দীপু মাথা নেড়ে হাসল।
ভেরি স্ট্রেঞ্জ!
কী?
হ্যাভিং এ স্টেপ ব্রাদার ইজ রাদার স্ট্রেঞ্জ।
মেয়েটি একটু হেসে উঠে ওর ভাইকে বলল, হি ইজ কিউট। ইজট হি?
ভাইটি চোখ পাকিয়ে বোনের দিকে তাকাল, তারপর দীপুকে বলল, শী ইজ ইমম্যাচিওরড। ডাজনট নো হাউ টু টক!
এত ছোট বাচ্চা এমন সুন্দর টক টক ইংরেজি বলছে যে, ওর খুব অবাক লাগে। দেখতে এত সুন্দর দু’জনেই যে দীপুর আদর করতে ইচ্ছে হচ্ছিল। সত্যি সত্যি যদি ওর দু’জন ভাই-বোন থাকত—ওদের যে সে কী আদরই না করত!
এমন সময় ওর আম্মা বেরিয়ে এলেন, হাতে একটা বড়সড় ব্যাগ। ছেলেমেয়ে দু’জনকে বললেন, তোমরা নিজেদের জিনিসপত্র ঠিক করে নাও, আমার আসতে দেরি হবে, ড্যাড-এর কথা শুনো।
ছেলেটি বলল, ওকে মম। ওর আম্মা মাথা নিচু করলেন আর ছেলেমেয়ে দু’জন চুক চুক করে দু’গালে চুমু খেয়ে ভেতরে চলে গেল।
আম্মা দীপুকে বললেন, চলো।
কোথায়?
বাইরে কোথায়।
আম্মা ওর হাত ধরে বাইরে নিয়ে এলেন। ছোট লাল টুকটুকে গাড়িটার দরজা খুলে দিলেন আম্মা, ও ভেতরে গিয়ে বসল। ড্রাইভার নেই দেখে দীপু অবাক হচ্ছিল। যখন দেখল ওর আম্মাই ড্রাইভারের সীটে বসেছেন, তখন সে আরও অবাক হয়ে গেল। ওর আম্মা গাড়ি চালাতে পারেন!
দীপু গাড়ি চড়তে খুব ভালবাসে। খোলা একটা জীপে বসে শাঁ-শাঁ করে পাহাড়ের মাঝে একটা রাস্তা দিয়ে ছুটে যাচ্ছে এরকম একা ছবি প্রায়ই সে কল্পনা করে কিন্তু ও গাড়ি চড়েছে খুব কম, এভাবে তো কখনওই চড়েনি। শুধু তার জন্যে তার আম্মা গাড়ি চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। ও চোখের কোন দিকে তার আম্মাকে দেখার চেষ্টা করল। কী আশ্চর্য! তার নিজের আম্মা!
দীপু!
উঁ।
একটা কিছু বলল।
কী বলব?
আম্মা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, তুমি আমার উপর রাগ করে আছ, না?
দীপু আস্তে আস্তে বলল, কেন?
তোমাকে ছেড়ে চলে গেছি, তাই।
আমি তো জানতান না। আব্বা কখনও বলেননি।
যখন বলেছে তখন?
তখন একটু দুঃখ হয়েছে, রাগ হবে কেন?
আম্মা একহাতে ওকে ধরে টেনে নিলেন। দীপুর একটু ভয় হচ্ছিল, এক হাতে গাড়ি চালাতে গিয়ে যদি অ্যাক্সিডেন্ট হয়? ওর আম্মার শরীরে কেমন মিষ্টি একটা গন্ধ। মায়েদের শরীরে বুঝি এরকম গন্ধ হয়?
শাঁ করে একটা ট্রাক পাশ দিয়ে চলে গেল। আম্মা ওকে ছেড়ে দিয়ে আবার দু হাতে স্টিয়ারিং ধরলেন।
গাড়ি চালাতে কেমন জানি লাগে। ওখানে রাস্তার ডান দিকে দিয়ে চালাই তো!
ওখানে সবাই ডান দিক দিয়ে যায়?
হ্যাঁ।
ওখানে গাড়ি খুব বেশি?
বেশি—মানে এত গাড়ি, চিন্তা করা যায় না, দম বন্ধ হয়ে আসে আমার। তাই একবার ঢাকা এলে আর ফিরে যেতে মন চায় না। নিজের দেশের থেকে ভাল দেশ আছে কোথাও?
