথা নয়। তুই আমার কাছে কি কিছু ঢাকতে পারিস? আমি যে দেখতে পাচ্ছি তুই আমার সঙ্গে তর্ক করবার ছুতো ধরে জোর করে আপনাকে ভোলাবার চেষ্টা করছিস। কিন্তু এতবড়ো গুরুতর ব্যাপারে ওরকম ফাঁকি চালাবার মতলব করিস নে।”
বিনয় মাথা নিচু করিয়া কহিল, “কিন্তু, মা, আমি তো চিঠি লিখে কথা দিয়ে এসেছি কাল আমি দীক্ষা নেব।”
আনন্দময়ী কহিলেন, “সে হতে পারবে না। পরেশবাবুকে যদি বুঝিয়ে বলিস তিনি কখনোই পীড়াপীড়ি করবেন না।”
বিনয় কহিল, “পরেশবাবুর এ দীক্ষায় কোনো উৎসাহ নেই–তিনি এ অনুষ্ঠানে যোগ দিচ্ছেন না।”
আনন্দময়ী কহিলেন, “তবে তোকে কিছু ভাবতে হবে না।”
বিনয় কহিল, “না মা, কথা ঠিক হয়ে গেছে, এখন আর ফেরানো যাবে না। কোনোমতেই না।”
আনন্দময়ী কহিলেন, “গোরাকে বলেছিস?”
বিনয় কহিল, “গোরার সঙ্গে আমার দেখা হয় নি।”
আনন্দময়ী জিজ্ঞাসা করিলেন, “কেন, গোরা এখন বাড়িতে নেই?”
বিনয় কহিল, “না, খবর পেলুম সে সুচরিতার বাড়িতে গেছে।’
আনন্দময়ী বিস্মিত হইয়া কহিলেন, “সেখানে তো সে কাল গিয়েছিল।”
বিনয় কহিল, “আজও গেছে।”
এমন সময় প্রাঙ্গণে পালকির বেহারার আওয়াজ পাওয়া গেল। আনন্দময়ীর কোনো কুটুম্ব স্ত্রীলোকের আগমন কল্পনা করিয়া বিনয় বাহিরে চলিয়া গেল।
ললিতা আসিয়া আনন্দময়ীকে প্রণাম করিল। আজ আনন্দময়ী কোনোমতেই ললিতার আগমন প্রত্যাশা করেন নাই। তিনি বিস্মিত হইয়া ললিতার মুখের দিকে চাহিতেই বুঝিলেন, বিনয়ের দীক্ষা প্রভৃতি ব্যাপার লইয়া ললিতার একটা কোথাও সংকট উপস্থিত হইয়াছে, তাই সে তাঁহার কাছে আসিয়াছে।
তিনি কথা পাড়িবার সুবিধা করিয়া দিবার জন্য কহিলেন, “মা, তুমি এসেছ বড়ো খুশি হলুম। এইমাত্র বিনয় এখানে ছিলেন–কাল তিনি তোমাদের সমাজে দীক্ষা নেবেন আমার সঙ্গে সেই কথাই হচ্ছিল।”
ললিতা কহিল, “কেন তিনি দীক্ষা নিতে যাচ্ছেন? তার কি কোনো প্রয়োজন আছে?”
আনন্দময়ী আশ্চর্য হইয়া কহিলেন, “প্রয়োজন নেই মা?”
