সত্যি?
হ্যাঁ সত্যি। পরীক্ষায় ধরা পড়েছে। কী যে আনন্দ হচ্ছে ভাই!
আনন্দ হবারই কথা। আমি সবসময় দেখেছি আপনি ভাগ্যবতী।
মেয়েটার জন্যে দোয়া করবেন আপা।
ডায়েরি এইখানেই শেষ।
আচ্ছা, আমার কি মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে? কী দিয়ে শুরু করেছিলাম আর কী বলছি। শুরু করেছিলাম কী দিয়ে? ঐ যে দুপুরে ঘুম ভাঙার পর মনে হলো আজ খুব আনন্দের কিছু ঘটবে। সারাদিন কিছু ঘটল না।
খুব আশা ছিল বাবার কাছ থেকে একটা চিঠি নিশ্চয়ই আসবে। অনেকদিন বাবা চিঠি লিখেন না। কে জানে হয়তো তাঁর অসুখ-বিসুখ হয়েছে। অসুখ হলে সেখানে তাঁকে দেখার কেউ নেই। তিনি থাকেন একা, নিজেই বেঁধে খান। শেষ চিঠিতে বাবা তার রান্না করার কথা লিখেছেন। কী সুন্দর করেই না লিখলেন–
ও আমার টিয়া পাখি,
আজ দুপুরে রান্না করার সময় তোর কথা মনে পড়ল। কেন বল তো? কারণ আজ একটা দারুণ জিনিস রান্না করেছি। পাহাড়ি একটা মাছ– ওরা বলে দুই মাছ কিংবা চই মাছ। দেখতে এত সুন্দর যেন রূপার একটা পাত। অনেকটা চাঁদা মাছের মতো– চ্যাপ্টা। মুখটা লাল টুকটুক। প্রথমে ভাবলাম ভেজে ফেলি। দেখি, ঘরে মাছ ভাজার মতো তেল নেই। কাজেই তরকারি করা হলো। তরকারি চড়িয়ে দিয়ে মনে হলো– টিয়া পাখি থাকলে এই মাছ আমাকে রান্না করতে দিত না। সে বলত, এত সুন্দর মাছ তুমি কেটেকুটে খেয়ে ফেলবে। পানিতে ছেড়ে দিয়ে আস বাবা।
যাই হোক, মাছটা দেখতে যত সুন্দর খেতে ততই অসুন্দর। বিশ্রি গন্ধ। পচা নাড়িভুড়ি থেকে যে-রকম গন্ধ আসে সেরকম গন্ধ। প্রচণ্ড সর্দিতে নাক বন্ধ থাকলেই শুধু এই মাছ খাওয়া চলে নয়তো না।
আমি অল্প একটু খেয়ে বমি করে সব ফেলে দিয়েছি। সারাদিনই শরীরটা কেমন কেমন করেছে। মনে হয় ‘ছই’ কোনো বিষাক্ত মাছ। এই কারণে বোধহয় বাজারে বিক্রি হয় না। আমি নিজে জাল ফেলে ধরেছি। ভালো কথা– আমার একটা জাল আছে। সেই জাল ফেলে আমি নিজেই শঙ্খ নদীতে মাছ ধরি। একবার একটা সাপ ধরেছিলাম। বিশাল সাপ। মুরং এক ছেলে খুব আগ্রহ করে সাপটা আমার কাছ থেকে নিয়ে গেল। মুরংরা সাপ খায়। মুরং ছেলেটার নাম ‘উলাপ্রু’। সে মাঝে মাঝে এসে আমার কাজকর্ম করে দেয়। একবার তাকে কিছু কাপড় ধুতে দিলাম। সে সঙ্গে সঙ্গে নিজের
লুঙ্গি খুলে নেংটো হয়ে কাপড় ধুতে শুরু করল। নিজের লুঙ্গিটা খুলে নিল কারণ কাপড় ধোয়ার সময় লুঙ্গি ভিজে যাবে। এদের লজ্জা-শরম একটু কম। আজ এই পর্যন্তই মা।
পরে তোকে লম্বা চিঠি দেব।
ইতি–
তোর বাবা
পুনশ্চ : উলা বলেছে সাপটা নাকি খেতে দারুণ ছিল। পেট ভর্তি ছিল ডিম।
অফিস থেকে ফিরলেন অনেক দেরি করে। ফিরেই আবার বের হয়ে পড়লেন। আমার ডাক্তারের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট। বুয়া রান্নাঘরে রান্না করছে। আমি একটা বই হাতে শুয়ে আছি। ঘরে আলো আছে কিন্তু পড়তে পারছি না। লেখাগুলি সব ঝাঁপসা। কেউ যদি পড়ে পড়ে শোনাত ভালো লাগত।
দরজার কলিংবেল বাজছে।
কে এসেছে?