আম্মা একটুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, দীপু!
কী?
যাবে আমার সাথে?
দীপু চুপ করে রইল।
যাবে আমেরিকায়? ওখানে পড়বে?
দীপু আস্তে আস্তে বলল, এখন যাব না, বড় হয়ে যাব।
এখন যাবে না কেন?
না, এখন যাব না।
কেন?
দীপু উত্তর দিতে পারল না, যদিও ও কারণটা জানে। ও ওর আব্বাকে ছেড়ে থাকতে পারবে না। আম্মা খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
বায়তুল মোকাররমের পাশে গাড়িটা দাঁড় করিয়ে আম্মা দীপুকে বললেন, এসো দীপু।
দীপু নামতে নামতে বলল, কোথায়?
এসো তো, একটু ঘুরে বেড়াই।
আম্মা ওকে নিয়ে সুন্দর সুন্দর দোকানের পাশ দিয়ে হাঁটতে লাগলেন। একটা খুব বড় দোকান দেখে ওর পিঠে হাত দিয়ে ভেতরে নিয়ে গেলেন। সুন্দর সুন্দর খেলনা, কাপড়, জামা সাজিয়ে রাখা হয়েছে শো-কেসের ভেতর। বড় বড় এরকম খেলনার দোকানে ঘুরে বেড়াতে ওর খুব লাল লাগে। চট্টগ্রাম থাকার সময় একটা দোকানে একটা হাতি দেখেছিল, চাবি দেয়া, থপ থপ করে হেঁটে যেত। সে ভারি মজার ব্যাপার।
আম্মা একটা শার্ট দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, দীপু, তোমার এই শার্টটা ভাল লাগে?
খুব সুন্দর শার্ট, ভাল না লাগার কোনো কারণ নেই।
দীপু মাথা নেড়ে জিজ্ঞেস করল, কেন?
তোমাকে কেমন সুন্দর মানাবে, বলো দেখি।
না–
কী?
আমি এত সুন্দর আর এত দামি শার্ট পরতে পারব না।
আম্মা মুহূর্তে ফ্যাকাসে হয়ে গেলেন। আস্তে আস্তে বললেন, তুমি আমাকে ঘেন্না কর দীপু? তাই আমার থেকে কিছু নিতে চাইছ না?
দীপু ভীষণ অপ্রস্তুত হয়ে ওর আম্মার হাত ধরে ফেলল। ব্যস্ত হয়ে বলল, না, না না ছি! আমি ঘেন্না করব কেন? তারপর বলতে গিয়েও বলতে পারল না, মানুষ কি তার মাকে ঘেন্না করতে পারে কখনও?
তা হলে আমার থেকে কিছু নিতে চাইছ না কেন?
কে বলল নিতে চাই না? আমি শুধু জামাকাপড়ের কথা বলছি, এত সুন্দর আর দামি কাপড় কখনও পরতে পারব না। আমার লজ্জা লাগে পরতে।
লজ্জা লাগে!
দীপু অপ্রস্তুত হয়ে বলল, আমার স্কুলের সব ছেলে, পাড়ার সব ছেলে আমার মত, আমি তার মাঝে এরকম ফুলওয়ালা সুন্দর শার্ট পরতে পারব না। বোকা বোকা লাগবে।
আম্মা খানিকক্ষণ অবাক হয়ে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন, আর দীপু আরও অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। থতমত খেয়ে বলল, আমি যদি আমেরিকা থাকতাম রুমীদের মতো, তা হলে এরকম সুন্দর কাপড় পরতে হতো, এ ছাড়া আমাকে তো প্লেনেই উঠতে দেবে না। কিন্তু এখন সত্যি আমার দরকার নেই–
আম্মা আস্তে আস্তে মাথা নেড়ে ওর পিঠে হাত দিয়ে ওকে বের করে আনলেন।
ওরা দু’জন স্টেডিয়ামের পাশ দিয়ে হাঁটতে লাগল, আর আম্মা ওকে হাজার রকম প্রশ্ন করতে লাগলেন। কোন স্কুলে পড়ে, পরীক্ষায় কী হয়, সবচেয়ে ভাল পারে কোনটা, সবচেয়ে খারাপ লাগে কী পড়তে, কতজন বন্ধু আছে তার, তারা কী করে, ছুটির দিনে কী করে সময় কাটায়, এইসব।