বাবা?
মনে মনে যা আশা করা হয় তা ঘটে না। উল্টোটা হয়। কাজেই আমি ভাবতে লাগলাম- বাবা আসেন নি। বড় খালু এসেছেন। বড় খালুকে আমার অসহ্য লাগে। কাজেই বড় খালুর কথা ভাবলে হয়তো দেখা যাবে বাবা এসেছেন। ফুলির মা দরজা খুলেছে। তার কোনো কথা শুনা যাচ্ছে না। তাহলে বাবা আসেন নি। বাবা এলে ফুলির মা ‘চাচাজান’ বলে বিকট একটা চিৎকার দিত।
আমার টিয়া পাখি কই রে?
আমি কি ভুল শুনছি? কে টিয়া পাখির খোঁজ করছে? আরে এই তো। এই তো বাবা।
বাবা ঘরের মাঝখানে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। আমার দিকে।
আকাশ-পাতাল বিস্ময় নিয়ে তিনি প্রশ্ন করলেন, মা, তোর কী হয়েছে?
আমি হাসার চেষ্টা করলাম। হাসতে পারলাম না।
বাবা আমাকে দেখে কষ্ট পাচ্ছেন। খুব কষ্ট পাচ্ছেন। বাবাকে আমি খুব কষ্ট দিলাম এই দুঃখে আমার চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি পড়তে লাগল।
সাজ্জাদ বারান্দায় বসে আছে
সাজ্জাদ বারান্দায় বসে আছে। বারান্দা অন্ধকার। দিলশাদ এখনো ফেরে নি। ফুলির মা চা রেখে গেছে। চা ঠাণ্ডা হচ্ছে। সাজ্জাদ চায়ের প্রতি কোনো আকর্ষণ বোধ করছে না। অল্প সময়ের মধ্যে সে বেশ কয়েকটা সিগারেট খেয়ে ফেলল। সিগারেটের ধোঁয়ায় এখন তার মাথা ঘুরছে। এতদিন পর এসেছে। তার উচিত মেয়ের পাশে বসে থাকা। তার সেই ইচ্ছাও করছে না। দিলশাদের সঙ্গে আগে একটা বোঝাঁপড়া হওয়া দরকার। এমন ভয়াবহ অসুস্থ একটা মেয়ে। চিকিৎসার জন্যে বাইরে চলে যাচ্ছে। আর সে খবরটাও জানবে না? এ কেমন কথা?
ফুলির মা বলল, চাচাজান, সিনান করবেন না?
সাজ্জাদ বিরক্ত গলায় বলল, না। দিলশাদ আসবে কখন?
জানি না। বলছেন ডাক্তারের ধারে যাবেন। আপনের শইল কি ভালো চাচাজান?
আমার শরীর নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না।
বরফ দিয়া ঠাণ্ডা এক গ্লাস পানি দিমু? আম্মা ফিরিজ কিনছে। নয়া ফিরিজ– লাল কালার। পুরানটা বেইচ্যা দিছে।
আচ্ছা ঠিক আছে। দাও, পানি দাও।
দাম মিলে নাই। তেরশ টাকা মিলছে।
তুমি যাও। আমাকে ঠাণ্ডা পানি এনে দাও।
নয়া ফিরিজটার দাম পড়ছে চাইর হাজার সাতশ। ঠেলাওয়ালা নিছে সত্তর টেকা।
তুমি সামনে থেকে যাও তো ফুলির মা। এত বকবক করছ কেন? এমন বকবকানি স্বভাব তত তোমার আগে ছিল না।
ফুলির মা চলে গেল। তার আরো অনেক গল্প করার ইচ্ছা ছিল, সাহসে কুলাল। চাচাজানের মেজাজ ভালো নেই। ঘরের ভেতর থেকে নাতাশা ডাকল, বাবা, শুনে যাও তো।
